গ্যাস না দিয়েই বিল আদায় করছে তিতাস

নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ না করেই গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল আদায় করছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। গ্যাস না পেয়ে শিল্পগ্রাহকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না করতে পারলেও তাতে কিছু যায় আসে না কর্তৃপক্ষের। সরবরাহ লাইনে গ্যাসের যে পরিমাণ চাপ থাকার কথা, তা অনেক শিল্পমালিকই পান না। ফলে দিনের অধিকাংশ সময় তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হচ্ছে। আর কোনো কোনো কারখানায় বন্ধ থাকছে উৎপাদন। অথচ একটি কারখানার বিপরীতে যে পরিমাণ গ্যাসের চাপ মঞ্জুর করা হয়, তার ওপর ভিত্তি করে নূ্যনতম চার্জ নিয়ে নিচ্ছে তিতাস। গত কয়েক বছর এ নিয়ে শিল্প মালিকরা নানা জায়গায় অভিযোগ দিলেও সুরাহা হয়নি। উপরন্তু দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের পকেট কাটার পথ আরো প্রশস্ত করেছে সংস্থাটি। গ্যাসের চাপের কারণে অনেক কারখানামালিক তাদের উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

সেবা না বাড়িয়ে মূল্য বৃদ্ধি: বিভিন্ন সময়ে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানোর কথা বলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। কয়েক দফা দামও বাড়িয়েছে কোম্পানিটি। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়নি বরং দিন দিন আরো খারাপ হচ্ছে। সম্প্রতি দাম বাড়ানো নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) শুনানির মুখে পড়ে তিতাস। সেখানে তারা গ্যাস ব্যবহারকারীদের তোপের মুখে পড়ে। সেখানে ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, মুনাফায় থাকা তিতাস গ্রাহকদের সেবা নিশ্চিত করতে পারে না, অথচ দাম বাড়ানোর অযৌক্তিক আবেদন করে। ঐ সভায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, তিতাসের ৫৪ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার করে শিল্প খাত। অথচ তাদেরকে চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করা হয় না। ঐ সভায় তিনি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে শিল্পমালিকদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে না নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। সিরামিক সামগ্রী রপ্তানিকারক সমিতির প্রতিনিধি গোলাম সরোয়ার সভায় বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় শতশত কোটি টাকার যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আগে সেবা নিশ্চিত করতে হবে তিতাসকে। তারপর দাম বাড়াতে হবে। বিইআরসির তথ্যমতে, গ্যাস খাতের উন্নয়নের জন্য তিতাসসহ এ খাতের কোম্পানিগুলোর কাছে ১২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিল্প খাতের একজন প্রতিনিধি বলেন, এত টাকা ব্যাংকে বসিয়ে রেখে কোম্পানিগুলো এক প্রকার জোর করে শিল্প খাত থেকে টাকা তুলে নিয়ে যেতে চায়। সরকারের শীর্ষমহল থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। কনজু্যমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেছেন, রাজস্ব এবং লভ্যাংশ হিসাবে তিতাসের কাছ থেকে সরকার শত শত কোটি টাকা নিচ্ছে। অথচ এ খাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে যে বাড়তি টাকা দাবি করা হয় তা অযৌক্তিক। মুনাফার অর্থ বিনিয়োগ করা হলে গ্যাসের দাম আরো কমবে বলেও মত দেন তিনি। বিটিএমএর এনার্জি কমিটির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার ইত্তেফাককে বলেছেন, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমরা নানা জায়গায় ধরনা দিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এখন বলা হচ্ছে, আগামী ১০ এপ্রিল থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সে ধরনের কিছুই এখনো আমাদের চোখে পড়েনি। তিনি বলেন, তিতাস আমাদের যে পরিমাণ চাপ মঞ্জুর করে, তা আমরা ব্যবহার করতে চাই। কিন্তু সে চাপ কখনোই আমরা পাই না। কিন্তু নূ্যনতম চার্জ আমাদের পরিশোধ করতেই হয়। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রাজীব হায়দার বলেন, তিতাস এত মুনাফা করে তার পরও গ্যাসের দাম ১১৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। এখন শোনা যাচ্ছে, বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটি তাদের প্রস্তাব বিশ্লেষণ করছে। শেষ পর্যন্ত শিল্প খাতের গ্যাসের দাম ২০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আমরা শুনেছি।

নিজেরাই খাচ্ছে নিজেদের লভ্যাংশ: বিতরণব্যবস্থা আধুনিক করে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করার লক্ষ্যে পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়ে তিতাস গ্যস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি.। হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে পুঁজিবাজারে তিতাসের মোট শেয়ারের পরিমাণ ৯৮ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৮৩১টি। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য (ফেসভ্যালু) ১০ টাকা করে রাখা হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, কোম্পানিটি কোনো সময় লোকসান গোনেনি। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তিতাসের প্রতিটি শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৪০ টাকার বেশি। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, তিতাসের শেয়ারের অধিকাংশই ধারণ করছে তিতাস নিজেই। সরকারের নামে ধারণ করা এ শেয়ারের পরিমাণ ৭৫ শতাংশ। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কোম্পানিটির শেয়ার ধারণ করছে ১৫ শতাংশের মতো। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দশমিক ৫৭ শতাংশ শেয়ার ধারণ করে তিতাসের। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হলেও তিতাসে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হিস্যার পরিমাণ মাত্র সাড়ে ৯ শতাংশ।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্ন সময়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা কখনোই খারাপ ছিল না। প্রতিবারই উল্লেখযোগ্য হারে লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। এসব নগদ লভ্যাংশের হার ২০১৫ সালে ১৫ শতাংশ, ২০১৬ সালে ২০ শতাংশ, ২০১৭ সালে ২২ শতাংশ, ২০১৮ সালে ২৫ শতাংশ, ২০১৯ ও ২০২০ সালে ২৬ শতাংশ, ২০২১ সালে ২২ শতাংশ। এছাড়া কোম্পানিটি স্টক ডিভিডেন্ট হিসাবে দুবার বোনাস শেয়ারও ইস্যু করেছে। সঞ্চালন এবং বিতরণের মাধ্যমে তিতাস এত বছর যে মুনাফা করেছে তার সিংহভাগই তারা ভোগ করেছে। কিন্তু সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি করার নামে দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে কোম্পানিটি।

অপচয় ৩ হাজার কোটি টাকা: এদিকে ব্যস্থাপনায় দুর্বলতা ও অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩ হাজার কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হচ্ছে বলে এক হিসাবে দেখা গেছে। এর পরিমাণ ৬৫ কোটি ঘনমিটার। বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানির খরছ ৫০ টাকা। পেট্রোবাংলা এবং বিইআরসির কাছ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শূন্য দশমিক ২০ থেকে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস অপচয় হতে পারে। তবে যেটি অপচয় হিসেবে দেখানো হয় সেটি চুরির কারণে হয় বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। শিল্প এবং আবাসিক খাতে তিতাসের অনেক চোরাই সংযোগ রয়েছে। তিতাসের একশ্রেণির কর্মকর্তার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। চুরি ঠেকাতে তিতাস বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালালেও এটি থামছে না, বরং দিন দিন আরো বাড়ছে। বছরে তিতাসের গ্যাস অপচয়ের পরিমাণ সাড়ে ৩২ কোটি ঘনমিটার।