কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমের বুচা এলাকায় রাস্তায় ও কয়েকটি গণকবরে সাধারণ মানুষের মরদেহ পাওয়া গেছে। বুচাসহ কিয়েভের আশপাশের শহর, গ্রাম থেকে রুশ সৈন্য প্রত্যাহারের পর শনিবার থেকে বেসামরিক লোকজনের মরদেহ এবং গণকবরের যেসব ছবি, ফুটেজ ইউক্রেনের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মতো রুশ বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের বিচার হতে পারে বলেও পশ্চিমা বিশ্বে আলোচনা চলছে। রাশিয়ার ওপর আরো শক্ত নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনকে আরো সামরিক সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলছেন পশ্চিমা নেতারা। ইতিমধ্যে ইইউভুক্ত কয়েকটি দেশ ৭৩ রুশ কূটনীতিকে বহিষ্কার করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচারের আহ্বান জানিয়েছেন। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন বলেছেন, এই নৃশংসতা দেখলে মনে হয় কেউ সপাটে আপনার তলপেটে একটা ঘুসি মারল। না তা সহ্য করা যায়, না তা ভুলে যাওয়া যায়। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর গণহত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দাবি, রুশ বাহিনী যেভাবে নৃশংসতা চালিয়েছে, তা ৮০ বছর আগের নাত্সি অত্যাচারকেও লজ্জা দেবে।
নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র
গত সপ্তাহেই বুচা শহরে রুশবাহিনীর হাতে নিহত নাগরিকদের মৃতদেহের স্তূপ পাওয়া যায়। সেই স্তূপের মহিলা এবং শিশুদের উপর নারকীয় অত্যাচারের ছবিও ধরা পড়ে। গত রবিবার বুচার খবর ছড়াতেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। ইউক্রেনের প্রধান প্রসিকিউটর রবিবার জানিয়েছেন, রাশিয়া কর্তৃক সংঘটিত সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের তদন্েতর সময় কর্তৃপক্ষ কিয়েভ ও এর আশেপাশে ৪১০টি মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছে। একাধিক সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বুচার ঘটনা সত্য। ইউক্রেনীয় পার্লামেন্টের সদস্য লেসিয়া ভেসিলেন একটি ছবি টুইট করেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, মৃত মহিলার গায়ে পোড়া স্বস্তিক চিহ্ন। তিনি লিখেছেন, রুশ সেনারা লুট-রাহাজানি করেছে ও খুন করেছে। ১০ বছরের বালিকার গোপন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। এই হত্যার ভয় মানুষকে এতটা আতঙ্কিত করেছে যে এক মা তার দুই বা তিন বছরের শিশু সন্তানের পিঠে নাম ঠিকানাসহ জরুরি তথ্য লিখে রেখেছেন যাতে তারা বা শিশুটি মারা গেলে অন্তত পরিচয় পাওয়া যায়। সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।
ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর বেসামরিক লোকজনকে হত্যার চিত্র ফুটে উঠেছে বিবিসি সংবাদদাতা ইয়োগিতা লিমাইয়ের প্রতিবেদনে। তিনি বলেছেন, কিয়েভের কাছে মোটিঝিন নামে একটি গ্রামে গেলে তাকে মাটির অল্প নিচে চাপা দেওয়া চারটি মৃতদেহ দেখানো হয়, যাদের তিন জনই একই পরিবারের। তাকে জানানো হয় মৃত ঐ তিন জন হচ্ছেন— গ্রামের প্রশাসনিক প্রধান ওহলা সোনেনকো, তার স্বামী ইগর যিনি বয়সে স্ত্রীর চেয়ে পাঁচ বছরের বড় এবং তাদের ছেলে ওলেক্সান্ডার। কাছের গ্রাম মাকারিভের প্রধান ভাদিম তোকার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম টেলিগ্রামে লিখেছেন, ঐ তিন জনকে ১০ দিন আগে রুশ সৈন্যরা অপহরণ করেছিল। অভিযোগ করা হয়েছে যে রুশ সৈন্যরা ওলহা সোনেনকোর বাড়িতে তল্লাশির সময় একটি গাড়িও নিয়ে গিয়েছিল। ইউক্রেনের সরকার বলছে, বুচা শহরে তারা ২০টি মৃতদেহ পেয়েছে যাদের পরনে ছিল বেসামরিক পোশাক এবং তাদের অনেকের পেছনে হাত বাঁধা ছিল।
কঠোর অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার হওয়া দরকার। তিনি বলেন, আমি পুতিনকে যুদ্ধাপরাধী বলায় সমালোচনার মুখে পড়েছিলাম। কিন্তু বুচায় পুতিন কী করেছেন তা বিশ্ববাসী দেখতে পেয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধ নথিভুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক অনুসন্ধান চালাবে। যদিও ইউক্রেন দাবি করেছে, তারা রাজধানীর চারপাশে উত্তর-মধ্য অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে।
রাস্তায় পাওয়া মৃতদেহগুলোর সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, সত্যিই, এটা গণহত্যা। তিনি বলেন, রুশ বাহিনী ইউক্রেনকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করছে। ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, ইউরোপে নাগরিকদের বিরুদ্ধে এমন নৃশংসতা আমরা কয়েক দশকের মধ্যে আর দেখিনি। যুদ্ধ শেষ করা এখন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের দায়িত্ব। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্েতানিও গুতেরেস বলেছেন, ইউক্রেনের বুচায় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের ছবি দেখে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে একটি কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেছেন, বেসামরিক হত্যার অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে প্রস্ত্তত থাকতে হবে। ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের মুখপাত্র লিজ থ্রোসেল জানিয়েছেন, ভিডিও ফুটেজ এবং যেসব ছবি পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যাচ্ছে যে, রাশিয়া বুচা শহরে বেসামরিক নাগরিককে লক্ষ্য করে গণহত্যা চালিয়েছে। তিনি জানান, জাতিসংঘ সেখানে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখছে।
ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন ও ডেনমার্ক ৭৩ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। এর মধ্যে স্পেন ২৫ জন, সুইডেন তিন জন, ইতালি ৩০ জন এবং ডেনমার্ক ১৫ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। এদিকে জার্মানি ৪০ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মস্কো জানিয়েছে, এর মাধ্যমে যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়বে। তারাও পালটা ব্যবস্থা নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে। ইউরোপীয় কমিশন রাশিয়ার কয়লা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার জাহাজ যাতে ইইউভুক্ত দেশগুলোর বন্দরে ভিড়তে না পারে সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘে জেলেনস্কি
মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বক্তৃতা দেওয়ার কথা প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির। বুচায় গণকবর নিয়ে কথা বলতে পারেন তিনি। এর আগে সোমবার তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া চেষ্টা করছে অত্যাচারের সমস্ত চিহ্ন নষ্ট করে দিতে। সংবাদমাধ্যমের কাছে জেলেনস্কির আবেদন, বুচাসহ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তারা যেন তথ্য নথিভুক্ত করে। মস্কো অবশ্য বুচায় গণকবরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রাশিয়ার দাবি, এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। রাশিয়াকে ফাঁসাতেই ঐ গণকবরের তথ্য সামনে আনা হয়েছে। সোমবার রোমানিয়ার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তৃতায় জেলেনস্কি বলেন, বরোদিয়াঙ্কার মতো শহরে বুচার থেকেও বেশি অত্যাচার চলেছে। তার আশঙ্কা, ঐ শহর থেকে বুচার চেয়েও বেশি মৃতদেহ উদ্ধার হবে। এই ঘটনার আন্তর্জাতিক এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছেন জেলেনস্কি। —বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা ও ডয়চেভেলে