চোখের জলের হয় না কোনো রঙ!

জন্ম কানাডায়। বড় হয়েছেন সেখানেই। পড়াশোনা করেন কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১০ মাস আগে দেশে এনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত সেই সন্তানকে চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখেন বাবা-মা।

কানাডা হাইকমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে হাইকোর্টে রিট করে দুটি মানবাধিকার সংস্থা। ডাকা হয় বাবা-মা ও কন্যাকে। উভয়ের মতামত নেওয়া হয়। সেই মতামতে হাইকোর্ট প্রাধান্য দেন ১৯ বছরের তরুণীর সিদ্ধান্তকে। তার সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই রবিবার তাকে কানাডা হাইকমিশনে হস্তান্তরের আদেশ দেন আদালত। ওই আদেশের পরই হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে ১৯ বছরের সেই তরুণীকে কানাডা হাইকমিশনের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এ সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কন্যাকে চোখের জলে বিদায় দেন তার বাবা। বাবার চোখের কোনে জল দেখে কন্যার চোখও ভিজে আসে। এ সময় অনেকেই বলছিলেন, এ চোখের জলের কোন কোনো রঙ নাই। তবু এতে হাজারো রঙের ছবি আঁকা আছে।

এদিকে ওই তরুণীর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা, থাকা খাওয়ার খরচ বহনসহ সব ধরণের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা হাইকোর্টকে জানিয়েছে কানাডা সরকার। এর আগে বুধবার ওই তরুণী আদালতে হাজির হয়ে জানান, তিনি আর এক মুহূর্ত বাবা-মায়ের কাছে বাংলাদেশে থাকতে চান না। তিনি কানাডা যেতে চান। পরে মেয়ের সঙ্গে একান্তে কোর্টে কথা বলেন বাবা। ৭২ ঘণ্টার জন্য মত পাল্টায় তিনি। এরপরই রবিবার আদেশের জন্য দিন ধার্য রাখা হয়।

সেই নির্দেশ মোতাবেক রবিবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে হাজির হন বাবা ও মেয়ে। শুনানির এক পর্যায়ে মেয়েটির বাবা আদালতে বলেন, ইতিপূর্বে আমার আদালতে আসার অভিজ্ঞতা ছিল না। আমার মেয়েই আমাকে হাইকোর্টে এনেছে। আপনারা (বিচারপতিগণ) আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন। এ সময় কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার মেয়ে কানাডা চলে যাচ্ছে। এতে আমার দুঃখ নেই। যেখানেই যাক আমার আদরের মেয়ে ভাল থাকুক, সুস্থ থাকুক- এটাই আমার চাওয়া।

এরপরই বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ওই তরুণীর উদ্দেশ্যে বলেন, আশাকরি তুমি অনেক দায়িত্বশীল হবে। ভালোমতো লেখাপড়া করবে। মনে রাখবে এটা তোমার জীবন, ভালো করলে ভালো। আর খারাপ করলে তোমার পরিবার কষ্ট পাবে। আমরা আশা করব- ভালো লেখাপড়া করে তুমি দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

এরপরই হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. গোলাম রব্বানীর হাতে ওই মেয়ের পাসপোর্ট তুলে দেন আদালত। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে দু’পক্ষের আইনজীবী, একজন দূতাবাস কর্মকর্তা ও বাবার স্বাক্ষর নিয়ে মেয়েটিকে কানাডার দূতাবাস কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রিটের পক্ষে আইনজীবী জেড আই খান পান্না ও সারা হোসেন, মেয়ের বাবার পক্ষে মো. ওজিউল্লাহ, রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ছাড়াও কানাডিয়ান হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

তরুণীর আইনজীবী জেড আই খান পান্না ইত্তেফাককে বলেন, মেয়েটি কয়েকদিন হাইকমিশনে থাকবেন। এরপর সকল প্রক্রিয়া সম্পন্নের পরই কানাডার উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করবেন। তবে মেয়েটির বাবা-মা চাইলে হাইকমিশনে গিয়ে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।

জানা যায়, বাংলাদেশি বাবা মায়ের ওই সন্তানের জন্ম কানাডায়। ১৯ বছরের ওই তরুণী কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১০ মাস আগে তার বাবা মা বেড়ানোর কথা বলে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এরপর ওই তরুণী কানাডায় ফিরে যেতে চাইলেও তাকে যেতে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি জানতে পেরে হাইকোর্টে রিট করেন মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক)। ওই রিটের শুনানিতে রবিবার আদালতে হাজির করা হয় ওই তরুণীকে। এরপরই তার বক্তব্য খাসকামরায় নেয় বিচারপতিরা। শুনানিকালে হাইকোর্ট বলেছিলে, সন্তানের সঙ্গে বাবা-মাকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সন্তানের চাওয়া-পাওয়ার মূল্য দিতে হবে। কোনো বিষয়ে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সঙ্গে জোর জবরদস্তি করা যাবে না। তরুণীর বাবা-মাকে আদালত বলেন, তাকে স্বাধীনতা দিতে হবে। তিনি কানাডায় যেতে চায়, সেখানে পড়তে চায়। বাবা-মাকে সেই সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। দুয়ার বন্ধ রাখা চলবে না।