দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষ যেমন মাঝে মাঝে হঠাৎ করে পড়ে যায়, পাকিস্তানের গণতন্ত্রও ঠিক তেমনি। পার্থক্য হলো—দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির পড়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া যায় তার নিজের কোনো না কোনো পায়ে। পাকিস্তানের গণতন্ত্রের এই পড়ে যাওয়া, তার কোনো পায়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে ইতিহাসে খুঁজলে স্পষ্ট হয়, আসলে পাকিস্তানের গণতন্ত্র কোনো সময়ে শুধু নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে না। তার দাঁড়িয়ে থাকার জন্য একটা ক্র্যাচ থাকে। ক্র্যাচটি অদৃশ্য। আর ঐ অদৃশ্য ক্র্যাচটি যখনই টেনে নেওয়া হয়, তখনই গণতন্ত্র পড়ে যায়।
পাকিস্তানের গণতন্ত্রের অদৃশ্য ক্র্যাচটি আসলে কী? এটাও এখন আর এই পৃথিবীর কারো খুব অজানা কোনো বিষয় নয়। পাকিস্তানের গণতন্ত্রের অদৃশ্য ক্র্যাচটি হলো সে দেশের সামরিক স্টাবলিশমেন্ট। শুধু সামরিক স্টাবলিশমেন্ট বললে সম্পূর্ণটুকু বলা হয় না। বাস্তবে গত ৭৫ বছরের পাকিস্তানের প্রায় ৩২ বছর সরাসরি এই স্টাবলিশমেন্ট ক্ষমতায় থাকায় এবং সব সময়ের জন্য ক্ষমতার একটি প্রাণভোমরা নিজেদের হাতে রাখার সক্ষমতার কারণে এই স্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এখন বৈধ ও অবৈধ সব ধরনের ব্যবসা বা অর্থশক্তি, পাশাপাশি মৌলবাদী শক্তি। কোনো রাষ্ট্রকে যখন আধুনিক পথে হাঁটতে দেওয়া না হয়, সে সময় ঐ রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম আর মানুষের পালনীয় বা আচরণের শুদ্ধাচারের ধর্ম থাকে না, সেই ধর্ম তখন রাজনৈতিক স্বার্থে একধরনের অন্ধত্ব বা তথাকথিত মৌলবাদিতায় পরিণত হয়। ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক কাজে। ব্যবহূত হয় স্টাবলিশমেন্টের স্বার্থে। এ ছাড়া সর্বোপরি, এই স্টাবলিশমেন্ট তখন দেশের সংবিধানের রক্ষক যে সুপ্রিম কোর্ট, তারও অদৃশ্য নির্দেশক হয়ে যায়।
এবারও পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে যেভাবে ইমরান আহমদ খান নিয়াজির পতন হলো, তাতে প্রমাণিত হয়, তিনিও অদৃশ্য ক্র্যাচটির ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং সেটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এবার দেশের সংবিধানের রক্ষক সুপ্রিম কোর্ট সঠিক ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫৫ সাল থেকে বারবার সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট যে অন্য শক্তির হাতের খেলনা হিসেবে কাজ করেছে—এবার তা ঘটেনি বা ঘটার প্রয়োজন হয়নি। বরং সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার কারণে মনে হয়েছে, পাকিস্তানের স্টাবলিশমেন্ট তার ক্র্যাচটি ইমরানের বগল থেকে সরিয়ে নিলেও তারা গণতন্ত্র ও পার্লামেন্টকে চলতে দিতে চায়।
ইমরান খান অবশ্য ঐ অদৃশ্য ক্র্যাচ, বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান যে দেশটির কাছ থেকে বেশি সাহাঘ্য পেয়ে আসছে, সেই আমেরিকাকে দোষারোপ করেছেন বেশি। কিন্তু বাস্তবতা তা বলছে না। ইমরান খান তার কেবিনেটে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের সে দেশের স্টেট ডিপার্টমেন্টের যে অনুরোধপত্রটি আমেরিকার হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখাচ্ছেন, সেটা মূলত একধরনের ওভার প্লে শুধু নয়—রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে চলে গেলেও রাষ্ট্রীয় কিছু শিষ্টাচার মানতে হয়। এখানে বরং সেটা মানা হচ্ছে না। বাস্তবে ইমরান খান আমেরিকার যে অনুরোধপত্রটি দেখিয়েছেন তার কেবিনেটে রাশিয়া সফরে না যাওয়ার বিষয় নিয়ে, সেটা আমেরিকার বর্তমান কূটনীতির একটি রুটিন অংশ মাত্র। তারা সব দেশকে যেভাবে রাশিয়াকে বয়কট করার জন্য বলছেন, এটি তার বাড়তি কিছু নয়।
