জীবনের বিপরীতমুখী সমীকরণটা মেলানো দরকার

খুব অদ্ভুত এই পৃথিবীর নিয়ম। পৃথিবীর একদিকে সূর্য যখন উঠছে আরেক দিকে সূর্য তখন ডুবছে। এমন করেই পৃথিবী কখনো ঝলমলে আলোয় হাসছে, আবার কখনো জৌলুসহীন অন্ধকারের কাঁদছে। তবে অন্ধকার আকাশ আলোর আকাশের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। যেখানে সোনালি চাঁদ আর ঝুলন্ত ফানুসের মতো তারাগুলো কী এক মায়াবী জাদু মানুষের চোখের ভেতর দিয়ে মনের গভীরে ঢুকিয়ে দেয়। কান্নার মূল্য কখনো কখনো হাসির চেয়ে অনেক বেশি হয়। কান্নায় যতটা বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে, হাসিতে ততটাই অভিনয় লুকিয়ে থাকে। কান্না ঠিক যতটা সত্য, হাসি ঠিক ততটা মিথ্যে। ঠিক যেন উপাখ্যানের মতো, যেখানে সত্যের ভেতরে মিথ্যে আর মিথ্যের ভেতরে সত্য নিজেদের গোপন করে রাখে। চার্লি চ্যাপলিন সারা পৃথিবীর মানুষকে হাসালেও নিজে ভেতরে ভেতরে কেঁদেছেন। তার কান্নাটা তিনি মানুষকে কখনো দেখাতে চাননি। কাচের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আয়নার ভেতরের চার্লি চ্যাপলিনকে দেখাতে চেয়েছেন। স্বার্থপর পৃথিবীর ইট-পাথরের মানুষকে কান্না স্পর্শ করে না, বরং মানুষ মানুষের কান্নাকে পুঁজি করে বাণিজ্যিক পৃথিবীতে তার আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। মানুষের প্রাণ থাকলেও সেখানে প্রাণের স্পন্দন নেই, আয়নার প্রাণ নেই, তার পরও জড়তার নির্বাক দর্শনকে ধারণ করে আয়না মানুষের কাছাকাছি থাকে। চার্লি চ্যাপলিন আয়নার ভেতরে তার কান্নাকে দেখতে দেখতে আনমনে বলেছেন, আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু হচ্ছে আয়না। কারণ যখন আমি কাঁদি, সেও আমার সঙ্গেই কাঁদে। মানুষ বিশ্বাসঘাতক হয়, আয়না কখনো বিশ্বাসঘাতক হয় না। রাস্তার একটা কুকুরকে এক বেলা খাওয়ালে সে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ ও আনুগত্যশীল হয়ে ওঠে, অথচ মানুষকে দিনের পর দিন পেটপুরে খাওয়ালেও মানুষ সুযোগ পেলেই মানুষের বিশ্বাসে আঘাত হানতে পারে। কখনো কখনো কুকুরদের মতো পশুদের মনুষ্যত্বের কাছে মানুষের মনুষ্যত্ব হার মানতে বাধ্য হয়। খুব বিস্ময়কর এই সমীকরণটা, যেটা বোঝা না-বোঝার দোদুল্যমান শূন্যতায় ভাসতে ভাসতে কোনো একটা জায়গায় জয়-পরাজয় ছাড়াই আটকে যায়। অনেকটা অমীমাংসিত খেলার মতো। ঝুলন্ত বাসে ঝুলে থাকা মধ্যবিত্ত মানুষের প্রতিদিনের লড়াইয়ের টানাপড়েনে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে থাকা স্বপ্নের মতো। যে স্বপ্ন কখনো ধরা দেয় না, বরং কঠিন বাস্তবতা হয়ে মানুষকে পরীক্ষায় লেখাতে বসায়। সে পরীক্ষার খাতায় যা লেখা হয়, সেটাই অদৃশ্য হয়ে যায়। সেখানে কোনো উত্তর থাকে না, প্রশ্ন থাকে না, পাশ-ফেল থাকে না। কেবল একটা মুখ থাকে, মুখের ভেতর মানুষ থাকে, মানুষের ভেতর মুখোশ থাকে। তবে মুখোশটা মানুষের ভেতর থেকে বের হয়ে এসে মানুষকেই একদিন খেয়ে ফেলে। 

প্রতিদিন যে মানুষটা জীবনের কাছে হারছে, সেটাই হয়তো তাকে মানুষ হবার মূল্য বোঝাচ্ছে। আবার প্রতিদিন যে মানুষটা জিতছে, সেটাই হয়তো তাকে জয়ের মূল্য বুঝতে দিচ্ছে না। সব পরাজয়ে গ্লানি থাকে না, আবার অনেক জয়ে আনন্দ থাকে না। যেটা মানুষ জয় বলে দেখছে, সেটাই হয়তো পরাজয়। যেটা মানুষ পরাজয় হিসেবে দেখছে, সেটাই হয়তো জয়। জিতলেই জয় হয় না, হারলেই পরাজয় হয় না। জয়-পরাজয়কে বিচার করা খুব কঠিন। সবাই এই বিচারটা করতে পারে না, যাদের বাইরে ও ভেতরে মানুষ নামের সাদা মনের সরল মানুষটা থাকে, তারাই এই বিচারটা করতে পারে। 

কনকনে শীতে যে মানুষটা থরথর করে কাঁপছে, সে বোঝে শীত কতটা নির্মম। শীত কতটা বাস্তব। এক টুকরো গরম কাপড় কতটা মূল্যবান। যাদের দামি দামি গরম কাপড় থাকে, তাদের কাছে শীতের মূল্যই-বা কতটুকু। তারা গরম চাদর মুড়ি দিয়ে নিজের সুখের কথা ভাবে, তারা শীতে জবুথবু হয়ে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা মানুষের কথা ভাবে না। সুখ মানুষকে এভাবে স্বার্থপর করে, দুঃখ মানুষকে জীবনের কঠিন সত্য নগ্ন করে দেখাতে দেখাতে উদার করে তোলে।

ক্ষুধার্ত মানুষটা বোঝে ক্ষুধার কতটা যন্ত্রণা। খালি পেটে স্বপ্ন থাকে না, গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র থাকে না, চোখে দামি মডেলের সানগ্লাস থাকে না; অথচ অসহায় জীবনকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে টানটান উত্তেজনায় রেখে জীবনের মূল্যকে বোঝানোর আকুতি থাকে। ক্ষুধার জ্বালা মানুষকে জানিয়ে দেয় খাদ্য কতটা মূল্যবান। আর খাদ্যের কাছে সারা পৃথিবীর সব রাজকীয় সম্পদ কতটা মূল্যহীন। আগুনে পোড়া কয়লা পুড়তে পুড়তে যেমন বুঝে আগুনের দহনজ্বালা কতটা অসহনীয়। যেখানে কয়লা পুড়তে পুড়তে একসময় ছাই হয়ে যায়। কোনো কোনো মানুষের কাছে এই ছাই মূল্যহীন হয়। ছাইয়ের আবার মূল্য কী। দমকা বাতাস এসে ধাক্কা দিলেই ছাই প্রকৃতিতে তার অস্তিত্ব হারায়। অথচ যে মানুষটা ছাইয়ের ভেতর প্রবেশ করে ছাইয়ের দুঃখকে বুঝতে পারে, তার কাছে ছাই অমূল্য সম্পদ হয়ে যায়। মানুষের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটা নেতিবাচক চিন্তার সীমান্ত পেরিয়ে ইতিবাচক চিন্তার কাছে পৌঁছাতে পারলেই সবটাই দেখা যায়। না, দেখাটাও তখন দেখা হয়ে ওঠে। এই অবাঞ্ছিত ছাই মানুষের মৌলিক চাহিদার একটা উপাদানও হতে পারে। ভাবনাটা খুব অদ্ভুত, তবে ভাবনার ভেতরের সত্যকে স্বীকার করতে তো ভয় নেই। আধুনিক নগরের দালানকোঠাগুলো বুক ফুলিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে সিমেন্টের শক্তিও ওপর ভর করে। আর এই সিমেন্টের একটি উপাদান ছাই। ছাই কখনো জৈব সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে মাটির পুষ্টি উপাদান হিসেবে কাজ করে ফসলের উৎপাদন বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে ছাই এভাবেই ত্যাগের মন্ত্র দ্বারা তাড়িত হচ্ছে। ছাইয়ে থাকা কার্বন পাউডার দিয়ে প্রসাধনসামগ্রী, ব্যাটারি, কার্বন পেপার, পানির ফিল্টারের উপাদান, দাঁত পরিষ্কার করার ওষুধ ও ফটোকপি মেশিনের কালি তৈরি করা হচ্ছে। মৃৎশিল্পেও ছাইয়ের ভূমিকা অনন্য। মানুষ প্রতিদিন ডাস্টবিনে অনেক খাবার ফেলে দেয়, যেটা অনেক ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরাতে পারত। হয়তো ডাস্টবিনে পড়ে থাকা অসহায় খাবারগুলো সেটা বুঝতে পারে, কিন্তু বলতে পারে না। বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না। খাবার মানুষের মৌলিক চাহিদা; কিন্তু সেটা যখন প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন সে খাবারের আর কোনো মূল্য থাকে না। বঞ্চিত ও শোষিত হয় অসহায় মানুষ আর খাবারগুলো চিনতে পারে স্বার্থপর মানুষদের। এমন করেই সুপ্ত সত্য বেরিয়ে এসে একটা মূল্যবান বার্তা পৃথিবীকে দেয় তা হলো মানুষের পেট ভরে গেলে মানুষের আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসে। কেবল খাবার নয়, মানুষের টাকাও বাড়ছে। সে টাকা আর দেশে রাখা যাচ্ছে না। টাকার যেন পাখা গজিয়েছে। সে পাখায় ভর করে কালো টাকা এখন বিদেশে পাড়ি জমানো শুরু করেছে। মানুষের রঙ্গশালা সব রং ছড়িয়ে এখন রংবাজিতে পরিণত হয়েছে। সবখানেই অবৈধ সিন্ডিকেট। সবখানেই প্রতারণা। সবখানেই অবৈধতা। সবখানেই অসততা। সব বেশি বেশি নয়, সব ভালো ভালো নয়। অর্থনৈতিক প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানবিক প্রগতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও রিচার্ড এইচ থেলার এমনটাই বলেছেন। অর্থনীতির বস্তুবাদী ধারণার জায়গায় অর্থনীতিকে  মানবিক মূল্যবোধের ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। 

