ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় মাঠপর্যায়ে ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-র কার্যালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস একই ছাতার নিচে আনার লক্ষ্যে প্রায় দু দশক আগে ভূমি মন্ত্রণালয় অস্ট্রেলিয়ান একটি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। সে সময়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সমিতি কর্তৃক তীব্র বিরোধিতা এবং নানামুখী তদবিরের ফলে সে উদ্যোগ থেমে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা আশা করতে পারি, খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিশ্চয় দেখতে পাব।
ইতিহাস এবং প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রেজিস্ট্রেশন বিভাগ সৃষ্টিলগ্ন থেকেই সরকারের আইনি কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। অন্যদিকে ভূমি ব্যবস্থাপনা বা ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা অনেকটা সময় পর্যন্ত ছিল জমিদারি প্রথার আওতাভুক্ত। মূলত ১৯৫০ সালে জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পরেই ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা পুরোপুরি সরকারের আইনি কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয়। বলা যায়, সে সময় এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে অঙ্গীভূত করার চমৎকার সুযোগ ছিল। কিন্তু ভূমির আদি ব্যবস্থাপনার খোলস থেকে বের করে আনার এই যে ঐতিহাসিক আইন প্রণয়ন তথা বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনকালে অন্য কোনো সংস্কারের দিকে দৃষ্টি দেওয়ারও সুযোগ হয়তো ছিল না।
তবে ১৯৫০ পরবর্তী সময়ে এমন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নানা সময়ে সামনে এলেও সংশ্লিষ্টদের পাশ কাটানো মনোভাবের কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। এমনও নয় যে এটি করতে গেলে নতুন করে আইন প্রণয়ন কিংবা অধ্যাদেশ জারির প্রয়োজন আছে। দুটি দপ্তরই স্ব স্ব ক্ষেত্রে যে আইন এবং বিধি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে সেভাবেই থাকবে, শুধু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পরিবর্তন হওয়ার ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই হয়তো যথেষ্ট। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দুটি বিভাগ রয়েছে। তার একটি আইন ও বিচার বিভাগ, অপরটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ। তার মধ্যে আইন ও বিচার বিভাগের আওতাধীন নিবন্ধন অধিদপ্তরের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি অফিসগুলো পরিচালিত হয়। এ অধিদপ্তরের আওতাধীন মাঠ পর্যায়ে জেলা রেজিস্ট্রার, সাব রেজিস্ট্রার, নিকাহ রেজিস্ট্রার এবং বিবাহ রেজিস্ট্রারগণ কাজ করে থাকেন। এ অবস্থায় পৃথকীকরণের ক্ষেত্রে যে সুবিধাটি বিদ্যমান—জেলা রেজিস্ট্রার এবং সাব-রেজিস্ট্রারদের ভূমি মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হলেও যেহেতু নিকাহ রেজিস্ট্রার ও বিবাহ রেজিস্ট্রারদের কার্যক্রম থাকছে সেহেতু নিবন্ধন অধিদপ্তর পুরোপুরি বিলুপ্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে না। প্রকৃতপক্ষে যে কারণে রেজিস্ট্রি অফিসকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে, তা পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করতে গেলে এ লেখা অনেক বেশি দীর্ঘায়িত হবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় স্বতন্ত্র আইন ও বিধিমালা দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ফলে এবং আইনি বাধ্যবাধকতার ঘাটতি থাকায় অহরহ রেকর্ড বিহীন, প্রকৃত মালিকানা বিহীন, স্বত্ব-দখলহীন জমির দলিল সম্পাদন হয়েছে। ২০০৫ সালে সম্পন্ন হওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু সংস্কারের মধ্যে দলিলের নতুন ফরম্যাট প্রবর্তন, বিক্রেতার নামে হাল রেকর্ড ব্যতীত দলিল সম্পাদন না করা, ক্রেতা-বিক্রেতার ছবি, এনআইডি কার্ড, জন্ম নিবন্ধন ইত্যাদি বাধ্যতামূলক করার ফলে জালিয়াতি অনেকাংশে কমে এলেও তার আগে সম্পাদিত অসংখ্য দলিলে যে সমস্ত অসংগতি রয়ে গেছে তার জের আরো অনেককাল হয়তো সবাইকে সয়ে যেতে হবে। সে সময়ে ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতা না থাকায় এক ব্যক্তির স্থলে অন্য ব্যক্তি দ্বারা দলিল সম্পাদনের মতো অসংখ্য ঘটনা এবং মামলা-মোকদ্দমা সৃষ্টি হওয়ার কথা আমরা সবাই জানি। পাশাপাশি সাব রেজিস্ট্রারদের বিক্রেতার মালিকানাসংক্রান্ত রেকর্ড দেখার আইনি বাধ্যকতা না থাকায় মালিকানা না থাকা সত্ত্বেও একজনের জমি অন্যজন বিক্রি করার সুযোগ ছিল। আমরা জানি, দেশের দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে চলমান মামলাসমূহের অধিকাংশই এসব ঘটনা সংশ্লিষ্ট।
সমাজের অসাধু ও সুবিধাভোগী অংশের মাধ্যমে সৃষ্ট এসব জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষজন মামলার বেড়াজালে আটকে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে নিষ্পেষিত হচ্ছে। উল্লিখিত সংস্কারের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ হাল নাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ ছাড়া দলিল সম্পাদন না করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেটিও নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এতকিছুর পরও নানা উপায়ে নানা মাধ্যমে জালিয়াতি সংঘটিত হচ্ছে এবং আইন বহির্ভূতভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এখনো দলিল সম্পাদন যে হচ্ছে না তা বলার সুযোগ নেই। সর্বশেষ প্রণীত নিবন্ধন বিধিমালা ২০১৪-এর অধ্যায় ৮-এর ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে—‘নিবন্ধনের জন্য দলিল গ্রহণের অব্যবহিত পরবর্তী কার্যপ্রণালী: ৪২। নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা দলিলের বৈধতার সহিত সম্পৃক্ত নহেন।’ কথা হচ্ছে যেখানে দপ্তর কর্তৃক প্রণীত বিধিমালায় একজন কর্মকর্তাকে এভাবে দায়মুক্তি দেওয়া হয়, সেখানে কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতামূলক মনোবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ ব্যাপৃত হবে তাতে সন্দেহ নেই।
এ অবস্থায়, নিবন্ধনকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব সম্পাদনকে আইনি বাধ্যকতার আওতায় আনা, বিক্রেতার হালনাগাদ মালিকানা ও রেকর্ড সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে দলিল সম্পাদন করাসহ ভূমি বিষয়ক নানাবিধ জটিলতা পরিহারকল্পে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম যত শীঘ্র সম্ভব ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনার বিকল্প নেই