অন্যদিকে ইমরানের রাশিয়া সফরের সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আনা এই অনাস্থা ভোটের কোনো যোগ নেই। শুধু ঘটনাক্রমে এটা এই সময়ে ঘটেছে। কারণ, যারা পাকিস্তানের রাজনীতির প্রতি লক্ষ রাখেন, তারা সবাই জানেন, ২০২০-এর শেষের দিক থেকে সে দেশের প্রবীণ নেতা মৌলানা ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট জোর আন্দোলন করে যাচ্ছিল। সেখান পাকিস্তানের মুসলিম লীগ নেওয়াজের নেতা শাহবাজ শরিফ, মরিয়ম নেওয়াজ, পিপলস পার্টির নেতা বিলওয়াল ভুট্টো প্রমুখ রাজপথে অনেক বেশি সক্রিয় ছিলেন। এবং ২০২১-এর মাঝামাঝি থেকে তারা ইমরান খানের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা আনার জন্য সংগঠিত হতে থাকেন।
অন্যদিকে তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ নেতা ক্ষমতায় গিয়ে সাধারণত যে ভুলগুলো করেন, ইমরান খান সেগুলো একটু বেশি মাপেই করেছিলেন। প্রথমত, তিনি মোটেই তার সরকারকে সবার সরকারে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেননি, বরং তিনি তার সরকারকে বড় বেশি নিজ দলীয় সরকার করে ফেলেন। এমনকি যারা তার জোটে ছিল, তাদেরও তিনি মূল্যায়ন না করে বরং অবহেলাই করেন। অন্যদিকে যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের উচিত সব সময়ই বিরোধী দলের রাজনীতিকে সহনীয়ভাবে মোকাবিলা করা এবং বিরোধী দলকে মোটামুটি একটা রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া, যাতে তাদের ক্ষোভ, তাদের রাজনীতি এগুলো তারা শরীরের ভেতরের নিঃশ্বাসের মতো বের করে দিতে পারে। এগুলো জমাট বেঁধে কোনো গুমোট তৈরি না করে। কিন্তু ইমরান খান বিরোধী দলের বিরুদ্ধে তার সরকারের পুলিশকে কঠোরভাবে ব্যবহার করেন এবং বারবারই শাহবাজ, মরিয়ম, বিলওয়াল—এদের গ্রেফতার করেন। তাদের নির্ধারিত জনসভায় যেতে বাধা দেন এবং পুলিশ দিয়ে জনসভা ভেঙে দেন।
এমনকি ইমরান শুধু রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর হয়েই শান্ত হননি; যেহেতু মিডিয়া বিরোধীদলীয় রাজনীতির খবর প্রকাশ করে, তাই তিনি মিডিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। পাকিস্তানের সিনিয়র সাংবাদিকদের মতে, আইয়ুব খান ও জিয়াউল হক ছাড়া আর কারো আমলে পাকিস্তানে মিডিয়ার এভাবে কণ্ঠ রোধ করা হয়নি, যা ইমরান খান করেছিলেন। তিনি শুধু সেন্সরশিপ দিয়েই থেমে থাকেননি, তিনি বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ যাতে তাদের আয়ের উত্স থেকে অর্থ না পেতে পারে, সেই পথও বন্ধ করেছিলেন।
মিডিয়াকে এভাবে কঠোরভাবে বন্ধ করলে কী হয় তা এখন গোটা পৃথিবী জানে। কোনো দেশ যখন মিডিয়াকে এভাবে কঠোরভাবে বন্ধ করে, তখন দেশের সত্য চিত্র ঐ অর্থে কোথাও পৌঁছায় না, যার ফলে দেশে ফেইক নিউজ বা ভুল সংবাদ ও নানান ধরনের গুজব রটতে থাকে। এই ভুল সংবাদ ও গুজব মূলত ক্ষতিগ্রস্ত করে সরকারের রাজনীতি ও দেশের অর্থনীতিকে। মিডিয়ার স্বাধীনতা ছাড়া দেশে একটি স্হিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা যায় না—এ বিষয়টি এখন পৃথিবীতে প্রমাণিত। ইমরানও সেই বিপাকে পড়েন। এমনিতে তিনি যখন ক্ষমতা নিয়েছিলেন, ঐ সময় দেশের অর্থনীতি খুব ভালো ছিল না। তার পরে সেটা আরো খারাপ হতে থাকে। এতে তার ম্যাক্রো ও মাইক্রো লেভেল—এই দুই লেভেলেই অর্থনীতিতে ধস নামে। ইমরানের বিরুদ্ধে যেদিন অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়, ঐ দিন বিবিসির একটি স্পট রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ইসলামাবাদে একজন হেয়ারড্রেসারকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, ‘এই যে ইমরান সরকারের পতন ঘটতে যাচ্ছে, এ বিষয়ে তার মত কী? সে কোনোরূপ দ্বিধা না করে উত্তর দেয়, সে চায় তার পতন হোক। গত নির্বাচনে সে ইমরানকে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু এবার আর সে ভোট দেবে না। কারণ জিনিসপত্রের দাম এমন জায়গায় চলে গেছে, যা তার পক্ষে কেনা সম্ভব হচ্ছে না।’ এই যেমন মাইক্রো অর্থনীতির চিত্র। তেমনি ম্যাক্রো অর্থনীতিতেও ইমরান ভুল করেন। পাকিস্তানের এই মুহূর্তে দেনার পরিমাণ প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার। এবং পাকিস্তানের অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে মালটিন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অর্থাত্ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ছাড়া আসলে পাকিস্তানের অর্থনীতিকে সহায়তা করা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইমরান সেই পথে না গিয়ে চীন ও সৌদি আরবের কাছ থেকে বেশি সুদে ঋণ নিয়ে দেশের ম্যাক্রো অর্থনীতিকে আরো বিপাকে ফেলে দেন।
পাকিস্তানের এই মুহূর্তে অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে শাহবাজের নেতৃত্বাধীন সরকার এসে রাতারাতি কোনো পরিবর্তন করতে পারবে না। তাছাড়া ইমরানের মতো শাহবাজও অনেকটা অনভিজ্ঞ রাষ্ট্র চালাতে। তার অভিজ্ঞতা শুধু পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। সেখানেও তিনি খুব ভালো করেননি। তিনি গোটা প্রদেশের উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি তার সব উন্নয়নকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন পাঞ্জাব শহরের মধ্যে। যেহেতু পাঞ্জাবের এলিটরা স্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে বেশি জড়িত, তাই তিনি তাদের খুশি করার চেষ্টা করেছেন। কেন্দ্রে এসেও যদি তিনি স্টাবলিশমেন্টকে বেশি খুশি করতে যান, তাহলে ইমরানসহ অন্যান্য বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে পড়বেন নতুন করে। তাছাড়া, নওয়াজ মুসলিম লিগের মতো অতটা পাঞ্জাবি স্টাবলিশমেন্টের সমর্থন নেই পিপিপিরের, তাদের অন্যান্য প্রদেশে সমর্থন বেশি। তাই ক্ষমতার অংশ হিসেবে তারাও সমর্থন করবে না শাহবাজের এই কাজ।
এসব মিলে দ্রুতই এই নতুন কোয়ালিশন সরকারের ইনার সার্কেলে আবার দ্বন্দ্ব শুরু হবে। অন্যদিকে সরকারের এই অস্হিতিশীলতার কারণে মালটিন্যাশনাল অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো একটু অপেক্ষা করবে তাদের পরিপূর্ণ সহযোগিতার হাত বাড়াতে। যার ফলে ম্যাক্রো ও মাইক্রো দুই অর্থনীতিতে খুব বেশি সংস্কার আসবে না। এবং এই সরকারও দ্রুত জনপ্রিয়তা হারানোর মুখে পড়বে। আর এই জনপ্রিয়তা হারানোর আগেই মুসলিম লিগ নওয়াজ ও পিপিপি চাইবে নতুন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে। সে হিসাবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট থিংকট্যাংক সৈয়দ নাজিব রফিকের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, সবকিছু মিলে মনে হচ্ছে, ২০২২ সালের অক্টোবর বা নভেম্বর মাসের মধ্যেই নতুন কোয়ালিশন সরকার নতুন নির্বাচন করবে। এর বেশি সময় তাদের পক্ষে একসঙ্গে থাকা সম্ভব হবে না।
তবে পাকিস্তানের অনেক সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও থিংকট্যাংকের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, তারা কেউই মনে করছেন না, এই মুহূর্তে রাজনীতির এই ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হবে। তবে তার পরও পাকিস্তান তার জন্ম থেকে এটাই প্রমাণ করেছে, তারা সেই দেশ, যেখানে রাজনীতি নিয়ে এক ঘণ্টা আগেও বলা যায় না, রাজনীতির ধারাবাহিকতা থাকবে কি থাকবে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক