শুরু হলো পবিত্র মাহে রমজান। রমজান ঘিরে মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে নিত্যপণ্যে মূল্যছাড় দেওয়া হলেও বাংলাদেশে উলটো নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো অভিযোগ ওঠে। বিগত বছর ধরে এমনই অভিযোগ করে আসছেন ক্রেতারা। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও রমজান ঘিরে রাজধানীতে আরেক দফা নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) থেকে রবিবার (৩ এপ্রিল) রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
কয়েকদিন আগে থেকেই নিত্যপণ্যসহ কাঁচা সবজির বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। বেড়েছে খেজুরসহ সব ধরনের ফলের দাম। একইসঙ্গে দাম বেড়েছে মাছসহ সব ধরনের মাংসেরও। গরুর মাংসের দাম বেঁধে দেওয়া হলেও সুযোগ বুঝে ব্যবসায়ীরা বাড়তি টাকা নিচ্ছেন। দাম বেড়েছে ছোলাসহ ডাল জাতীয় ভোগ্যপণ্যের।
রমজানে বাড়তি চাহিদাযুক্ত পণ্যগুলোর মজুদে কোনো ঘাটতি না থাকলেও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সরকারি সংস্থাগুলো বলছে, রমজানে যেসব পণ্যের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়, সেগুলোর মজুদ পরিস্থিতিতে কোনো সংকট নেই। সাপ্লাই চেইনও স্বাভাবিক রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দাম বৃদ্ধিরও কোনো কারণ নেই।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গেলো দুই মাস বাজারে তেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রতি ভোজ্যতেল আমদানির ওপর ১০ শতাংশ মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) কমিয়েছে। বর্তমানে বাজারে বোতলজাত ৫ লিটার সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ৭৬০ টাকাতে। তবে এক লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দামে। বাজার ভেদে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। আর খোলা সয়াবিন তেলের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, গত বছর এই দিনে বোতলজাত ৫ লিটার সয়াবিন বিক্রি হয়েছিল ৬৫০ টাকাতে। আর প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বাজারভেদে ১২২-১২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
ইফতারির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরের দামও নতুন করে বেড়েছে। খেজুরের মান অনুযায়ী খেজুরের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ গতবছর খেজুরের মান অনুযায়ী খেজুরের কেজি বিক্রি হয়েছিল ১৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
এ বছর খেজুরের দাম বাড়ার বিষয়ে একাধিক খেজুর ব্যবসায়ী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, রোজার কারণে খেজুরের দাম একটু বাড়তি। এক মাস ধরেই খেজুরের দাম বাড়ছে। গত কদিনে কেজিতে আরও ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। ১০-১৫ রোজা পর্যন্ত খেজুরের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। ১৫ রোজার পর দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া গত বছর প্রতি কেজি সাদা ও লাল চিনি ৬৫-৭০ টাকাতে বিক্রি হলেও এ বছর প্রতি কেজি সাদা ও লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকায়।
গত বছর প্রতি কেজি প্যাকেট আটা ও ময়দা বিক্রি হয়েছিল ৩৫ টাকা ও ৪৫ টাকাতে। এ বছর প্রতি কেজি প্যাকেট আটা ও ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা ও ৬৫ টাকায়।
ইফতারির অন্যতম অনুষঙ্গ ছোলা। গত বছর মানভেদে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হয়েছিল ৬৫ টাকা, এ বছর কেজি ছোলার ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর গতবছর আলু প্রতি কেজির মূল্য ছিলো ২০ টাকা। এ বছর প্রতিকেজি আলু আগের বছরের দামে বিক্রি হচ্ছে।
এ বছর রোজা উপলক্ষে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা ও বিদেশি রসুন ১৩০ টাকা। গত বছর প্রতি দেশী পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৩৫ টাকা ও বিদেশি রসুন ১০০ টাকা।
কাওরান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মান্নান মিয়া বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় প্রতিটি সবজি প্রকারভেদে ২০ থেকে ৭০ টাকা বেড়েছে। এরমধ্যে টমটো প্রতি কেজি ৬০ টাকা, শসা ১০০ টাকা, বেগুনের দাম ৯০-১০০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, সজিনা ১৫০ টাকা, পেঁপে ৬০ টাকা, উস্তে ১০০ টাকা, শিম ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লাউ প্রতি পিস ৫০-৬০ টাকা, লেবু প্রতি ডজন ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন বলেন ওই ব্যবসায়ী।’ দাম বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি আরও বলেন, ‘রোজার সময় পাইকাররা দাম বাড়ায়। আমরা বেশি দামে কিনি, তাই বেশিতে বিক্রি করি।’
তবে মোটা চালের দাম নতুন করে খুব একটা না বাড়লেও চিকন চালের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি চিকন চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৬ থেকে ৮০ টাকায়। এছাড়া মাঝারি মানের চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬০ টাকা।
গত বছর এই সময় প্রতি কেজি চিকন চালের দাম ছিল ৫৫-৬০ টাকা। আর মাঝারি মানের চালের কেজি তখন বিক্রি হয়েছিল ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা।
চালের এ ঊর্ধ্বমূল্য নিয়ে বাড্ডার রহিম শেখ জানান, এক মাস ধরেই চালের বাজার বাড়তি। গত কদিনে চিকন চালের দাম আরও বেড়েছে। আর গত বছরের তুলনায় ২০ টাকা করে দাম বেড়েছে। এখন আমাদের সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে।
এদিকে গত বছরের তুলনায় মাংসের বাজার চড়া। গত বছর প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ৫৫০-৬০০ টাকা ছিল। খাসির মাংসের দাম ছিল ৮০০-৯০০ টাকা। এ বছর প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৫০-৬৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খাসির মাংস ১ হাজার টাকা।
মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে। সোনালি মুরগি ৩৬০টাকা, ব্রয়লার ১৮৫ টাকা ও লেয়ার ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দাম ডজন প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা কমেছে। প্রতি ডজন ডিম ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ সময় প্রতি কেজি সোনালী মুরগি ৩০০ টাকা, ব্রয়লার ১৫০ টাকা ও লেয়ার ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল।
বাজার তদারকির দায়িত্বে রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর ও সিটি কর্পোরেশন৷ এর বাইরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিয়ত বাজার মনিটরিং করার কথা।
একইসঙ্গে বাজারে আগে থেকেই কাজ করছে সরকারের চারটি গোয়েন্দা সংস্থা। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বাজারে মূল্য পরিস্থিতি ঠিক রাখতে ৫টি নিত্যপণ্য মসুর ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি, খেজুর ও ছোলা বিক্রি করছে৷ অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে খোলা বাজারে বিক্রি করছে।
রমজানে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার গত ১৩ মার্চ টাস্কফোর্স গঠন করে। ১৭ সদস্যের এই টাস্কফোর্সের প্রধান হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।টাস্কফোর্সের কাজের মধ্যে রয়েছে, দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা, আন্তর্জাতিক বাজার দর এবং আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখলে তা নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম গ্রহণ, পণ্য উৎপাদন, পরিশোধন, আমদানি এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রয়সহ সবকিছু পর্যবেক্ষণ ও দিক নির্দেশনা দেওয়া, নিত্যপণ্যের চেইন স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ, বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং দিক নির্দেশনা দেওয়া।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মো. আফজাল হোসেনও টাস্কফোর্সের সদস্য। তিনি বলেন, ‘দেশি এবং আমদানি করা কোনো ধরনের পণ্যের বাজারেই যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অথবা বাজারে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করে পণ্যের দাম কেউ বাড়াতে না পারে সেটাই আমরা প্রধানত দেখব। আমরা নিয়মিত বিভিন্ন পণ্যের দেশি এবং আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করি। সেখান থেকে যৌক্তিক দামের বাইরে গেলেই আমরা ইন্টারাপ্ট করব।’
এদিকে পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কঠোরভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক জানিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারের সময়োপযোগী ও ত্বরিত পদক্ষেপের ফলে ইতোমধ্যে তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে কাউকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও ফায়দা লুটার কথা ভাবছে ও অপচেষ্টা করছে, তারা চরম হতাশ হবে।’