তারাপদ স্যার ফরিদপুরের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। তাঁর জন্মদিনে অর্থাৎ ৮ জানুয়ারি ছিল আরেক ভুবনখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির মৃত্যুদিন। আর বিস্ময়করভাবে যেদিন হকিং মারা গেলেন, সেই ১৪ মার্চ ছিল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন।

এগুলো নিঃসন্দেহে কাকতালীয় ঘটনা। কিন্তু শুনতে আমাদের ভালোই লাগে, অন্যরকম অনুভূতি হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৪১ সালের ৬ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। আর আমাদের ফরিদপুর শহরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় অকৃতদার শিক্ষক তারাপদ স্যার জন্মগ্রহণ করেন ঐ ৬ আগস্ট, ১৯২৯ সালে! ফরিদপুরের বাইরে অনেকেই হয়তো বলবেন, তারাপদ স্যার আবার কে? তিনি কি প্রখ্যাত কেউ? আসলে যে অপূর্ব সৌন্দর্যের ফুল নিভৃতে বেড়ে ওঠে সুগন্ধ বিলায়, তার খোঁজ সকলে না জানলে সেই ফুলের সৌন্দর্য আর সুগন্ধ তো মিথ্যা হয়ে যায় না। জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, সর্বজনে যিনি তারাপদ স্যার নামে খ্যাত, ছিলেন তেমনই এক অপার সৌন্দর্যময় ব্যক্তিত্ব। বিক্রমপুরে জন্ম হলেও তিনি পরবর্তীকালে বাবার সঙ্গে ফরিদপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তারপর হয়ে ওঠেন প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক এবং সাংবাদিকও বটে। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি অঙ্ক ও ইংরেজিতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালেই তিনি একই ক্লাসের ছাত্রকে পড়াতেন। বাম ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে তিনি ছিলেন ফরিদপুরের ন্যাপের একজন নেতা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে তাঁর গ্রামের বাড়িতে আক্রমণ করে ছোটভাই গৌরগোপাল ঘোষসহ মোট ২৮ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তিনি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের অনুসারী একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। তাঁর হাতে গড়া অনেক ছাত্র আজ প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার এবং শিল্পপতি। ফরিদপুর প্রেস ক্লাব, ফরিদপুর টাউন থিয়েটার, ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতিসহ অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ার সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। যে কোনো শুভ কাজে তিনি এগিয়ে আসতেন সবার আগে। ফরিদপুর শহরে নারীশিক্ষার জন্য প্রথমে সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ এবং সারদা সুন্দরী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অগ্রগণ্য। কখনো নেতা হননি। গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে যাননি, কিন্তু তিনি ছিলেন নেতা নির্বাচনের কারিগর, সর্বমান্য, সর্বজনশ্রদ্ধেয়।

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল স্যারের ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের। সেই নির্মাণসূত্রে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে স্যারকে নিয়ে ক্যামেরা হাতে ঘুরেছি ফরিদপুরের নানান প্রান্তে। সঙ্গে ছিলেন মৃধা রেজাউল ভাই ও বন্ধু সুবোধ, আমেরিকা থেকে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল বন্ধু শাহীন। অনুপ্রেরণায় ছিলেন প্রফেসর আলতাফ হোসেন। স্যারের বাড়ি আর আমার বাড়ি ছিল তিন মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। ২০০৯ সাল থেকে স্যারের সঙ্গে ফরিদপুরে ছায়ার মতো লেগে থাকতাম। ফরিদপুরে গেলে স্যারের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতাম—ঘুরতাম রিকশায়, প্রেসক্লাসে, তাঁর বাড়িতে। কেন জানি আমাকে পেলে তিনি তাঁর মনের ডালি খুলে দিতেন। শেয়ার করতেন মনের গহিন কথা। তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে করতে আমরা বুঝতে চেষ্টা করতাম তাঁর ভেতরে শুভ্রতাকে। তিনি কতোটা সংস্কারমুক্ত ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় অ্যাসিড টেস্ট নিলাম একদিন। বললাম, স্যার একদিন তো আমরা সবাই-ই মারা যাব। হিন্দুদের পোড়ানো হবে শ্মশানে। চলেন, অম্বিকাপুর শ্মশানে গিয়ে আপনার তথ্যচিত্রের একটি অংশের শুটিং করি!

আমি ভেবেছিলাম, শ্মশানের কথা শুনে তিনি বিব্রত হবেন। তাঁর বয়স তখন ৮৮ বছর। এই বয়সে মৃত্যুচিন্তায় অনেকেই ভীত থাকেন। কিন্তু তারাপদ স্যার তো সংস্কারমুক্ত পরিমিত বোধসম্পন্ন মানুষ। তিনি উত্ফুল্ল হয়ে বললেন, ‘খুব ভালো। চল শ্মশানে। অত্যন্ত পুণ্যস্থান শ্মশান। ঐখানেই তো আমাকে পুড়ানো হবে।’

তারপর স্যারকে নিয়ে শ্মশানে এলাম। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর জীবনাদর্শনের অনেক কথাই বললেন। জানালেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শ্মশানে যেন নিয়ে আসা হয়। তাঁর মৃতদেহ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে যে কেউ ধরতে পারবে, শ্রদ্ধা জানাতে পারবে। স্যার শ্মশানজুড়ে ঘুরছিলেন আর তাঁর চোখটা ছলছল করে উঠছিল। যেখানে তাঁকে পোড়ানো হবে, সেই চিতার কাছে গিয়ে তিনি প্রণাম জানালেন। পুরো দৃশ্যগুলো আমি ক্যামেরাবন্দি করলাম।

২০২১ সালের ২ এপ্রিল স্যার নবতিপর হয়েছিলেন মাত্র। করোনাভাইরাসের উদ্দাম নৃত্যে সারা বিশ্ব তখন প্রকম্পিত। আমি নিশ্চিত যে, ৯০ বছর বয়সেও স্যার এতটাই সংযমী জীবনযাপন করতেন যে করোনা না এলে তিনি শতায়ু হতেন। এখনো মাঝেমধ্যে মনে হয় স্যার হয়তো আমাকে ফোন করবেন, কিছুটা জড়ানো গলায় বলবেন, কবে আইবি তাপস?

স্যারের মতো শুভ্র মনের মানুষ এসে আমাদের সমাজের কলুষতা কমিয়ে যায়। স্যার জন্মান্তরে বিশ্বাসী ছিলেন। সেই বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি হয়তো আমাদের সমাজে আবার আসবেন কলুষতা কমাতে। খুব ভালোবাসি স্যার আপনাকে, প্রণাম নেবেন।

লেখক: চলচ্চিত্রকার, কথাসাহিত্যিক