চলে গেলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব ভাষাসৈনিক অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর গতকাল রবিবার বেলা পৌনে চারটার দিকে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি...রাজেউন)। মমতাজউদদীন আহমদ ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন এবং সেই ঘোষণার বঙ্গানুবাদ তাঁর করে দেওয়া। কীর্তিমান এই ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন।
অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ বেশ কয়েক বছর ধরেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। মাঝে একাধিকবার তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, আজ সোমবার সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলার হাটে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে প্রয়াতের পিতার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে। এর আগে গতকাল রবিবার গুলশান আজাদ মসজিদ এবং মিরপুরের রূপনগরে পৃথক জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
মমতাজউদদীন আহমদ এ বছর ৮৫ বছরে পদার্পণ করেছিলেন। তিনি ১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে গেছেন।
মমতাজউদদীন আহমদ বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত্। এক অঙ্কের নাটক লেখায় বিশেষ পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে নাট্যকার হিসেবে একুশে পদকে ভূষিত হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি কলেজে ৩২ বছর বাংলা ভাষা সাহিত্য এবং বাংলা ও ইউরোপীয় নাট্য বিষয়ে শিক্ষকতা করেন।
মমতাজউদদীন আহমদ ভারতের দিল্লি, জয়পুর এবং কলকাতায় নাট্যদলের নেতা হিসাবে ভ্রমণ ও নাট্য মঞ্চায়ন করেন। তার লেখা নাটক ‘কি চাহ শঙ্খচিল’ এবং ‘রাজা অনুস্বরের পালা’ রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ছাত্রাবস্থায় তিনি তত্কালীন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে অংশ নেন। রাজশাহীর ভাষা আন্দোলন কর্মী গোলাম আরিফ টিপুর সঙ্গে তিনি রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেন। রাজশাহী কলেজে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণেও ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে তিনি রাজনীতির কারণে কারাবরণ করেন।
তাঁর লেখা সর্বশেষ গ্রন্থ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘রক্ত যখন দিয়েছি’ এবং ‘আত্মজীবনীর’ দ্বিতীয় খণ্ড এ বছর প্রকাশিত হয়েছে। মমতাজউদদীন আহমদের লেখা অন্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে: বাংলাদেশের নাটকের ইতিবৃত্ত , প্রসঙ্গ বাংলাদেশ:প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধু। নাটকের মধ্যে রয়েছে: নাট্যত্রয়ী, হূদয়ঘটিত ব্যাপার স্যাপার, স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা (১৯৭১), প্রেম বিবাহ সুটকেশ, জমিদার দর্পণ, বকুল পুরের স্বাধীনতা, সাত ঘাটের কানাকড়ি ইত্যাদি।
মমতাজউদদীন আহমদের মৃত্যুতে সংস্কৃতি এবং নাট্যজগতে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সংস্কৃতি এবং নাট্যকর্মীরা হাসপাতালে ভিড় জমান। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, উদীচী, মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় শোক প্রকাশ করেছে।
জেপির শোক
জাতীয় পার্টি জেপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম একুশে পদকপ্রাপ্ত, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদের ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ একাধারে অধ্যাপক, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও অভিনেতা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন একজন গুণী ব্যক্তিত্বকে হারাল এবং আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হলো; যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জানান।