হুমায়ূন আহমেদ রচিত নক্ষত্রের রাত নাটকের একটা সংলাপ এমন ছিল, ‘জগৎটা বড়ই অদ্ভুত। এই দুনিয়ায় নানান কিসিমের মানুষ আছে। পাগল মানুষ, আধাপাগল মানুষ, শিক্ষিত মানুষ, মূর্খ মানুষ। একেক মানুষের আবার একেক রকমের চিন্তাভাবনা। এই যেমন ধরেন, আমারে আইসা যদি কেউ বলে যে, হাসান মিয়া তোমারে সারা দুনিয়া ঘুইরা দেখাব বিনিময়ে তোমার চোখ দুটা দিতে হবে। বাকি জীবন অন্ধ থাকবা। আমি রাজি হয়ে যাব। আনন্দের সঙ্গে রাজি হব, কিন্তু আপনি হবেন না।’ সংলাপটা খুব অদ্ভুত, সংলাপটা কানে এসে বাজলে মনে হতে পারে, আরে মানুষটা তো খুব বোকা। বোকা মানুষের ভেতরে একটা নিখাদ মন থাকে। বোকারাই বোকামি করতে গিয়ে পৃথিবীর ইতিহাস বদলায়। সংলাপটা আপাতদৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক মনে হলেও এটি দর্শনগত দিকটি মূল্যবান। আসলে বোকা মানুষটা নিজের চোখ দান করে অন্যের অন্ধত্বকে জয় করতে চায়। সে বোঝে, চোখ চলে গেলে সারা পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য তার পক্ষে  চোখ দিয়ে দেখা সম্ভব নয়, তার পরও তার মহতী মন বোকা সেজেছে। কারণ মানুষের চোখের আলোর কাছে সারা পৃথিবী দেখার আনন্দ যে ম্রিয়মাণ। তবে মানুষের মুখের ওপরটাতে বসানো চোখের চেয়ে মনের চোখের মূল্য যে অনেক। এটা মানুষেরা বোঝে, মানুষের মতো দেখতে অমানুষেরা বোঝে না। পৃথিবীতে সবকিছুর দুটি দিক থাকে। ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, জয়-পরাজয়, সবগুলোই বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত। তবে তার মধ্যে যা ইতিবাচক সেটাই গ্রহণ করতে হবে। তবেই হয়তো আবার মানুষদের দেখা মিলতে পারে। কারণ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।  
লেখক :শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও লেখক ঢাকা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর