ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ রমজানের রোজা। শুধু আত্মশুদ্ধিরই নয়, এ মাস আত্মনিয়ন্ত্রণেরও। রোজার অন্যতম লক্ষ্য মানুষের স্বাস্হ্যগত উন্নতিসাধন। রোজা রাখলে অনেকে স্বাস্হ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় করেন; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোজায় কারো স্বাস্হ্য নষ্ট হয়ে গেছে বা রোজা রেখে ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কারো মৃত্যু হয়েছে, এমন কোনো ঘটনার কথা শোনা যায়নি। রোজা কষ্টকর ইবাদত এবং রোজার দ্বারা শরীরে চাপ পড়ে বলে অনেকেই রোজা ছেড়ে দেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া রোজা পরিত্যাগ করা সম্পূর্ণ অনুচিত। সুস্হ ব্যক্তি তো বটেই, অনেক অসুস্হ ব্যক্তিরও রোজা ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না। ইসলামে মানুষের শক্তি, সামর্থ্য ও সাধ্যের বাইরে কোনো বিধান দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ কারো ওপর এমন কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তার সাধ্যাতীত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
রমজান মাসে রোজা রাখা সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ, ‘যে ব্যক্তি রোজার মাসটি পাবে, তারই কর্তব্য হচ্ছে রোজা রাখা।’ (সুরা বাকারা ১৮৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সিয়াম নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের। তোমাদের মধ্যে কেউ ব্যাধিগ্রস্ত হলে বা সফরে থাকলে, অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। এটা যাদেরকে অতিশয় কষ্ট দেয়, তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে ফিদিয়া অর্থাৎ একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করা। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎ কাজ করে, এটা তার পক্ষে অধিক কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন তথা রোজা রাখাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ যদি তোমরা জানতে।’ অতিশয় কষ্ট বলতে অতি বার্ধক্য, চিরস্হায়ী রোগ, যা অতীব কষ্টকর, তার জন্য ঐ মাসে রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে, অনেকে না জানার কারণে কঠিন অসুস্হ হয়েও রোজা রাখেন। অথচ শরিয়ত তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্হা রেখেছে। পরে কাজা আদায় করলেই চলবে। রোজা রাখায় প্রাণের আশঙ্কা আছে এ কথাটি কোনো আলেম এবং ইসলামি জ্ঞানসম্পন্ন অভিজ্ঞ চিকিত্সককের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে। গর্ভবতী নারীর যদি গর্ভস্হ সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা হয় অথবা স্তন্যদায়ী মা যদি রোজা দ্বারা তার নিজের বা তার স্তন্যপানকারী শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেও এই মাসে রোজা না রেখে পরে সুবিধামতো সময়ে কাজা আদায় করতে পারে। আবার অতিশয় বৃদ্ধের জন্য রোজা পালন জরুরি নয়। তবে ঐ ব্যক্তি অন্য কাউকে দিয়ে কাজা আদায় করাবে বা ফিদিয়া দেবে। মৃত্যুমুখী বৃদ্ধ অথবা এমন রোগে আক্রান্ত হলে, যা থেকে সুস্হ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, এমন অক্ষম ব্যক্তি প্রতিটি রোজার পরিবর্তে পৌনে দুই সের গম (ফিতরার পরিমাপ) অথবা সমপরিমাণ মূল্য আদায় করবে। ইসলামের পরিভাষায় এটাকে ফিদিয়া বলা হয়। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ খ. ১, পৃ. ২৯)
অনেক রোগীই যে কোনো অবস্হায় রোজা রাখতে বদ্ধপরিকর। আবার অনেকেই নিজের মতো অজুহাত তৈরি করে রোজা না রাখার যুক্তি খোঁজেন। আসলে দীর্ঘস্হায়ী রোগেও রোজা রাখা সম্ভব। রোজার মাসে পেপটিক আলসার রোগীরা খালি পেটে থাকবেন, ডায়াবেটিস রোগীরা কীভাবে রোজা রেখে ইনসুলিন নেবেন, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা কীভাবে দুই বেলা বা তিন বেলা ওষুধ সেবন করবেন এসব চিন্তায় অস্হির হয়ে পড়েন। আবার কিছু কিছু অসুস্হ ব্যক্তি এমনকি সুস্হ ব্যক্তিরাও দুর্বলতা এবং নানারকম দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনার কারণে রোজা রাখতে গড়িমসি করেন। আসলে রোজা রাখলে