এই মুহূর্তে ভাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন। সর্বোচ্চ যে লক্ষ্য নিয়ে তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন সেখান থেকে সরে আসছেন, তার সৈন্যবাহিনী কিয়েভের আশপাশ থেকে পিছু হটছে, সাম্রাজ্য বিস্তারের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন এখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। সম্পদ এবং বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে রাখার তার আরো যেসব ক্ষুদ্র লক্ষ্য ছিল সেখান থেকেও পিছু হটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গত এক মাস ইউক্রেনিয়ানদের অসীম বীরত্ব এবং পশ্চিমাদের অকুণ্ঠ সমর্থন পুতিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তীব্রভাবে আঘাত করেছে।
কিন্তু পুতিন রাশিয়ায় তার যুদ্ধে হারছেন না। যুদ্ধবিগ্রহের শুরু থেকেই পুতিনের সর্বোচ্চ উচ্চাকাঙ্ক্ষার জবাবে পশ্চিমাদের আকাক্সক্ষা, ক্রেমলিনের শাসনের পরিবর্তন হবে-কথাটি উত্তেজনাবশত জো বাইডেন মুখ ফসকে বলেও ফেলেছেন। যদিও এটি তাদের অফিশিয়াল লক্ষ্য নয়। তার পরও তাদের চাওয়া একটি ব্যর্থ যুদ্ধ পুতিনকে উচ্ছেদ করবে এবং সেখানে ন্যায়সংগত একটি সরকার ক্ষমতায় বসবে।
এটি অবশ্য সব সময়ই একটি ক্ষীণ আশাই ছিল, কিন্তু সামরিক নাকানিচুবানি এবং নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, সেই আশা আরো ক্ষীণ হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষা আর উপাখ্যান একইভাবে বলছে, পুতিন রাশিয়ান নাগরিকদের সম্মিলিত সমর্থন পাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে। এমন একটি জাতির সমাবেশ ঘটাচ্ছেন ঠিক যেমনটা তিনি বর্ণনা করেছিলেন। মনে হচ্ছে পুতিন তাদেরকে জব্দ করে রেখেছে আর তারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘিরে রেখেছে তাকে।
রাশিয়ার একমাত্র স্বাধীন সমীক্ষকের মতে, পুতিনের সমর্থনের যে রেটিং দেখা যাচ্ছে, সেটি ৯/১১-এ হামলার পর জর্জ ডব্লিউ বুশ যে সমর্থন পেয়েছিলেন তার মতোই। তাকে ঘিরে যে অভ্যন্তরীণ বৃত্ত রয়েছে তারা পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চান না। কেন তারা সেটি চাইছেন না কারণগুলো কয়েক সপ্তাহ আগে দ্য ফিনানশিয়াল টাইমসে বর্ণনা করেছেন অ্যানাটল লিভেন, পুতিনের সহযোগীরা একই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে, একই ভূরাজনৈতিক গরিমা তাদের এবং হঠাৎ করে তাদের নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘ সময় নির্মমভাবে যুদ্ধ করে যাওয়ার পক্ষপাতী তারা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ এই বৃত্তের বাইরেও আরো বিস্তৃত পরিসরে যেসব রাশিয়ান অভিজাত শ্রেণি রয়েছে, এই যুদ্ধ তাদের মধ্যে বিভক্তির পরিবর্তে আরো পশ্চিমাবিরোধী ঐক্য তৈরি করেছে।
সাংবাদিক ফরিদা রুস্তমভা তার সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে বলেন, রাশিয়ান অভিজাত শ্রেণিদের একত্র করার যে স্বপ্ন পুতিন দেখেছিলেন সেটি সত্যি হয়েছে। এই মানুষগুলো বুঝতে পারছে, তাদের জীবন এখন শুধু রাশিয়ার মধ্যেই বাঁধা পড়ে গেছে। এবং এর মধ্যেই তাদেরকে নিজেদের গড়তে হবে।
যে সিস্টেম ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সমীক্ষা এবং গালগল্পকে প্রশ্ন তোলার অবশ্যই যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু এই ধরনের উদাহরণ কিন্তু অবাক হওয়ার কোনো বিষয় নয়। হ্যাঁ যুদ্ধের ব্যর্থতা কখনো কখনো কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থাকে দমন করে। যেমন :ফকল্যান্ডে আর্জেন্টিনার জান্তার দুঃসাহসিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ প্রায়শই সংশ্লিষ্ট দেশগুলির অভ্যন্তরীণ শাসনকে শক্তিশালী করে। নিকট ভবিষ্যতে তারা দোষ চাপানোর উপায় খুঁজে পায়, নেতৃত্বকে দোষারোপ করার পরিবর্তে তাদের দুর্দশার জন্য শত্রুপক্ষকে দায়ী করা যায়। কিন্তু শেষমেশ তারা গণতান্ত্রিক পথে না হেঁটে রাষ্ট্রকে আরো শোষণ করতে শুরু করে, একাডেমিক সাহিত্য সেই কথাই বলে।
যুক্তরাষ্ট্র যেসব স্বৈরশাসকদের দ্বারা চালিত দেশগুলিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে, সেই দেশগুলির তালিকা বিবেচনা করা যেতে পারে। কিউবা থেকে শুরু করে উত্তর কোরিয়া, ইরান থেকে ভেনিজুয়েলা-২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পূর্ব পর্যন্ত অবস্থা বাদই দেওয়া যাক, প্যাটার্নটা সহজেই অনুমেয়। মানুষ দুর্দশা ভোগ করে, শাসন শক্তিশালী হয়।
এটা আমাদের অনুমান, নিশ্চয়তা নয়। তবে এটা একটা পথ বাতলে দিতে পারে। বিচ্ছিন্ন এবং নিষেধাজ্ঞার পক্ষ মাথায় নিয়ে চলা রাশিয়ার বেলাতেও এটি সমান সত্যি। এমনকি অর্থনৈতিক দুর্দশায় পুতিনের সমাবেশ ফিকে হয়ে এলেও আর রাশিয়ান ফোর্সের দুর্গতি চরম সীমায় পৌঁছালেও তারা সংস্কারমুক্ত হবে না। এবং নেতৃত্বের যে কোনো পরিবর্তন ঘটলে সেটি ১৯৮৯ সালের বিপ্লবের মতো হবে না, সেটি হবে হুগো শ্যাভেজ যেভাবে নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন, তেমনই।
এই অনুমানটির দুটি নিহিতার্থ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে যুদ্ধটা নিজেই, নিকট ভবিষ্যতে ইউক্রেন যা পুনরুদ্ধার করবে, সেটি শুধু যুদ্ধের ময়দানেই। মস্কো আলোচনার টেবিলে যে বন্ধুসুলভ রাশিয়ার সরকারের চিত্র উপস্থাপন করবে তার থেকে ইউক্রেন কিছুই পাবে না। তার মানে এই নয় যে, আমেরিকার হুট করে সামরিক তৎপরতা বাড়াতে হবে, পারমাণবিক যুদ্ধের জন্য উৎসাহী হতে হবে। কিন্তু এই কথার তাৎপর্য হচ্ছে আমেরিকার ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনকে আরো দৃঢ় আর টেকসই করাটাই মূলনীতি হওয়া উচিত, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা যেখানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
দ্বিতীয় তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি সুদূরপ্রসারী, কোনোভাবে যখন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, বিশেষ করে সেই শান্তি যদি চেপে রাখা দ্বন্দ্ব হয় যেখানে পুতিন ইউক্রেনের কোনো অঞ্চল দখলে নিয়ে সেটিকে নিজের বিজয় বলে জাহির করবে, তখন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, এবং এই যুদ্ধকে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত চলমান রাখার কথাও বলা হবে।
একদম এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তর্কবিতর্ক চলমান রয়েছে, কিন্তু এই ধরনের কেসের ক্ষেত্রে আমাদের পরিষ্কার হতে হবে-সরাসরি যুদ্ধ না হলেও ইউরোপের শান্তির জন্য রাশিয়া শত্রুই হয়ে থাকবে এবং একইভাবে আমেরিকার ইন্টারেস্টের ক্ষেত্রেও রাশিয়া শত্রুভাবাপন্ন এবং হুমকি হয়েই থাকবে। তাই এমনভাবে নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেন রাশিয়ার ক্ষমতা এবং সম্পদ শুধু তাদের আÍরক্ষায় যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুতেই সীমিত করা যায়। এটি পূর্ব ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বিস্তৃত পরিসরে আমেরিকার স্বার্থের জন্যই।
এই তর্কবিতর্ক, যুক্তির মানে এই নয় যে, পুতিনের শাসনের জন্যই রাশিয়ার নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, কিংবা এই সমন্বিত নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়াই উপকৃত হবে। অথবা এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো কল্পিত বিপ্লব সংঘটিত হবে।
আমাদের যদি রাশিয়ার ওপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় থাকে, সেক্ষেত্রে খুব পরিষ্কারভাবে হিসাবনিকাশ করতে হবে। খুব বিপজ্জনক এক পরাশক্তিকে যতটা সম্ভব দুর্বল করে দেওয়া যায়, সেই প্রত্যাশায় আগাতে হবে। মাথায় রাখতে হবে আমাদের এই কার্যক্রম চলমান রাখতে হতে পারে দশকের পর দশক পুতিনিজম শাসনের বিরুদ্ধে, এবং রাশিয়া আমাদের চরম শত্রুই থেকে যাবে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর-এইচ এম নাজমুল আলম