আন্তর্জাতিক পরিবহন বাণিজ্যে নতুন ডেস্টিনেশন

কোভিডের সময় বিশ্বে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। কনটেইনার পরিবহন ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আবার বিদেশি ক্রেতার কাছে রপ্তানিপণ্য পৌঁছে দিতে হিমশিম খেতে হয়। সংকট বা দুর্যোগের সময় নতুন সুযোগ তৈরি হয়। এখন যে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইতালিতে কনটেইনার জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছিল, ঐ সংকটের সূত্র ধরেই হয়েছে।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ডিপোতে কনটেইনারের স্তূপ হয়েছিল। সিঙ্গাপুর বা কলম্বো থেকে বড় জাহাজের বুকিং না পাওয়ায় পণ্য রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সে সময় বিজিএমইএর সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সরাসরি ফিডার জাহাজে ইউরোপে পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। এখন ঠিকই এই উদ্যোগ নিয়েছে ইতালির একটি প্রতিষ্ঠান।

সরাসরি জাহাজ চালু হওয়ায় সবচেয়ে বড় বিষয় সিঙ্গাপুর বা কলম্বোতে জটের কারণে শিপমেন্টে যে অনিশ্চয়তা ছিল তা কাটবে। খরচ কমলে বায়াররা এ দেশে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য আরো বেশি অর্ডার দিতে চাইবে। আবার সময় কমলে বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিতে উত্সাহী হবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ এমন নতুন উদ্যোগ দ্রুত অনুমোদন দিয়ে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ও ইতালির মধ্যে কয়েক দফা জাহাজ চলাচল সফল হলে হয়তো একই প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন জাহাজ নামাবে। আবার শিপিং লাইনগুলোও এগিয়ে আসবে। সপ্তাহে যদি অন্তত একদিন পর পর চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ দেওয়া যায়, তাহলে আর ঘুরপথে ইউরোপে কনটেইনার নেওয়ার দরকার না-ও হতে পারে।

ইতিমধ্যে ইউরোপ, আরব আমিরাতসহ অন্য দেশেও এই সেবা চালু করার আলাপ-আলোচনা চলছে। রপ্তানির শীর্ষ গন্তব্যের দেশগুলোতে এই সেবা দেওয়া গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। সরকার ২০২৪ সালের মধ্যে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৮০ বিলিয়ন ডলার। এই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী যদি পণ্য পরিবহন করতে হয়, তাহলে নতুন উদ্যোগ সম্প্রসারিত করতে হবে।

যেখানেই সম্ভাবনা, সেখানেই বিনিয়োগ, এটাই ব্যবসায়ীদের ধর্ম। তাই আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশ। সরকারকে শুধু অবকাঠামোসহ ব্যাবসায়িক দলিলাদি সহজীকরণ করে দিতে হবে।

মাতারবাড়ী চালু হবে চার-পাঁচ বছর পর। তখন বড় জাহাজে সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকায় কনটেইনার পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। বে টার্মিনাল চালু হলেও সরাসরি জাহাজ সার্ভিস দিতে শিপিং কোম্পানিগুলো উত্সাহী হবে। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এসব প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার।

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে লজিস্টিকস বা আর্জাতিক পরিবহন খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লজিস্টিকস খাতের দুর্বলতার কারণে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়। খরচ বাড়ে। লজিস্টিকস খাত গতিশীল করতে অবকাঠামোর পাশাপাশি বাণিজ্যের প্রক্রিয়াও সহজ করা দরকার। লজিস্টিকস খাতের প্রক্রিয়াগুলো অনলাইননির্ভর করা হলে সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হবে।

বাণিজ্যের পুরো প্রক্রিয়া অনলাইন না হলে সেই অর্থে সুফল পাওয়া যাবে না। সনাতন পদ্ধতিতে এখন বেশি চাপ নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বাণিজ্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সিঙ্গেল উইনডো বাস্তবায়নে সময় ক্ষেপণ করা উচিত নয়।

অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ এখনো প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। সেজন্য সড়ক, রেল, নৌপথ, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, স্হল বন্দর ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো দরকার।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের প্রতিবেশী ভারত সরকার ২০২২ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেইন সেক্টরকে অত্যধিক আত্মাধিকার দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার ‘গতিশক্তি’ নামক মহাপরিকল্পনার আওতায় আগামী তিন বছরে এই খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছেন। দেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের দ্রুত চলাচলকে নিশ্চিত করার জন্য এই টাকা আগামী তিন বছরে ভারতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ১০০ কার্গো টার্মিনাল তৈরির জন্য ব্যয় করা হবে।

লজিস্টিকস কার্যক্রম ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় বা প্রতিবেশী ভারতের মতো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একজন অতিরিক্ত সচিবের অধীনে একটি লজিস্টিকস বিভাগ স্থাপন প্রয়োজন।

বর্তমানে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা লজিস্টিকসের জন্য নীতি ও প্রবিধান নির্ধারণ করে থাকে। লজিস্টিক সেক্টরের এই খণ্ডিত ব্যবস্থাপনা এই খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, সমন্বয়হীনতা ও ব্যয় বৃদ্ধির জন্য দায়ী। একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এই সেক্টরের সব সেবা প্রদানকারী ও অংশীদারদের একই নীতির আওতায় আনলে দেশের লজিস্টিকস খাতে খরচ কমবে। দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যমূল্য সহনীয় রাখতে ভূমিকা রাখবে।

আমাদের দেশে ওয়্যার হাউজ ক্ষমতা একেবারেই অপর্যাপ্ত। শিপমেন্টের আগে রপ্তানিযোগ্য পণ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ, একত্রীকরণ এবং পণ্য স্টাফিংয়ের জন্য ওয়্যারহাউজ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে মাল্টিমোডাল পরিবহন অপারেটর তথা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের মালিকানাধীন ওয়্যার হাউজ বা সিএফএস থাকে। রপ্তানি পণ্য সেই ওয়্যারহাউজগুলোতে কনটেইনারজাত করা হয়। ওয়্যারহাউজ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সহজ শর্তে ফরওয়ার্ডারদের রপ্তানি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ স্থাপনের অনুমোদন দিলে সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর চাপ কমবে, সমুদ্র ও বিমানবন্দরে পণ্যজট হ্রাস পাবে, বর্তমান প্রাইভেট অফডকগুলোর একচেটিয়াতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, রপ্তানি ব্যয় কমবে, রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও মান বাড়বে।

এখন দেখা যায়, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরে অপর্যাপ্ত সিএফএস ও স্টোরেজ ক্ষমতার কারণে প্রায়ই যানজট ও পণ্যজটের সৃষ্টি হয়। ফলে রপ্তানিকারকের বাহন থেকে পণ্য গ্রহণ ও ক্যারিয়ারের কাছে হস্তান্তরের জন্য প্রস্ত্ততিকরণে বিলম্ব এবং শিপমেন্টে সময়ক্ষেপণ দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সে কারণে কখনো কখনো নির্ধারিত জাহাজ ও ফ্লাইটে পণ্য ওঠানো যায় না। ফলে রপ্তানি আদেশ বাতিল হয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের ৪৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি ১৯টি আইসিডির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে কখনো কখনো ট্রাকগুলো কার্গো লোড বা আনলোড করার জন্য প্রায় তিন দিন অপেক্ষা করে। রপ্তানিকারকেরা নিজেরাই অতিরিক্ত দিন থাকার জন্য ট্রাকগুলোকে ডেমারেজ দিয়ে থাকেন। আগামীতে ৮০ লাখ বিলিয়ন ডলারে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে পণ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটাতে হবে।

দেশের রপ্তানি ও আমদানির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ইত্যাদি বিবেচনায় শিপিং ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতকে ‘সেবাশিল্প’ ঘোষণা করা উচিত। শিল্প ঘোষণা হলে এই সেক্টরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উত্সাহিত হবে। প্রতিযোগিতামূলক লজিস্টিক অবকাঠামো সৃষ্টি হবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশে লজিস্টিকস সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি হবে এবং পরিষেবা দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমাবে।

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই। এখন উত্তরাধিকারীর হাতে লাইসেন্স হস্তান্তরের জন্য পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে। বিধিমালায় আছে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, কয়েক দশক ধরে যে প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করে আসছে, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের মৃতু্যর পর উত্তরাধিকারী পরীক্ষায় ফেল করলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হবে? এসব প্রতিষ্ঠান কিন্তু দক্ষ লোকবল দিয়ে চালানো হয়। তাদের পরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়। বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার। শিপিং লাইসেন্স নিয়েও একটি স্বতন্ত্র নীতিমালা থাকা উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এত বছরেও তা হয়ে ওঠেনি।

পরিশেষে বলা যায়, লজিস্টিকস খাত বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দক্ষ লজিস্টিকস প্রতিযোগিতামূলক খরচে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যে দেশকে সাহাঘ্য করে থাকে। তাই দেশের রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য এই সেক্টরের সক্ষমতা বৃদ্ধি তথা লজিস্টিকস শিল্পের উন্নয়নে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

লজিস্টিকসকে আরো দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে আমরা রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে আমাদের অংশীদারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারি এবং দেশের অভ্যন্তরে পণ্যমূল্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করতে পারি। পরিশেষে নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব বন্দর ব্যবহারকারীদের নিয়ে মুক্ত আলোচনা শুরু করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ মার্চ আরব আমিরাতের সঙ্গে জাহাজ বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার আয়োজন প্রশংসার দাবি রাখে।

লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফা)