অবশেষে পাকিস্তানে সেই প্রত্যাশিত ঘটনাই ঘটলো। মহা চমকবাজ ইমরান খান নিয়াজি শেষ চমকটি দেখিয়ে সারা পৃথিবীকেই বোঝালেন চমকের খেলায় তিনি কত দক্ষ। আজ পাকিস্তানের সংসদে যখন তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে ভোট হওয়ার কথা, যেখানে তার পরাজয় ছিল নিশ্চিত, সেদিনই ডেপুটি স্পিকার অনাস্থা প্রস্তাবটি অসাংবিধানিক বলে নাকচ করে দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি ইমরান নিয়াজির পরামর্শক্রমে পার্লামেন্ট ভেঙে নতুন নির্বাচনের কথা বলে ফরমান জারি করেছেন। এটিই ইমরান খানের শেষ বল কিনা, ভবিষ্যতই তা বলতে পারবে। তার জনপ্রিয়তায় যে বিপুল পতন ঘটেছে তা নিশ্চিত। তবে পাকিস্তানের ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়, বরং সেনাবাহিনী। ইমরান নিয়াজির ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করবে সেনাবাহিনীর মতিগতির উপর। এরই মধ্যে ইউক্রেন ইস্যুতে ইমরান নিয়াজি এবং সশস্ত্র বাহিনী প্রধানের মধ্যে মতানৈক্য প্রকাশ পেয়েছে। বিরোধী নেতারা বলেছেন দেশে গৃহযুদ্ধ হবে। পাকিস্তানে অবশ্য বেলুচ এবং পাকতুনরা গৃহযুদ্ধ বহু যুগ থেকেই চালিয়ে যাচ্ছে। সে অবস্থায় নতুন কোন গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তেমন আছে বলে মনে হচ্ছে না।
ইতিপূর্বে ইমরানের দল সুপ্রিম কোর্টে অনাস্থা প্রস্তাবটি অবৈধ বলে রায় পাওয়ার জন্য গেলেও সুপ্রিম কোর্ট তা নাকচ করে দেয়। সে অবস্থায় ডেপুটি স্পিকারের ঘোষণা কতখানি আইনসঙ্গত তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে যে গভীর মেঘ জমেছে, তা সারা পৃথিবীই পর্যবেক্ষণ করছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরিফের দলের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো একাট্টা হয়েছে ইমরান খানকে হটানোর জন্য। এতে শক্তিশালী এমকিউএম দলও রয়েছে, তার চেয়ে বড় কথা ইমরান খানের নিজের দলের কয়েকজন সদস্যও ইমরানকে ত্যাজ্য করেছে। এরই মধ্যে এক মন্ত্রীও পদত্যাগ করেছেন। পাকিস্তানের সর্বগ্রাসী এবং শক্তিমান সামরিক কর্তারাও বার বার ইমরান খানের সাথে দেখা করছে। ইমরান খান নিয়াজি পাকিস্তানের মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করছেন একটি বিদেশী শক্তি তাকে উৎখাত করার জন্য বিরোধী নেতাদের সাথে হাত মিলিয়েছে। এতদিন তিনি তার দাবি করা বিদেশী শক্তিটির নাম না প্রকাশ করলেও এটা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি যে সে শক্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। অবশেষে কদিন আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নামটি উচ্চারণই করে ফেলেছেন এমন ভাব করে যে কথাটি তার মুখ থেকে ভুলবশত বেরিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের ধারণা তিনি ইচ্ছা করেই যুক্তরাষ্ট্রের নাম উচ্চারণ করেছেন।
তিনি উচ্চারণ না করলেও সবাই জানতো যুক্তরাষ্ট্র ইমরানের উপর চরমভাবে নাখোশ এবং এটিও বলার অপেক্ষা রাখে না যে ইমরান খান নিয়াজির প্রস্থানে যুক্তরাষ্ট্র খুশিই হবে। পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানসহ অন্যান্য কারণে দেশটি আমেরিকার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তরাষ্ট্র চায় না সেখানে একটি যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী সরকার ক্ষমতায় থাক। পাকিস্তান বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসাবে অবস্থানরত। ভারত বর্ষে ব্রিটিশ রাজের যবনিকা পাতের পরেই যেখানে ভারত বেছে নিয়েছিল নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি সেখানে পাকিস্তান কাল বিলম্ব না করে যুক্তরাষ্ট্র প্রবর্তিত বাগদাদ চুক্তির (যা পরে সেন্টোতে নামান্তরিত হয়) এবং সিয়াটো (সাউথ ইস্ট এশিয়া ট্রিটি)র সদস্য হয়। এরপর থেকে এ অঞ্চলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠতম বন্ধুত্ব লাভ করে আসছে। এটা এতোটাই গভীর ছিল যে এক সময় পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিপদকালে একমাত্র পাকিস্তানই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে। নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে ১৯৬০ সালের ১লা মে ইউ-২ নামক যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিমান, যেটি “ড্রাগন লেডি” নামে পরিচিত ছিল, পাকিস্তান সে দেশের বিমান বন্দর থেকে উড্ডয়ন করতে দিয়েছিল। এই ঘটনার পর মস্কো পাকিস্তানকে উড়িয়ে দেয়ার কথা বলে সতর্ক করেছিল।
ইমরান নিয়াজিকে ক্ষমতায় বসাতে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল না, তা বলা যাবে না। কেননা পাকিস্তানের আসল ক্ষমতার উৎস সামরিক শক্তিই ইমরান নিয়াজিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল আর এই সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই প্রশ্ন হঠাৎ কেন যুক্তরাষ্ট্র ইমরানের উপর বিগরালো? কারণ একাধিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। সর্বশেষ কারণ হিসাবে তারা দেখতে পাচ্ছেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইমরান নিয়াজির রুশপন্থী অবস্থান। অনেক দেশই রাশিয়ার পক্ষে কথা বলছে। কিন্তু ইমরানের ভূমিকা একটু ভিন্ন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ইমরান মস্কো চলে গিয়েছিলেন, যে ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখে নি। রাশিয়া থেকে তেল এবং সামরিক সরঞ্জাম আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভারতকেও এই মর্মে সতর্ক করেছে যে চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রক রেখা (যা ম্যাকমেহন লাইনেরই এক নতুন সংস্করণ) অতিক্রম করে ভারত আক্রমণ করলে রাশিয়া ভারতের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। এর থেকে বুঝা যায় যুক্তরাষ্ট্র রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া সমর্থকদের ব্যাপারে কতটা অ্যালার্জিক।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের চীন প্রীতিও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভের আর একটি কারণ। পাকিস্তান এরই মধ্যে চীন-পাকিস্তান করিডোর প্রকল্পের মাধ্যমে অনেকটা চীনের কোলে ঢলে পড়েছে, যদিও এর ফলে পাকিস্তান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বাধ্য হয়েছে গোয়াদার বন্দরের অংশ বিশেষ চীনের হাতে তুলে দিতে। চীনের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত মাখামাখির ঘটনা, বিশেষ করে গোয়াদার বন্দরের অংশ বিশেষ চীনের হাতে তুলে দেয়ার ঘটনা পাকিস্তানের, বিশেষ করে বেলুচিস্তানের জনগণ গ্রহণ করতে পারছে না। তারা চীনের কনস্যুলেট আক্রমণ করেছে, কয়েকজন চীনা কর্মকর্তাকে মারধর করেছে।
চতুর্দিকে যে খবরটি চাউর হয়েছে তা হলো অবশেষে ইমরান নিয়াজির ভাগ্যও কি তাই ঘটতে যাচ্ছে যা ভুট্টোর ভাগ্যে ঘটেছিল? ভুট্টো সামরিক বাহিনীর সাহায্যে নিজের গদি রক্ষার জন্য তার যে অত্যন্ত বিশ্বস্ত জেনারেল জিয়াউল হককে সশস্ত্র বাহিনী পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন, সেই জেনারেল জিয়াই পরবর্তীতে গনেশ উল্টে দিয়ে শুধু ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুতই করেননি, ভুট্টোর ফাঁসিও নিশ্চিত করেছিলেন। তার চেয়ে বড় ছিল দুই বছর জেলে আবদ্ধ রেখে জিয়াউল ভুট্টোর উপর এতই অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে ছিলেন যে অনেকে বলেছেন ভুট্টো ফাঁসিতে ঝুলে বেঁচে গেছেন। আপাতদৃষ্টিতে যা দেখা যাচ্ছে পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রক, তথা ভাগ্য নিয়ন্ত্রক সামরিক বাহিনী এরই মধ্যে ইমরানকে ত্যাজ্যও করেছে, যেটা স্বাভাবিক, কেননা তারা যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারে না। তারা বার বার ইমরান নিয়াজিকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। পাকিস্তানের প্রভাবশালী ডন পত্রিকায়ও এ ধরনের ইঙ্গিত রয়েছে। ইমরান নিয়াজি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত দিয়েই বলেছেন সে দেশটি ইমরানকে হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এই অভিযোগ খ-ন করেছে। কদিন আগে ইমরান নিয়াজি তার দেশের মানুষের উদ্দেশ্য ভাষণ দেয়ার কথা ঘোষণা করেও পরে সেনা প্রধানের সাথে সাক্ষাতের পর তা বাতিল করেছেন।
পাকিস্তান পার্লামেন্টে সর্বশেষ ঘটনার পরেও আঁচ করা স্বাভাবিক যে ইমরান নিয়াজি বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারছেন না, যদিও ইমরান নিয়াজি সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাবেন টিকে থাকার লড়াইয়ে জেতার জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে ইমরান নিয়াজির সম্ভাব্য প্রস্থান আমাদের দেশে কি প্রভাব আনবে। একটি কথা মানতে হয় যে পাকিস্তানের সব সরকারই বাংলাদেশের বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের সরকারের বিরুদ্ধে। এই সরকারের দলই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পাকিস্তানকে দুই ভাগ করে স্বাধীন বাংলা সৃষ্টি করেছিলেন, পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্যকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিলেন। পরাজয়ের এহেন গ্লানির নজির তারা সইতে পারছে না।
দ্বিতীয়ত পাকিস্তানের সব সরকারই সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন বিধায় তাদের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই যা বলে তাই তাদের করতে হয় আর এই আইএসআই-ই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী সরকারের পতনের চেষ্টায় মগ্ন। সে অর্থে পাকিস্তানের সব সরকারই আমাদের বিরুদ্ধে। তারপরেও ইমরান নিয়াজির ভূমিকা আরও একটু বেশি। ২০১৩ সালে বিরোধী দলের নেতা হিসাবে তারই নেতৃত্বে পাকিস্তান পার্লামেন্ট বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ করে যুদ্ধাপরাধীদের দেশপ্রেমিক বলে আখ্যায়িত করেছিল। গত বছর আমাদের স্বাধীনতা দিবসে এই ইমরান খান বঙ্গবন্ধুকে আমাদের জাতির জনক না বলে “বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট” হিসাবে ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করেছিলেন। আজ পৃথিবীর অনেক দেশের শাসকগণ বঙ্গবন্ধুকে “বঙ্গবন্ধু” বলে সম্বোধন করলেও ইমরান নিয়াজি তা না করে আমাদের জাতির জনকের বিরুদ্ধে তার প্রতিহিংসার ভাবই দেখিয়েছেন।
উল্লেখ্য, তারই জ্ঞাতি গোষ্ঠী জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বেই পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করেছিল। সে অর্থে ইমরান নিয়াজির প্রস্থান হয়তো আমাদের জন্য মঙ্গলকর হতে পারে। তবে সব নির্ভর করছে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের ক্ষমতায় কে আসবে? অনেকে ধারণা করছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফের ভ্রাতা শাহাবাজ শরিফের ভাগ্যে ক্ষমতার আসন জোটতে পারে। কিন্তু তার পরেও এটা ভুলে গেলে চলবে না যে পাকিস্তানের ক্ষমতার উৎস তাদের সামরিক বাহিনী। তাই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীতে বাংলাদেশের বিষয়ে মৌলিক কোন পরিবর্তন না হলে যে লাউ সেই কদুই থাকবে। তবে পাকিস্তানে কি ঘটবে সেটি আজ মূল প্রশ্ন। অতীতে যে কঠোর পরিণতির মাধ্যমে ভুট্টোর রাজত্বে পরিসমাপ্তি ঘটেছিল, ইমরানের ভাগ্যেও তা ঘটবে কিনা, সেটি আজ অনেকেরই প্রশ্ন।
লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি