আর দুই-এক দিন পরই সারাদেশে যথাযথ উত্সবমুখর পরিবেশে উদ্যাপিত হইবে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মীয় উত্সব ঈদুল ফিতর। এই জন্য মুসলিম ঘরে ঘরে সর্বপ্রকার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। চলিতেছে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা। ইহার মধ্যে যেমন পোশাক-আশাক রহিয়াছে, তেমনি আছে চিনি-সেমাই প্রভৃতি ক্রয়ের ব্যস্ততাও। কিন্তু যাহারা ঈদের দিনের জন্য এইসব প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করিতে অক্ষম, তাহারা কি ঈদের আনন্দ হইতে বঞ্চিত হইবেন? ইসলামে এই জন্য দান-খয়রাত ও জাকাত-ফিতরার ব্যবস্থা করা হইয়াছে, যাহাতে সকলে ঈদের অনাবিল আনন্দে শরিক হইতে পারেন। তবে এই ক্ষেত্রে সরকারেরও একটি নৈতিক ভূমিকা রহিয়াছে বিধায় প্রতি বত্সর ঈদের আগেভাগে অতিদরিদ্র ও দুস্থদের মধ্যে ভিজিএফ-ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় চাউল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবারও তাহার ব্যত্যয় হইতেছে না। ঈদ উপলক্ষে সারাদেশে গরিব-দুঃখীদের জন্য সরকারের পক্ষ হইতে জনপ্রতি ১৫ কেজি করিয়া চাউল দেওয়া হইতেছে; কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক খবর হইল, এই চাউল বিতরণেও কোথাও কোথাও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠিয়াছে। ইহা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হইলেও এই অসত্ প্রবণতা হইতে আমরা কীভাবে বাহির হইয়া আসিতে পারি, তাহা নিয়া গভীর চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
সমপ্রতি ইত্তেফাকের এক খবরে বলা হইয়াছে যে, পাচারের সময় কিংবা মজুত অবস্থায় প্রায় ১৪০০ বস্তা সরকারি চাউল রংপুর, পাবনা, ভোলা ও যশোর হইতে জব্দ করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে সবচাইতে বেশি ৭৮৯ বস্তা চাউল জব্দ করা হইয়াছে রংপুর হইতে। এইসব ঘটনায় র্যাবের হাতে আটক হইয়াছেন ইউপি চেয়ারম্যানসহ দুইজন। এদিকে যশোরের মনিরামপুরে ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত এই চাউল পাওয়ার চূড়ান্ত তালিকায় পাওয়া গিয়াছে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নামও। কোথাও কোথাও ১৫ কেজির কম চাউল দেওয়া হইতেছে। প্রকৃতপক্ষে প্রতি বত্সরই ও প্রত্যেক সরকারের আমলেই কমবেশি এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়া থাকে। ঈদ উপলক্ষে গরিব-দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি চাউল নয়-ছয় হয়। ইহার ফলে বঞ্চিত পরিবারগুলির সদস্যরা ভালোমতো ঈদ উদ্যাপন করিতে পারেন না। এমনও কথা বলা হইয়া থাকে যে ভিজিএফ-ভিজিডি, টেস্ট রিলিফ প্রভৃতির চাউল একশ্রেণির চেয়ারম্যান-মেম্বার আগেই বাজারে ছাড়িয়া দেন। এমনকি এইজন্য তাহারা ডিলারদের নিকট হইতে অগ্রিম টাকাও আদায় করেন। অনেক সময় তালিকায় নাম কাটাকাটিকে কেন্দ্র করিয়া উঠে পাল্টাপাল্টি অনিয়মের অভিযোগ। ফলে দরিদ্র মানুষরা ঈদের চাউল পাইবেন কি না তাহা নিয়া অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাহাদের মাঝে বিরাজ করে ক্ষোভ ও হতাশা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছেন, ‘রাজার হস্ত করে সমস্ত/ কাঙালের ধন চুরি’। এভাবে কাঙালের ধন হস্তগত করা তথা গরিবের হক নষ্ট করা মোটেও কাম্য নহে। এই সংক্রান্ত অনিয়ম ঠেকাইতে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের উপর নজরদারি থাকা প্রয়োজন। হতদরিদ্রদের জন্য যেকোনো কর্মসূচি লইয়া আমরা কোনো অভিযোগ শুনিতে চাহি না। তাহাদের তালিকাকরণের কাজটিও যথাসম্ভব স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার সহিত করিতে হইবে। স্বজনপ্রীতি, তদবিরবাজি ও দলবাজির ফেরে পড়িয়া কার্ড পাওয়ার যোগ্য কেহ যেন বঞ্চিত না হন। আবার তাহাদের জন্য যে চাউল দেওয়া হয়, তাহার মান যেন খাওয়ার অনুপযুক্ত না হয় এবং তাহা যাহাতে খোলাভাবে না দিয়া প্যাকেটের মাধ্যমে দেওয়া হয়, সেইদিকেও নজর দিতে হইবে।