‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা বন্ধ হইবে রংতামাশা...’ গানটি গাহিতে গাহিতে লোকসংগীতশিল্পী ফিরোজ সাঁই ১৯৯৫ সালে হাজার দর্শকের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িয়াছিলেন। একই প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করিতে চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর জীবনের শেষ বাক্যটি—‘আমার আর একটি কথা আছে’! ২০১৪ সালে তিনি বেঙ্গলের মঞ্চ হইতে চলিয়া যাইবার পর পুনরায় ফিরিয়া আসিয়া ব্যক্ত করিয়াছিলেন আরো একটি বিষয়ে কথা বলিবার ইচ্ছা। কিন্তু সেই না-বলা কথাটি বলিবার পূর্বেই তিনি মঞ্চে ঢলিয়া পড়েন মৃত্যুকোলে। তাহাদের মতো আমরাও জানি না আজই আমাদের শেষ দিন কি না? রাত্রিতে যখন ঘুমাইতে যাইব, আমরা জানি না এই ঘুম আর কখনো ভাঙিবে কি না? এমন একটি দিন অনিবার্যভাবে চরমতম সত্য রূপে আসিবেই যে, আমরা নিঃশ্বাস গ্রহণ করিবার পর আর কোনো দিনও তাহা ছাড়িতে পারিব না, কিংবা নিঃশ্বাস ছাড়িবার পর আমরা আর কখনো নিঃশ্বাস গ্রহণ করিতে পারিব না।
এমন নহে যে, এই সত্য আমরা জানি না। প্রতিটি ধর্মেই এই সারসত্যটি শয়নে-স্বপনে সকল সময় স্মরণ রাখিতে বলা হইয়াছে। কিন্তু আমরা তাহা কতখানি মনে রাখি? আমাদের কি ডিমেনশিয়া হইয়াছে? আমরা এমনভাবে চলি যেন—আমাদের ঐ শেষ দিনটি আমাদেরও আসিবে। আসিবেই। তার পরও কেন আমরা ভুলিয়া যাই? কেন হিংসা, হানাহানি, লোভের ব্যারোমিটারের পারদ চড়িতেই থাকে? শান্তি ও স্বস্তিতে থাকিবার স্বার্থেই তো মানবসভ্যতার বিকাশ হইয়াছে। সিন্ধু সভ্যতা হইতে শুরু করিয়া মিশরীয়, সুমেরীয়, পারস্য, ব্যাবিলনীয়, রোমান প্রভৃতি সভ্যতার মূলে ছিল মানবজীবনে স্বস্তি দান করা। কিন্তু কোথায় শান্তি? সেই যে ঈশপের গল্পে রহিয়াছে—দুষ্টু কিছু বালক জলাশয়ের ব্যাংগুলির দিকে ঢিল ছুড়িয়া খেলিতে ছিল, ব্যাংদের গায়ে ঢিল লাগাইতে পারিলে হাততালি দিতেছিল। তখন ঐ ব্যাঙদের মধ্যে একজন ঐ বালকদের বলিল, ‘তোমরা বন্ধ করো এই খেলা। যাহা তোমাদের জন্য খেলা, তাহা আমাদের মৃত্যুর কারণ।’ পৃথিবীর মানুষের অবস্থা ঐ ব্যাঙেদের মতো। প্রস্তর, লৌহ, তাম্র প্রভৃতি যুগ পার করিয়া আমরা যেন আধুনিক যুগে আসিয়াছি অস্ত্রের ঝনঝনানির খেলা দেখিতে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলিতেছে, মরিতেছে নিরীহ নিরপরাধ মানুষ। অস্ত্রের জন্য এই পৃথিবীতে যত শত-সহস্র-অযুত কোটি অর্থ প্রতি বৎসর দেশে দেশে ব্যয় করা হয়, অস্ত্র কিনিবার জন্য পরিবেশ তৈরি করা হয় গরিব দেশগুলোর জন্য। অস্ত্র ক্রয় করিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কিন্তু এই সকল হানাহানি অস্ত্রের আস্ফালন না করিয়া যদি এই বিপুল অর্থ দিয়া বিশ্বের মানুষের মঙ্গলের কাজে ব্যয় করা হইত, তাহা হইলে এই পৃথিবীর চেহারা নিঃসন্দেহে অন্যরকম হইত।
সকল ধর্মেই হিংসা-বিবাদকে নিরুত্সাহিত করা হইয়াছে। শান্তির কথা, মানুষের উপকারের কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু যুদ্ধ ও অশান্তিকে আজকে পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। ‘যুদ্ধ’ এখন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়। দেখা যায় যে, পরাশক্তিদের মতানুযায়ী যদি কোনো জাতি চলিতে না চাহে, তখন তাহাদের খাদ্যে-পানিতে মারিবার ব্যবস্থা করা হয়। এখন কোনো জাতিকে খাদ্য-পয়সায় যদি পঙ্গু করিবার ব্যবস্থা করা হয়, তখন ঐ দেশটিকে খাদ্য-অর্থ পাইতে হইলে মোড়লদের নিকট হাত পাতিতেই হইবে। ইহাই তো মোড়লেরা চাহে! ইহাও তাহাদের আরেকটি ফাঁদ।
মোড়লদেরও মনে রাখিতে হইবে, অন্যকে ধ্বংসের আগুনে ঝলসাইলে সেই আগুনের আঁচ একটি পর্যায়ে নিজেদের গায়েও পড়িতে বাধ্য। মোড়লরা তো চিরকাল বাঁচিবেন না। প্রয়োজন হইবে মাত্র সাড়ে তিন হাত জমি। লেভ তলস্তয় তাহার ‘সাড়ে তিন হাত জমি’ গল্পে দেখাইয়াছেন আদিগন্ত বিপুল ভূমি ক্রয় করিতে গিয়া পাখোম কীভাবে মারা গিয়াছিলেন জমিদখলের একদম শেষ মুহূর্তে। জমি ক্রয়ের শর্ত ছিল, পাখোম ভোর হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতখানি হাঁটিবেন ততখানি জমির মালিক হইবেন তিনি। ‘লোভ’ নামের শয়তান পাখোমকে অস্বাভাবিক পর্যায়ে হাঁটাইয়া লইয়া যায়। শেষ পর্যন্ত মূল জায়গায় ফিরিয়া আসিবার অন্তিম ক্ষণে তাহার মৃত্যু হয়। আর মৃত্যুর পর তাহার কবরের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ‘সাড়ে তিন হাত জমি’। ক্ষমতার মসনদে যাহারা বসেন, তাহারা এই সত্য মনে রাখুক, তাহারা ডিমেনশিয়া-মুক্ত হউক। পৃথিবীর মানুষের শান্তির জন্য কাজ করুক তাহারা। ইহার তুল্য আনন্দময় ইবাদত আর নাই।