রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জনবহুল স্থান। চলার পথে প্রতিনিয়ত চেনাঅচেনা অসংখ্য মুখ আমরা স্বচক্ষে দর্শন করলেও ক্ষণকালীন সাক্ষাতে মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিবেচনা করা দায়। অথচ সীমাবদ্ধ স্মরণশক্তি নিয়ে মানুষ চিনতে না পারাই যেন আমাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য অনেক স্থানে দিন-দুপুরে লোকসমাগমের মধ্যেই ছিনতাই হওয়া যেন ইদানিং একটি সাধারণ ও চলমান ঘটনায় পরিণত হয়ে উঠছে। স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠী। আর ছিনতাইকারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক বহু কারণ।
তথ্য মতে, দেশে গত আট বছরে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মৃতু্যর সংখ্যা প্রায় ৩৬, এমনকি ছিনতাইকে অনেকে পেশা হিসেবেও গ্রহণ করেছে এবং ইতিমধ্যে রাজধানীতে পাঁচ শতাধিক পেশাদার ছিনতাইকারী রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ ছিনতাইয়ের মামলা গ্রহণেও অনেক সময় পুলিশের গড়িমসির অভিযোগ ওঠে। সংখ্যায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত এই ছিনতাইকারীদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাত্র দুই দিনের মাথায় ৪২ জন ছিনতাইকারীকে আটক করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা। আটককৃতদের কাছ থেকে একাধিক ধারালো অস্ত্রসহ ছিনতাইকৃত বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করা হয়।
আরো একটি অভিযানের মাধ্যমে ছিনতাই চক্রের ২৩ জন সদস্য গ্রেফতার হয়। পরপর কয়েকটি অভিযানে অসংখ্য ছিনতাইকারী আটক হলেও তাদের একটি বৃহত্ সংখ্যা রয়ে গিয়েছে আইনের আওতার বাইরে। রাজধানীর মীরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, শাহবাগ, পুরান ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ছিনতাইয়ের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। ছিনতাইকালে শুধু অস্ত্রের আঘাত নয় বরং মালামাল ছোবল দিয়ে নেওয়ার দরুনও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। ছিনতাই করার ক্ষেত্রে রাত-দিন কোনো ভেদাভেদ নেই, জনসমাগমপূর্ণ যে কোনো স্থানেই পরিস্হিতি সাপেক্ষে এরূপ অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটেই চলছে।
চলমান যানবাহন থেকে বেপরোয়াভাবে ব্যাগ-অলংকার হাতিয়ে নেওয়া, অস্ত্রের ভয় প্রদর্শন করে মালামাল হাতিয়ে নেওয়া, এমনকি মানুষের জীবনের অবমূল্যায়ন করে অস্ত্রের আঘাতে কাউকে রক্তাক্ত করে দেওয়ার মতো অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো রাতের আঁধার বা দিনের আলোর পরোয়া করে না। আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে বর্তমানে ছিনতাই শুধু ছেলেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মেয়েরাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
ছিনতাইকারীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। পরিসংখ্যান করলে দেখা যাবে এদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও কর্মজীবী শ্রেণির আওতাবহির্ভূত। এদের বেশিরভাগই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ও বেকারত্বের শিকার। মূলত পারিবারিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভাব এবং বেকারত্ব এমন একদল জনগোষ্ঠী সৃষ্টির নেপথ্যে দায়ী। পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাবে এরা এক পর্যায়ে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এবং এই বিষ ছড়িয়ে পড়ে সমাজের শিকড় থেকে শিখরে।
তাই এরূপ কর্মকাণ্ড সমাজ থেকে সমূলে উত্পাটনে সর্বপ্রথম মানুষের প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র অর্থাত্ পরিবারকে সচেতন হতে হবে। বর্তমানে ছিনকারীদের অধিকাংশই কিশোর বা যুবক পর্যায়ের। তাই পরিবার থেকে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে দায়িত্বশীল হতে হবে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে এবং সবাইকে সুশিক্ষার আওতায় আনতে হবে। বেকারত্ব দূরীকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যারা বেকারত্বের তাড়নায় ছিনতাইয়ের মতো অসত্ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের সমাজের বোঝা না ভেবে তাদের জন্য সত্ উপায়ে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
দেশের এরূপ একদল জনগোষ্ঠীকে যদি কর্মজীবী শ্রেণির আওতায় আনা যায়, তবে তা দেশের অর্থনীতিকে ইতিবাচক দিকে ধাবিত করবে এবং দেশ থেকে মাদকাসক্তের সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংশোধন কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং প্রশাসনকে কঠোর উদ্যোগী হয়ে যারা ইতিমধ্যে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে জড়িত তাদের সংশোধনাগারে প্রেরণ করতে হবে। তাছাড়া অঞ্চলভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন; যেমন: জন চলাচলের স্থানে ল্যাম্পপোস্ট তৈরি, এলাকা তদারকি করার জন্য প্রতিটি ইউনিটে রক্ষী মোতায়েন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ বিবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া ছিনতাই অপরাধের শাস্তি হিসেবে রাষ্ট্রের আইনকে আরো কঠোরভাবে প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়