বাংলা ভাষায় একটি অনন্য শব্দ আছে, এর নাম ‘ল্যাং’। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে— পায়ে পা লাগিয়ে ফেলে দেওয়ার কায়দা। এ কায়দা বড়ই অব্যর্থ। কেউ আপনাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, আপনি আলগোছে পেছন থেকে তার পায়ে নিজের পা দিয়ে একটা টোকা মারুন। সামনে ছুটে চলা ব্যক্তি ভূপাতিত হবেই। এটা হচ্ছে ল্যাং। ল্যাং থেকে এসেছে ল্যাং মারা। পায়ে পা লাগিয়ে অর্থাত্ নিজের পা দিয়ে অন্যের পা জড়িয়ে চলায় বাধা দেওয়া বা ফেলে দেওয়া। ল্যাং মারার বিদ্যায় আমরা খুবই ওস্তাদ। সাধারণত ফুটবল খেলায় এই ল্যাং মারার ঘটনা বেশি দেখা যায়। কিন্তু আমরা ফুটবলকে ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারিনি। আমাদের ফুটবল এখন ‘জাম্বুরা যুগে’ই আটকে আছে। বিশ্বমান তো দূরের কথা, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও আমাদের অবস্থান তলানিতে। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফিফার সর্বশেষ র্যাংকিংয়ে ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৬।
তবে আমরা ফুটবল থেকে ল্যাং মারার কায়দাটা গ্রহণ করেছি, এবং তা খুব ভালোভাবে অনুশীলন করে যাচ্ছি। যদিও ফুটবলে পেছন থেকে ল্যাং মারাকে আপত্তিকর বা ফাউল ধরা হয়। বিধিসম্মত না হলে এর জন্য সতর্কীকরণ কার্ডও দেখতে হয়। এমনকি বিধিবহিভূর্তভাবে ল্যাং মারার কারণে মাঠ থেকে বহিষ্কারও করা হয়।
কিন্তু আমরা সাধারণত বিধি বা নিয়মের খুব একটা ধার ধারি না। আমাদের কাছে ‘ফাউল’টাই ‘গেম’। আর বিধিসম্মত ‘গেম’টাই ‘ফাউল’। আমরা আসলে অত্যন্ত সৃজনশীল। বুদ্ধিমানও বলা যায়। নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধার জন্য প্রয়োজনে আমরা শুধু জার্সি নয়, খেলার নিয়ম, এমনকি গোল পোস্টও পরিবর্তন করতে পারি।
আমাদের দেশে ফুটবলের এখন আর তেমন কদর নেই। একসময় রাজনীতির কদর ছিল। সেটাও আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। আমাদের সব রাজনীতি, রাজনৈতিক দল এখন মিশে গেছে ‘মাল কামাও পার্টি’তে। যে যেভাবে পারো মাল কামাও। যে দলে বা যে পক্ষে থাকলে মাল কামাতে সুবিধা হয়, সেই পক্ষে থাকো। নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ বলে কোনো কিছু নেই। মাল কামানোটাই একমাত্র আদর্শ। এজন্য একে কনুইয়ের গুঁতো মেরে, তাকে ল্যাং মেরে, ওকে তেল মেরে তরতর করে শুধু নিজে সামনে এগিয়ে যাও। নিজের দল, বিরোধী দল বলে কিছু নেই। যে-ই মাল কামানোর ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকেই ল্যাং মারো। প্রয়োজনে খতম করো।
একসময় রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে সম্মান, শ্রদ্ধা জানানো ছিল রীতি। সেই রীতি এখন মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়। এখন আর কেউ কাউকে শ্রদ্ধা করেন না। সম্মান জানান না। বরং একে অপরকে দোষারোপ করেন। একে অপরের বিষোদগার করেন। সারাক্ষণ ল্যাং মারার ধান্দায় থাকেন।
সংবিধান মতে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মালিক জনগণ। এই জনগণের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিয়ে, কিংবা নানা ফিকিরে যারা মাল কামাতে পারছে, তারা কিছুটা হলেও মালিকানা উপভোগ করছে। বাকি সব ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা। কেউ পোছে না। এরা কেবলই ক্ষুব্ধ হয়। রাগ করে। এখন ‘মাল কামাও পার্টি’র তৎপরতায় সাধারণ মানুষ ক্রমেই নিষ্পেষিত হচ্ছেন। তারা দিন দিন ক্ষুব্ধ বিরক্ত হচ্ছেন। তার পরও তারা কিছু বলতে পারছেন না। কারণ তারা বন্দি চার দেওয়ালে। তারা বন্দি মালকামাও পার্টির দৌরাত্ম্যের কাছে। তারা বন্দি সব দিক দিয়ে। তাদের কোনো দল নেই। তারা একতাবদ্ধও নন। এককভাবে প্রতিবাদ জানালে নানা বিপদ। আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আছে রাষ্ট্রদ্রোহসহ আরো নানা আইন। প্রাণও চলে যেতে পারে। তার চেয়ে বরং নীরব বসে থাকাই শ্রেয়। এই নীরবতাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সবার জন্য। সুযোগ নিচ্ছেন মাল কামাও পার্টি। তারা অবাধে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে।
যারা ল্যাং মারার বিদ্যায় সিদ্ধহস্ত তারাই বর্তমানে টিকে থাকছেন, সফল হচ্ছেন, আয়-উন্নতি করছেন। এই ল্যাং মারার বিদ্যাটা কিছু মানুষ কীভাবে পেল—এ এক আশ্চর্য ধাঁধা। এ দেশের মানুষ কেউ কারো ভালো দেখতে পারে না। অকারণেই একজন আরেক জনকে ল্যাং মারে, পেছন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। বলা হয়ে থাকে, বাঙালিদের জন্য নরকে নাকি কোনো পাহারাদারের দরকার হয় না। কেউ যদি প্রাচীর বেয়ে নরক থেকে পালাতে যায়, তবে অন্যরা পা ধরে টেনে নামিয়ে ফেলে। এতে করে কেউ-ই পালাতে পারে না। মুক্তিও পায় না। এ ব্যাপারে নানা ধরনের গল্প প্রচলিত আছে। এর একটি উল্লেখ করা যাক-
— একবার এক সন্ন্যাসীর শখ হলো—তিনি স্বর্গ ও নরক দেখবেন। মহান ঈশ্বর তার প্রার্থনা পূরণ করলেন। তিনি সে অনুযায়ী প্রথমে গেলেন স্বর্গে, তারপর নরক দেখতে বের হলেন। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় গিয়ে দেখলেন, একদল লোক ভয়াবহ রকম আগুনে পুড়ছে। তাদের ঘিরে রয়েছে অসংখ্য পাহারাদার। তিনি স্বর্গের এক দূতকে বললেন, ‘এরা কারা, আর চারপাশে কেন এত পাহারা?’
সেই স্বর্গের দূত বললেন, ‘এরা ইহুদি। এরা ঈশ্বরে খুব একটা বিশ্বাস করে না। তাই এই চরম শাস্তির ব্যবস্থা।’
সন্ন্যাসী জিগ্যেস করলেন, ‘চারপাশে এত পাহারা কেন?’
দূত বললেন, এরা যেন একজন আরেক জনের কাঁধে উঠে পালাতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা।
এমনি করে যেতে যেতে তিনি হঠাত্ দেখলেন একদল লোক জ্বলছে কিন্তু তাদের চারপাশে কোনো পাহারা নেই! সন্ন্যাসী বাবা অবাক হয়ে আবার স্বর্গের দূতের সন্ধান করলেন। তাকে পেয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘এরা কারা?’
দূত অবজ্ঞা ভরে বললেন, এরা বাঙালি। এরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী হলেও সব রকম অপকর্মই করত। তাই তাদের জন্য এই শাস্তি।
সন্ন্যাসী আবারও জিগ্যেস করলেন, কিন্তু এদের চারপাশে কোনো পাহারা নেই কেন? সন্ন্যাসীর এমন প্রশ্নে স্বর্গের দূত হেসে বললেন, এদের চারপাশে পাহারা লাগে না। এরা একজন উঠতে গেলে আরেক জন টেনে ধরে!
কাঁকড়ার সঙ্গে আমাদের স্বভাবে আশ্চর্য মিল আছে। একটা পাত্রে কয়েকটি কাঁকড়া রাখার পর যদি পাত্রটির মুখ খোলাও রাখা হয়, তবু কাঁকড়ারা পালাতে পারে না। কারণ একটা কাঁকড়া যদি ওপরে ওঠার চেষ্টা করে, বাকিরা টেনে নিচে নামিয়ে ফেলে।
এখানে পরিবারে, অফিসে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের, উপাসনালয়ে, আড্ডায়, টকশোতে সবখানে কেবল দলাদলি, অনৈক্য ও বিভক্তি। প্রত্যেকের আলাদা কর্মসূচি, আলাদা এজেন্ডা আছে ঠিক। কিন্তু সবার চূড়ান্ত লক্ষ্য যেন অপরকে ল্যাং মারা। জব্দ করা। ধাক্কা মেরে খালে ফেলে দেওয়া।
আসল কথা হচ্ছে, একজন আরেক জনের পিছে লাগাটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই আরেক জনের সর্বনাশ। একজনের সুন্দর একটা টিনের ঘর আছে, দূর থেকে মারো একটা ঢিল। একজনের বাগানে সুন্দর ফুল ফুটেছে, কোনো এক রাতের অন্ধকারে গিয়ে গোপনে সেই ফুলগাছগুলো কেটে দাও। কারো পুকুরে অনেক বড় বড় মাছ রয়েছে। গোপনে দাও বিষ মিশিয়ে। কেউ সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছে, দাও তাকে ল্যাং, যদি না পারো তবে দাও তার নামে কলঙ্ক রটিয়ে। এভাবে অন্যজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া, ল্যাং মারাটা আমাদের জাতীয় স্বভাবে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির একটা মাত্র পথ আছে। অবশ্য সেটা এ জাতি গ্রহণ করবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কেননা এ পথ গ্রহণের জন্য যতটুকু মানসিক শক্তি, সাহস ও উদ্যম প্রয়োজন তা এ জাতির মধ্যে অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। যদি তাদেরকে বলা হয় যে, আপনারা একে অপরকে পেছন থেকে টেনে ধরার সংস্কৃতি বাদ দিন, অন্যের জন্য পথ ছেড়ে দিন, সে আগে যাক, তারপর আপনি যান। এখানেও প্রশ্ন আসবে শুরুটা করবে কে? আপনি এত মহান তাহলে আপনি আগে শুরু করুন!
অনেকে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলতে পারেন :আমার নিজের পাঁঠাটিকে কাটব আমি লেজের দিকে, তাতে কার বাবার কী?
আমাদের রাজনীতি-আদর্শ সব এখন লীন হয়ে গেছে মাল কামাও পার্টি ও ল্যাং মারার বিদ্যায়। এর থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে তেমন লাভ হবে বলে মনে হয় না। বরং নিজেরাই যদি এই নীতি-আদর্শে দীক্ষিত হতে পারি, তাহলে কিছুটা হলেও দুঃখ ঘুচবে। হয়তো শান্তিও মিলবে।
লেখক: রম্যরচয়িতা