শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংকট দিনদিন তীব্র আকার ধারণ করিতেছে। ইহার কারণে কারখানার উত্পাদন অর্ধেকে নামিয়া আসিয়াছে। বিভিন্ন কারখানার মালিক ও কর্মকর্তারা বলিতেছেন, প্রতি বর্গফুটে যেইখানে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ থাকা দরকার, সেইখানে অনেক কারখানায় তাহা কমিয়া মাত্র দুই হইতে তিন পিএসআইতে নামিয়া আসিয়াছে। আবার কোনো কোনো কারখানায় তাহা শূন্যের কোঠায় পৌঁছাইয়াছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উত্পাদন করা যাইতেছে না। ইহাতে মালিকরা আর্থিকভাবে লোকসান গুনিতেছেন। রপ্তানিপণ্য তৈরি পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ বাতিলের আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। গাজীপুরের কারখানাগুলিতে এই সংকট অধিকতর প্রকট।
বর্তমানে বিভিন্ন কারখানায় দেখা যাইতেছে— গ্যাস এই আছে, এই নাই। ইহাতে কারখানার চাকা চলিতেছে না। গ্যাস না থাকিলে বিদ্যুৎ প্রধান ভরসা; কিন্তু তাহার অবস্থাও তথৈবচ। ফলে কলকারখানায় উত্পাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হইতেছে চরমভাবে। এই পরিস্থিতি চলিতে থাকিলে অনেক কারখানা বন্ধ হইয়া যাইবে। গ্যাসের লাইনে প্রেশার কম থাকায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হইয়া যাইতেছে। ইহার দায় কাহার? গতকাল (মঙ্গলবার) ইত্তেফাকের শীর্ষ খবরে বলা হইয়াছে যে, গ্যাস না দিয়াও বিল আদায় করিতেছে তিতাস। ইহা অন্যায় ও অন্যাঘ্য। একটি কারখানার বিপরীতে যেই পরিমাণ গ্যাসের চাপ মঞ্জুর করা হয়, তাহার উপর ভিত্তি করিয়া তিতাস ধার্য করে ন্যূনতম চার্জ; কিন্তু নিরবচ্ছিন্নভাবে ও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না দিলেও বিল ঠিকই আদায় করা হইতেছে। ইহার প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন। আবার সেবা না বাড়াইয়াই বারবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হইতেছে। ইতিমধ্যে ১১৭ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হইয়াছে। ইহা মগের মুলুক ছাড়া আর কিছুই নহে। ইত্তেফাকের সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিতে বলা হইয়াছে যে, তিতাসের ৫৪ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার করে শিল্প খাত; কিন্তু তাহাদের সুযোগ-সুবিধা দেখা হইতেছে না। বরং গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করিয়া শিল্পমালিকদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্েত লইয়া যাওয়া হইতেছে। বিইআরসির তথ্যমতে, গ্যাস খাতের উন্নয়নের জন্য তিতাসসহ এই খাতের কোম্পানিগুলোর নিকট ১২ হাজার কোটি টাকা জমা রহিয়াছে। এই দুর্যোগকালে এই অর্থের সদ্ব্যবহার প্রয়োজন। এই খাতের উন্নয়নে প্রয়োজন কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় ২ হাজার গ্রাহক তিতাসে অভিযোগ দায়ের করিয়াছেন। সেই সকল অভিযোগ দ্রুত আমলে নেওয়া প্রয়োজন। শিল্পকারখানায় জ্বালানির সংকট লইয়া আমরা বহুদিন ধরিয়া লিখিয়া আসিতেছি; কিন্তু কোনো ফলোদয় হইতেছে না। সমস্যা সব সময় থাকিবেই। তবে টপ ম্যানেজমেন্টে যাহারা আছেন তাহাদের কাজ হইল—এই সংকটের সমাধান করা। রাতারাতি তো এই সমস্যা তৈরি হয় নাই। বহু দিন ধরিয়াই সতর্ক করা হইতেছে। তাহা হইলে যাহারা জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহারা এতদিন কী করিলেন? ইউক্রেন যুদ্ধ এই সংকটে নূতন মাত্রা দান করিয়াছে নিশ্চয়ই; কিন্তু ইহা লইয়াও তো আলোচনা চলিতেছে কয়েক মাস ধরিয়া।
শিল্পখাতে জ্বালানির চাহিদা পূরণ করিবার মতো আমাদের সক্ষমতা না থাকায় ইহার অভিঘাতটা নানাভাবে আসিতে থাকিবে। বেতন-ভাতা নিয়মিত প্রদান দূরে থাক, বিভিন্ন কারখানায় ছাঁটাই আরম্ভ হইবে নূতন করিয়া। ব্যাংক ডিফল্ডার বা ঋণখেলাপির সংখ্যা বাড়িয়া যাইবে। কারখানা না চলিলে সুদের কিস্তি তাহারা পরিশোধ করিবেন কীভাবে? এমতাবস্হায় বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়া এই সংকটের অবসানে কার্যকর উদ্যোগ লইতে হইবে। এই খাতে অব্যবস্হাপনা, অদক্ষতা ও অপচয় বন্ধ করিতে হইবে। চোরাই সংযোগসহ নানা কারণে বত্সরে যে ৩ হাজার কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হইতেছে তাহা কমাইয়া আনিবার চেষ্টা করিতে হইবে।