টিপ পরায় শিক্ষককে গালি: দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি বিশিষ্টজনের

তেজগাঁও কলেজের  শিক্ষক লতা সমাদ্দারকে টিপ পরা নিয়ে পুলিশ সদস্যের গালি দেওয়াকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আইন অঙ্গনের নারীরা বলছেন, টিপ নিয়ে এভাবে কোনো নারীকে গালি দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ ও মানবাধিকার-সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার মতো ঘৃণ্য অপরাধ। রবিবার (৩ এপ্রিল) ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে তারা এমন প্রতিক্রিয়া জানান। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘এটি একটি সাম্প্রদায়িক কমেন্ট, স্পেশালি যখন কোনো নারীর টিপ পরার বিতর্ক নিয়ে কমেন্ট করা হয়, বাজে কমেন্ট করা হয়, তখন সেটি সাম্প্রদায়িক কমেন্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি নারীকে সমাজ কিভাবে দেখবে, নারীর চাল-চলন পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা, সেই জায়গা থেকেও যখন ট্রল করা হয়, তখন সেটি সাম্প্রদায়িক কমেন্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত একটি রাষ্ট্রের বাহিনী থেকে যদি এমন কমেন্ট করা হয়, তখন সেটি আসলে গুরুতরভাবে আমলে নেওয়া প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, রেসিজম, সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে সচেতনতামূলক  আলোকপাত করা প্রয়োজন। এই ঘটনায় যেন যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে  এই ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে।’

প্রায় একই প্রতিক্রিয়া জানালেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট’-এর সহকারী অধ্যাপক ইশিতা আকতারও। তিনি বলেন, ‘এই যে ক’দিন আগে যে ঘটনাটা ঘটে গেলো, তুমি বলায় ভালো হয়েছে। আসলে এটা ভাবতে হবে, কালচারালি আমাদের সমাজ কিভাবে চলছে। বিশেষত ধর্মীয় গোঁড়ামী  সমাজে এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এক ধরনের হেজেমনি তৈরি হচ্ছে। সেটা নারীর ওপর পুরুষের হেজেমনি। তবে এর  রূপটা আরও বড়। এর পেছনে ধর্মীয় গোঁড়ামির মতো সামাজিক সমস্যাও অনেক প্রবলভাবে অবস্থান করছে।’

নাট্যনির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী বলেন, ‘আমি যখন ছায়ানটে যাই, গান শিখতে তখন থেকে আমি কপালে টিপ পরি। আমার যত বছরের বিবাহিত জীবন, তত বছরের বিবাহিত জীবনে কেউ আমাকে কখনো লাল টিপ ছাড়া দেখেনি। যখন আমাদের দেশে বাবরি মসজিদ ঝামেলা হলো, অনেক মন্দির ভাঙা হলো, তখনো আমার মা শাঁখা-সিঁদুর পরে ছিলেন। আমরাও শাঁখা-সিঁদুর পরেই রাস্তায় হাঁটাচলা করেছি। তো টিপ পরা আমার কাছে আসলে খুব ন্যাচারাল। আমি মনে করি, এটা আমার কালচার আর স্বাধীন দেশে আমি একজন বাঙালি মানুষ। সুতরাং আমার কালচারে আমি স্বাধীন, আমি বাঙালি, আমি কী করবো, সেটা আমার ইচ্ছা। আমি আগে কখনো এরকম শুনিনি। কিন্তু আমি যখন আজকে শুনলাম, একটু অবাকই হলাম। তো আমাকে অনেকেই ইনবক্স করছে যে তুমি একটা ছবি তুলে এডিট করে কপালে লাল টিপ দাও। আমি বলি হ্যাঁ, আমি তো সারাজীবন কপালে লাল টিপ দিয়েই আসছি। আমি আবার নতুন করে কী দেবো? আমার তো দেওয়াই আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বোঝাই যাচ্ছে এটা একটা সাম্প্রদায়িক ইস্যু। এটা আসলে খুবই লজ্জাজনক আমি এই ঘটনাকে ধিক্কার জানাই।’ 

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী দিলরুবা শারমিন বলেন, ‘গতকালকে যে  ঘটনা  ঘটে গেলো, তা আমাদের একটি ইঙ্গিত দেয়। গতকাল একজন পুলিশ কর্মকর্তা,  তিনি মুসলমান হতে পারেন সেটার তার ব্যাপার, তিনি হিন্দু কোনো মেয়েকে বলতে পারেন না যে, তিনি কেন চুড়ি কেন পরেছেন। তিনি যে প্রথম অন্যায় করেছেন, তা সংবিধান অনুযায়ী ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছেন। দ্বিতীয় যে অপরাধটি করেছেন, নারীকে অসম্মান করেছেন। তো সেই ভদ্রমহিলা ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি  ব্যবস্থা নিতে পারেন।  মানহানির মামলাও করতে পারেন।’

দিলরুবা শারমিন আরও বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে ওই পুলিশ সদস্য ভায়োলেশন করেছেন। ভুক্তভোগী চাইলে সেই মামলাও করতে পারেন। এখন পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সে এখানে কী করতে পারে? পুলিশের আইন অনুযায়ী পুলিশ সদস্য হয়ে কোনো সাধারণ জনগণকে হয়রানি করতে পারেন না,  অশ্লীল কথা বলতে পারেন না। সেক্ষেত্রে পুলিশ হেড কোয়ার্টারকে এই পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। পুলিশ প্রশাসন, মানে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালকে এর বিচার করতেই হবে। এক্ষেত্রে পুলিশ হেড কোয়ার্টার যেমন পারে, সেই অনুযায়ী লতা সমাদ্দার আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।’

এই মানবাধিকারকর্মী আরও বলেন, ‘শুধু যে লতাই পদক্ষেপ নেবেন, তা নয়। যেকোনো নাগরিক চাইলেই এই ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। তার মানে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনিভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে। তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও এটি খুব অন্যায় দিক। আমাদের এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, অনেক রক্তের বিনিময়ে। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবারই সমানাধিকার চর্চা করে সমাজে অবস্থান করবে। সেখানে কোনো অবস্থাতেই একজন নাগরিক অন্য একজন নাগরিককে এমন কথা বলতে পারেন না।  লতা সমাদ্দারের পায়ের ওপর দিয়ে মোটরবাইক চালিয়ে গেছেন ওই পুলিশ সদস্য। এতে অ্যাটেম্পট টু মার্ডার কেসও হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই এটিটিউডটা হচ্ছে তালেবানি এটিটিউট। এই এটিটিউডটা হচ্ছে আপনার মোল্লাবাজি, উগ্রপন্থীদের অ্যাটিটিউড। যে তাদের মতের সঙ্গে মেলে না, তাকে তারা মেরে ফেলে।’ 
     
এই আইনজীবী  বলেন, ‘আপনি দেখুন একটা জিনিস, এইযে পুলিশ সদস্য মোটরবাইক চালিয়ে চলে গেলেন, তিনি জনগণের টাকায় সংসার চালান। তারা যদি আমাদের হত্যা করতে উদ্যত হয়,  তারা যদি রেপ করে, আবার তাদের কাছে গিয়ে কেস করতে চাইলে তারা বলবে, তুমি তো রেপ হবেই।’