শরীরে তেমন কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না। আধুনিক চিকিত্সাবিজ্ঞানের সুচিন্তিত অভিমত হলো, রোজা স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি তো করেই না, বরং শরীর ও মনের উন্নতি লাভের সহায়ক। পেপটিক আলসার ডায়াবেটিক, হূদ্রোগী, বাত ব্যথার রোগীরাও সরাসরি রোজায় উপকার পান। পেপটিক আলসারের কারণে অনেকেই রোজা ছেড়ে দেন। কিন্তু চিকিত্সাবিজ্ঞানের মতে, পেপটিক আলসারে রোজা বিশেষ উপকারী। রোগের কারণে ডাক্তার যদি বলেন, এই রোজার কারণে রোগের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে বা সুস্হতা বিলম্বিত হতে পারে, তাহলে রোজা ভাঙা যায়। কিন্তু সামান্য অসুখ, যেমন মাথাব্যথা, সর্দি-কাশি, অনুরূপ কোনো সাধারণ রোগ-বালাইয়ের কারণে রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ নয়। মনে রাখতে হবে, রোগের কারণে যেসব রোজা ভঙ্গ হয়, সেগুলো পরে একটির বদলে একটি কাজা করে নিতে হবে।
রোজা রাখা অবস্হায় অনেক রোগীর পরীক্ষানিরীক্ষা বা অপারেশনও জরুরি হয়ে পড়তে পারে। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে অনেক নতুন নতুন চিকিত্সাপদ্ধতি ও পরীক্ষানিরীক্ষা আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলো আগে ছিল না। যেমন :ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ দেওয়া, ইনহেলার, রক্ত পরীক্ষা, এস্তোস্কপি, কোলনোস্কপি, বায়োপসি ইত্যাদি। এই প্রেক্ষিতে অনেক সময় রোজা পালনরত অবস্হায় রোগী এবং ডাক্তার উভয়েই রোজা রাখা ও না-রাখা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। এমনকি অনেক ডাক্তারও সঠিক পরামর্শ দিতে দ্বিধা বোধ করেন। এ সমস্যাগুলো সামনে রেখে রোজা রাখা অবস্হায় ওষুধ গ্রহণসহ বিশেষ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করা যাবে কি যাবে না, সে প্রশ্নের সমাধানকল্পে সারা বিশ্বের ইসলামি চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ তাদের সুচিন্তিত অভিমত প্রদান করেছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক, ইসলামি আলেম ওলামাদের সঙ্গে শরিয়তের সীমারেখার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরামর্শ ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, রোজা থাকা অবস্হায় বেশ কয়েকটি পম্হায় ওষুধ সেবন ও বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করলে রোজা নষ্ট হবে না। ১৯৯৭ সালের জুন মাসে মরক্কোতে ‘ইসলামের দৃষ্টিতে সমসাময়িক চিকিত্সা সমস্যা’ শিরোনামে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়—যার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল, কোন কোন মেডিক্যালজনিত কারণে চিকিত্সা এবং পরীক্ষানিরীক্ষায় রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। পরবর্তী সময়ে নবম ফিকাহ-মেডিক্যাল সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় যেখানে যৌথভাবে বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বাস্হ্যবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে যৌথভাবে লেখাই ইসলামিক ফিকাহ একাডেমি, মিশরের আল আজহার ইউনিভার্সিটি, আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্হিত বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হার আঞ্চলিক অফিস এবং ইসলামিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে এ বিষয়ে আরো সবিস্তারে আলাপ-আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। যার মূল আলোচনার বিষয়বস্ত্তও ছিল কী কী ভাবে ওষুধ সেবনে বা পরীক্ষা করলে রোজা ভঙ্গ হয় না।
ইসলামিক চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ সর্বসম্মতিক্রমে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেন এবং অসুস্হ ব্যক্তি রোজা রাখা অবস্হায় নিম্নলিখিত ব্যবস্হাপত্র নিলে এমনকি প্রয়োজনে পরীক্ষানিরীক্ষা করালে রোজা ভঙ্গ হবে না, সেই মর্মে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এই সেমিনারের সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন :১. রোজা রাখা অবস্হায় চোখ, কান ও নাকে ড্রপ নেওয়া যাবে। (চোখ বা নাকে ড্রপ দিলে তা মুখে চলে যেতে পারে, তা ফেলে দিয়ে কুলি করে ফেলা উচিত।) ২. হূদ্রোগীদের বুকে ব্যথা হলে নাইট্রোগ্লিসারিন স্পে্র বা ট্যাবলেট জিহ্বার নিচে নিতে পারবেন। ৩. নারী রোগীর তলপেটে পরীক্ষার জন্য যোনিদ্বার দিয়ে ডাক্তার বা নার্স হাতের আঙুল অথবা কোনো ডিভাইস প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না। এমনকি চিকিত্সার জন্য যোনিপথে পেসারি বা কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে। ৪. মূত্রথলি পরীক্ষা বা এক্সরে করার জন্য রোগীর প্রস্রাবের ধার দিয়ে ক্যাথেটার অথবা অন্য কোনো যন্ত্র প্রবেশ করালে রোজা ভঙ্গ হবে না। ৫. দাঁত তোলা, ড্রিলিং করা বা মেসওয়াক বা ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা যাবে, তাতে রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে এগুলো ব্যবহারের সময় পাকস্হলীতে থুতু বা টুথপেস্ট যেন প্রবেশ না করে। ৬. মুখ পরিষ্কারের জন্য মাউথ ওয়াশ বা গড়গড়া বা মুখে স্পে্র জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যাবে, তবে যেন পাকস্হলীতে কোনো কিছু না যায়। ৭. রোগীর চামড়া, মাংস, অস্হিসন্ধি ও শিরায় ইনজেকশন দেওয়া যাবে। কিন্তু স্যালাইন, ডেক্সট্রোজ, প্রোটিন জাতীয় জিনিস ব্যবহার করা যাবে না।
৮. যে কেউ রক্ত অন্যকে দিতে পারবেন আবার জরুরি প্রয়োজনে নিজেও নিতে পারবেন। ৯. কোনো রোগী অক্সিজেন অথবা অজ্ঞানকারী গ্যাস (অ্যানেসথেসিয়া) নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। ১০. চর্মের মাধ্যমে শরীরের ভেতরে যায়—এমন মলম, ক্রিম, অয়েন্টমেন্ট ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে। ১১. পরীক্ষার জন্য রোগীর শরীর থেকে রক্ত নেওয়া যাবে। এমনকি ডায়াবেটিস রোগীদের দিনের বেলায় রক্ত পরীক্ষা করাসহ প্রয়োজনে ইনসুলিন ইনজেকশন নেওয়া যাবে। এতে রোজা নষ্ট হবে না। ১২. হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী হার্টের এনজিওগ্রাম এবং কার্ডিয়াক কামেটার করা যাবে। ১৩. রোগীর পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য বা চিকিত্সার অংশ হিসেবে এন্ডোস্কপি করলে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু কোনো তরল প্রবেশ করানো যাবে না। ১৪. জরায়ু পরীক্ষার জন্য শরীরে হিস্টারোস্কপি করা যাবে, এমনকি জরায়ুতে কোনো যন্ত্রপাতি বা অন্য কিছু পরীক্ষার জন্য প্রবেশ করালে রোজায় কোনো সমস্যা হবে না। ১৫. লিভার বায়োপসি অথবা অন্য কোনো অঙ্গের বায়োপসি করলে রোজা নষ্ট হবে না।
উপস্হিত অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ নিম্নবর্ণিত ব্যবহার বিধিও অনুমোদন কমরন; যেমন : ১. নাকে স্পে্র বা হাঁপানি রোগীরা ইনহেলার ব্যবহার করতে পারবেন। ২. রোগীর পায়ুপথে ইনজেকশন অথবা পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য আঙুল বা অন্য কোনো যন্ত্র প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না। ৩. জরুরি কোনো অপারেশন প্রয়োজন হলে রোজা রাখা অবস্হায় করা যাবে। ৪. কিডনি অকেজো হলে রোগীর ডায়ালাইসিস করলে রোজা ভাঙবে না।
আমাদের দেশে চিকিত্সকরা এই মতামত রোগীদের দিলে, তারা যেমন সচেতন হবেন, তেমনি সঠিক নিয়মে রোজা পালন করতে পারবেন। যদি কারো মনে কোনো বিভ্রান্িত দেখা দেয় বা কেউ যদি দ্বিমত পোষণ করেন, তাহলে আমাদের দেশীয় আলেম-ওলামা, ইসলামি চিন্তাবিদ, জাতীয় মসজিদের ইমাম এবং ধর্মজ্ঞানসম্পন্ন চিকিত্সকগণ একসঙ্গে বসে তাদের সুচিন্িতত অভিমতের মাধ্যমে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন। প্রয়োজনে ধর্ম মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা অত্যন্ত কার্যকরী হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আসলে রোজা শুধু উপবাস নয়, এটি হলো প্রার্থনা, যা মনের কালিমা দূর করে দেয়। এতে শরীরের রোগ, জরা আর ক্লান্িত হয় বিলীন। মাহাত্ম্য অর্জনে, আত্মার প্রশান্িত মেটাতে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটাতে তাই যথাশুদ্ধভাবে রোজা রাখতে হবে। রোজা যেন নষ্ট না হয়, ছুটে না যায়, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা খুবই জরুরি।
লেখক: প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিত্সক