ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম। একজন নন্দিত ব্যক্তি। বর্ষীয়ান আইনজীবী। তার হাতেই স্বাধীনতার ‘ঘোষণাপত্র’-এর আইনগত দিক পরিপূর্ণতা লাভ করে। ৭১-এর ১০ এপ্রিল গঠিত সরকার ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিক শপথ নেয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও মুজিবনগর সরকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম কথা বলেছেন ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অ্যাডভোকেট কে এম মাহ্ফুজুর রহমান মিশু।
ইত্তেফাক অনলাইন: আজ ১০ এপ্রিল, ৭১-এর এই দিনে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’রচনার মতো ঐতিহাসিক কাজে আপনার অংশগ্রহণের জন্য আপনাকে ইত্তেফাক অনলাইন থেকে কৃতজ্ঞতা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিয়ে যদি কিছু বলতেন?
ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম: আমাদের দুর্ভাগ্য যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি এখনো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এটা নিয়ে কোনো আলোচনা-পর্যালোচনা পর্যন্ত হয়নি। তবে ‘বাংলাদেশের গণপরিষদের কার্যবিবরণী ও প্রাসঙ্গিক তথ্য’ গ্রন্থে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিয়ে বেশ কিছু লেখা আছে। বইটিতে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের স্বাধীনতার দলিলপত্রের তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির পরিপূর্ণ তথ্য রয়েছে। এখানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে।
ইত্তেফাক অনলাইন: এই ঘোষণাপত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে কী প্রভাব ফেলেছে, সে বিষয়ে জানতে চাই।
ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম: হ্যাঁ, বলা যেতে পারে। যতদিন সংবিধান তৈরি হয়নি, ততদিন এটা ছিল প্রথম সাংবিধানিক দলিল। যেমন আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তাদের প্রথম সাংবিধানিক দলিল। অতএব এটাকে রাষ্ট্রের প্রথম সাংবিধানিক মৌলিক দলিল বলা যায়। বাংলাদেশের জনগণ কি জন্য স্বাধীনতার যুদ্ধ করলেন, সেটাও এখানে বলা আছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, এই তিনটি মৌলিক কথা সেখানে উল্লেখ আছে।
ইত্তেফাক অনলাইন: ১০ এপ্রিলকে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষণার জন্য সোহেল তাজসহ বিভিন্ন মহল দাবি জানিয়ে আসছেন, এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।
ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম: এটা শুধু আমার মন্তব্য নয়, ইতিহাসও তাই বলবে। ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা উচিত। ১০ এপ্রিলকে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করার কথা সোহেল তাজ বলেছেন। সঠিকভাবে সেটা তিনি মূল্যায়ন করেছেন। আজ তাজউদ্দিন আহমেদ বেঁচে থাকলে তিনি এই কথাটি বলতেন।
ইত্তেফাক অনলাইন: ১০ এপ্রিল ও ১৭ এপ্রিল সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয়েছে কি না?
ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম: ১৭ এপ্রিল তো সরকার শপথ নিয়েছিল। শপথটা মুখ্য নয়। ঐতিহাসিক দলিল তৈরি হয়েছিল ১০ এপ্রিলে। সেটাকে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করার কথা সোহেল তাজ বলেছেন।
ইত্তেফাক অনলাইন: স্বাধীনতা সংগ্রামসহ নানা কল্যাণমূলক কাজে আইনজীবীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন কিছুটা থমকে গেছে বলে মনে করা হয়। নবীন আইনজীবীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম: সব জায়গাতেই এটার স্খলন ঘটেছে। আমাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে যেটা পেয়েছি, সেটাও অনেকটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সব স্তরেই সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে।
ইত্তেফাক অনলাইন: আপনার ছোটবেলার গল্প শুনতে চাই?
ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম: ছোটবেলা থেকেই আমি অনেকটা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকেই সূত্রপাত। হাফপ্যান্ট পরা অবস্থা থেকেই মিছিলে যেতাম।
ইত্তেফাক অনলাইন: স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে আপনার মধুর কিছু স্মৃতির কথা যদি জানাতেন।
ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম: ১৯৫৪ সালে শাহ আজিজুর রহমান বেঙ্গল ছাত্রলীগের সম্মেলন কুষ্টিয়াতে নিয়ে গেলেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন কুষ্টিয়াতে। তখন খুব টান টান উত্তেজনা কুষ্টিয়া শহরে। ফরিদপুর, কলকাতা ও অন্যান্য জায়গা থেকে বহু ছাত্রনেতারা এসেছিলেন। কামরুজ্জামান সাহেব তখন ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট। তার পক্ষে আমরা ছিলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র বাংলা ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট। তখন আমরা তাদের সঙ্গে উঠেছিলাম থিয়েটার হলে। সেখানে আমরা বলছি, এখানে কোনো ছাত্র নাই। ডেলিগেট কেউ নেই। সবাই অছাত্র, অতএব তাদের বের করে দেওয়া হোক। এই প্রথম আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখলাম কাছ থেকে। তখন বঙ্গবন্ধুকে দেখলাম, ধীর-স্থিরভাবে মাইক্রোফোনের সামনে গেলেন। তারপর অছাত্রদের দিয়ে হল ভর্তি করার প্রতিবাদে তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন। পরে সখ্য হওয়ার পর আমি কখনো বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলে আমাকে না খেয়ে আসতে দিতেন না। অনেক সময় আমরা একসঙ্গে খেতাম। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিনের কাছে আমি সব কথা বলতে পারতাম। আমি লন্ডনে সপরিবারে ছিলাম। একদিন টেলিফোন করে তখনকার হাইকমিশনার ফারুক চৌধুরীকে বললেন, ওখানে আমীরুল আছে, ওকে খুঁজে বের করো, তাকে নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলিয়ে দাও। ফারুক চৌধুরী সাহেব আমাকে টেলিফোন করে খুঁজে বের করলেন, আমি গেলাম। তখন উনি বললেন, আলজিয়ার্স ডলারের যে কনফারেন্স হবে, সে কনফারেন্সে তোমাকে যেতে হবে। আরও দুজন ওখানে যাবে, তারা ওখানে আছে। তোমাকে ওখানে যেতে হবে, লবিয়িং করার জন্য। যেন আমরা সেখানে মেম্বার হতে পারি। তারপর আমি সেখানে গেলাম, সদস্যপদ লাভ করলাম। এরপর বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোন করে জানালাম, আমরা সদস্যপদ লাভ করছি। এখন আপনি আসতে পারেন। তো তখন তিনি পরের প্লেনে চলে আসলেন। আমরা গিয়ে তাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসলাম।