প্রতি বছরের মতো এ বছরও আমন মৌসুম শেষ হওয়ার পরপরই আশঙ্কাজনক হারে কেটে নেওয়া হয়েছে কৃষিজমির টপ সয়েল (জমির উপরিভাগের মাটি)। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রি করার প্রবণতা ভয়ংকর। তা হতে পারে কৃষির জন্য বড় ধরনের হুমকি। ফসলের উৎপাদনে আসতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়। ক্রমাগত কমতে থাকবে ফসল উৎপাদন। যার ফলে অধিক চাষাবাদেও ফলন হবে কম। দেখা দেবে খাদ্য ঘাটতি। জানা যায়, প্রতি বছর শীত মৌসুমে মাটি কাটার এই মহোত্সব অবাধে চলতে থাকে।
শীত মৌসুমে মাঠ থেকে ফসল উঠে যাওয়ার পরপরই মাটি কাটার জন্য স্কেভেটর, ট্রাক ও শ্রমিক সরবরাহ করতে থাকে মাটিখেকো সিন্ডিকেট! দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা বৈধ-অবৈধ ইটভাটার মালিকদের প্রলোভনে পড়ে কিছু জমির মালিক না বুঝে অল্প টাকার লোভে নিজেদের জমির মাটি বিক্রি করে দেয়। অনেক সময় জমির মালিককে না জানিয়ে রাতের আঁধারেই কেটে নেওয়া হয় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি। এই চক্রের সদস্যরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় প্রতিবাদ করার সাহসও পায় না জমির মালিকরা। দফায় দফায় প্রশাসন কর্তৃক অভিযান পরিচালিত হলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে শীত মৌসুম শুরু হওয়ার পরপরই আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে চক্রটি। প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে মাটি সবচেয়ে মূল্যবান। জমির উপরিভাগের ছয় থেকে সাত ইঞ্চির মধ্যেই থাকে সব ধরনের জৈবগুণ। অথচ এটাই কেটে নেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। দেশে কয়েক হাজার ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার জন্য প্রয়োজন হয় মাটি।
প্রশাসন কর্তৃক ইটভাটার জন্য পুকুর ও অনাবাদি জমির মাটি কাটার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু তারা তা না করে ফসলি জমির টপ সয়েল দেদারছে কাটছে, এতে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে কৃষিজমি এবং কমছে উর্বরতা, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশ চরম হুমকির মুখে। পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, কোনো ফসলি জমির টপ সয়েল কাটার অনুমতি কারোর নেই। এ কাজ করার দায়ে অনেককে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করা হয়েছে এবং মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও বন্ধ করা যাচ্ছে না মাটি কাটা। বিজ্ঞানের ভাষায়, জমির টপ সয়েলে সবচেয়ে ঘনত্বের জৈবিক বস্তু থাকে বলে উদ্ভিদ পৃথিবীর প্রায় ৯৫ শতাংশ খাদ্য উৎপাদনে একে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করে। অনেকে সামান্য কিছু টাকার লোভে পড়ে বা পাশের জমির মাটি বিক্রি হওয়ায় জমি উঁচু হয়ে যায়; ফলে সেচের পানি পায় না বাধ্য হয়ে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করে দেয়।
আবার অনেক সময় নতুন ঘরবাড়ি তৈরি করার জন্য জমির মাটি কেটে ঘরভিটা উঁচু করে, ফলে কৃষিজমির টপ সয়েল নষ্ট হয়ে যায়। জমির মাটি কেটেও রাস্তা বানানো হয়, এতে জমি তার উৎপাদন ক্ষমতা হারায় এবং একসময় অনুর্বর হয়ে পড়ে। পরিশেষে, কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে বন্ধ করতে হবে কৃষিজমির টপ সয়েল কাটা। গ্রামের জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য গণমাধ্যম বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। খাদ্য ঘাটতি পূরণ করার জন্য কৃষিজমির গুরুত্ব অনুধাবন করে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। পরিশেষে একটি স্লোগান— কৃষি বাঁচলে, বাঁচবে দেশ; হাসবে কৃষক, দেখবে দেশ।