বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গর্বের ধন। বাঙালি হিসেবে দেশে ও প্রবাসে আমাদের পরিচয় ও স্বকীয়তা এনে দিয়েছেন অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ও মুক্তির যে মন্ত্র দিয়েছিলেন, যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং আলো জ্বালিয়েছিলেন, সেই মন্ত্র, নির্দেশনা আর আলোয় জীবনের মায়া তুচ্ছ করে অবগাহন করেছেন বাংলাদেশের বীর সন্তানেরা। আমাদের ভূখণ্ড, আমাদের মুক্তি, স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা, একটি লাল-সবুজের পতাকা—সব অর্জনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অসীম। তাদের কাছে বাঙালি জাতি চিরকৃতজ্ঞ। তাদের ঋণ শোধ হওয়ার নয়। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত ছিলেন অনেক বছর।
পঁচাত্তরে জাতির জনককে নৃশংসভাবে হত্যা করে বাংলাদেশের সার্বিক পটভূমি পালটে দেওয়ার পর পাকিস্তানের রেখে যাওয়া এজেন্ট আর খুনি রাজাকারের দোসররা চেয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান আর বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে। মহান মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘ অনেক বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্িতক ইচ্ছার কারণে আজ দৃশ্যপট অনেকটা পালটে গেছে। জাতি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করার সুযোগ পাচ্ছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা, মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া, তাদের চিকিত্সাব্যবস্হার মতো বেশ কিছু ব্যবস্হা নিয়ে সরকার সত্যিই একটি মহত্ কাজ করছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা হলো, কিছু পাকিস্তানির রেখে যাওয়া মন-মানসিকতার আমলা আর নেতারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো, মৃত্যুতে সম্মান জানানো এবং প্রাপ্য অধিকার প্রদানে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এমন নজির এখন কারো অজানা নয়। প্রবাসে অনেক কারণেই অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার বসবাস। অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা তাদের সন্তানদের সঙ্গে প্রবাসে বসবাস করছেন, অনেকেই কাজের কারণে বিদেশে থাকছেন, অনেকেই স্হায়ী হয়ে গেছেন প্রবাসে। কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয়, সম্প্রতি এক বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে সরকারিভাবে সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে ক্যানবেরা দূতাবাসের অনুরোধের জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি স্মারকপত্র বা নির্দেশনা জারি করে, যা সত্যিই হতাশার। প্রতীয়মান হয় যে ক্যানবেরায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে দূতাবাস কতৃর্ক তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান না দেওয়ায় প্রবাসী বাঙালিদের ক্ষোভের কারণে দূতাবাস মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দেশনা চেয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী সচিবের (বাজেট) স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়, ‘কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা বিদেশে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে শোকবাণী পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নেওয়া যেতে পারে মর্মে নির্দেশক্রমে অবহিত করা হলো।’ এই নির্দেশনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দূতাবাস প্রচার করে। এই নির্দেশনা অনভিপ্রেত এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন আদেশ, ২০২০-এর সঙ্গে অনেকটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই আদেশের পঞ্চম অনুচ্ছেদে কোথাও বিকল্প হিসেবে শোকবাণী পাঠানোর কথা উল্লেখ নেই। অনুচ্ছেদটির অসামরিক বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে লাশ দাফন, সত্কার বা সমাধিস্হ করার পূর্বে নিম্নরূপে সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে
— ‘(ক) মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিন জাতীয় পতাকায় আবৃত করা :তবে শর্ত থাকে যে, উল্লিখিত কফিন কবরে নামানো, সত্কার বা সমাধিস্হ করিবার পূর্বে জাতীয় পতাকা খুলিয়া ফেলিতে হইবে;
(খ) অনুচ্ছেদ ৪-এ বর্ণিত কর্তৃক সরকারের পক্ষে প্রতিনিধি হিসাবে বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ;
(গ) পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে অনুমোদিত সংখ্যক পুলিশ বাহিনীর সশস্ত্র গার্ড কতৃর্ক মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সশস্ত্র সালাম জানানো এবং বিউগলে করুণ সুর বাজানো;
(ঘ) সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক মৃত মুক্তিযোদ্ধার দাফন, সত্কার বা সমাধিস্হ করার অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার পরিচালনা :তবে শর্ত থাকে যে, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বা জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকিলে তাহার পরিবর্তে থানার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বর্ণিত দায়িত্ব পালন করিবেন।’
প্রবাসে গার্ড অব অনারের ব্যবস্হা না করা গেলেও মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিন জাতীয় পতাকায় আবৃত করা, বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি—দূতাবাস কর্মকর্তা কর্তৃক কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন এবং শোকবার্তা জানানোর মতো কাজগুলো দূতাবাস সহজে করতে পারে। আমরা এটাও শুনেছি, বিদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের অনেক দূত মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে নিজেই উদ্যোগী হয়ে শেষবারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়েছেন দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। এতে বলা যায়, নির্দেশনার চাইতেই বেশি দরকার মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানোর মানসিকতা। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চয় অবগত আছে প্রতিটি দূতাবাসের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে। কিন্তু ক্যানবেরা বাংলাদেশ দুতাবাস ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চিঠি চালাচালি ও নির্দেশনা হতাশাব্যঞ্জক এবং চলমান সরকারের নীতির সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ তা ভেবে দেখা দরকার।
দেশের মতো প্রবাসে বাংলাদেশের অনেক দূতাবাস কর্তার মধ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবজ্ঞা খুব প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সরকারের নীতির প্রতি অবজ্ঞা, দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং অনেক ক্ষেত্রে এদের পুনর্বাসনের ও সংগঠিত করার অভিযোগ ও প্রমাণ অনেকের কাছে রয়েছে। ওপরে পেশাদারিত্ব দেখালেও এসব কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়, রাজনীতিবিদ ও সতীর্থ আমলা সহকর্মীদের বিভিন্নভাবে খুশি করে তাদের ওপর গোপনে অর্পিত চক্রান্তকারীদের খেদমত করার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এমনকি করোনা অতিমারিতে প্রবাসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে খাটো করার আপ্রাণ চেষ্টাও করেছেন এদের অনেকেই। মেধা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দেশের মূলনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি আজ্ঞা একজন আমলার থাকা অতি গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা মনে করি, দেশে-বিদেশে যেখানেই বাস করুন না কেন, বীর মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের প্রতি সত্যিকার সম্মান প্রদর্শনে বর্তমান সরকারের নীতি সঠিকভাবে না মানার কোনো সুযোগ নেই। বিদেশে এখন সব দূতাবাসই প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। এখন প্রবাসে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে তাকে যথাযথ সম্মান জানানোর মতো সুযোগ আছে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন আদেশ, ২০২০’-এর আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করি। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও প্রত্যাশা করছি।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট