বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি নাটক লিখেছিলাম। শুরুর দৃশ্যপট ছিল মোরগ-মুরগির এক বিক্রেতাকে নিয়ে। বিক্রেতার ডান হাতে জীবন্ত দুই প্রাণ। ঘুরে ঘুরে হাঁক দিচ্ছেন, ‘অ্যাই ভালো মুরগি! মুরগি রাখবেননি?’ এক নারী ক্রেতা পথে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি বিক্রেতাকে জিগ্যেস করলেন তার ডান হাতের মোরগ দুটির দাম। মোরগগুলো ওপরে তুলে তার দিকে তাকিয়ে বিক্রেতা ছেলেটির উত্তর:
-আমন্নের জন্য যান পাসসো টাকা কম! এক দাম সাড়ে ৩ হাজার ট্যাহা! দাম শুনে ঐ নারী বিচলিত হলেন না। মনে মনে ভাবলেন, সস্তাই মোরগগুলো! তিনি কত দিতে পারবেন বিক্রেতার প্রশ্নের উত্তরে বললেন
-ছেলেকে স্কুল থেকে আনার সময় হয়ে গেছে ভাই! আপনি কাল সকালে আসেন! ঐ যে আমার বাসা! তবে কম রাইখখেন।
‘দামের বাজার’ নাটকের কাহিনি লেখা হয়েছিল ক্রমবর্ধমান পণ্যবাজারের আগামী সময়কে ঘিরে। দিনদিন মূল্যস্ফীতির সেই বাস্তবতা আজ দৃশ্যমান। পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ছে তো বাড়ছেই। মূল্যের স্ফীতি হচ্ছে। বর্ধিত মূল্য অর্থনীতি সম্পর্র্কে জন্মদাতা পিতার প্রায় সময়ের ব্যক্ত সংলাপ ছিল ‘ওরা (বাঁশের তৈরি মাথায় বহনযোগ্য পাত্র) ভইরা ট্যাকা নেও, জেব (পকেট) ভইরা জিনিস আনো’। এখন যেন তা সত্যসিদ্ধে পরিণত হয়েছে। দ্রব্যের কাছে টাকার কোনো দাম নেই!
সীমিত আয়ের সৎ মানুষেরা আজ যেন দেশে সংখ্যালঘু! বিক্রেতার কাছে এই শ্রেণির ক্রেতারা মূল্যহীন ও অপাঙ্ক্তেয়! কেনাবেচায় তাদের কাছে সত্ ও অসৎ ক্রেতা প্রাধান্য পায় না। অগ্রাধিকার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকাওয়ালা। যে ক্রেতা দরকষাকষি করেন না, তারাই বিক্রেতার কাছে মূল্যবান।
যারা নিয়মিত বাজার করেন, তারাই দেশের নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরে থেকে কষ্টের তীব্রতাটুকু অনুভব করেন। ক্রমবর্ধমান মূল্য দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস ওঠে। হাপিত্যেশ করেন। ভাবেন, সম্রাট আকবরের মোগল আমল যদি ফিরে আসত! যদিও জনস্রোতের মধ্যে চাহিদা ও সরবরাহবিষয়ক অর্থনীতির সূত্র অকার্যকর।
ঊর্ধ্বগতির পণ্য বাজারের চাপে দাম কমে গেছে স্বল্পমানের কাগজি ও ধাতব মুদ্রার। বিষয়টি লক্ষ করছি পাঁচ-ছয় বছর ধরে।
মহানগরীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্কর। ২০১৮ সালের নভেম্বরের এক বিকেল। বাসে উঠে বাম দিকে জানালার পাশে বসেছি। গন্তব্য দৈনিক বাংলার মোড়। সুঠামদেহের ষাটোর্ধ্ব নারী প্লাস্টিকের বাটি উঁচু করে বলছেন, ‘স্যার, ১০টা টেকা দেন না একটা রুডি খামু।’ দিলাম পাঁচ টাকা মূল্যমানের একটা কয়েন। ভিক্ষুক নারী রেগে গিয়ে প্রশ্ন করেন, এইডা কী দিলেন? এইডা এহন কেউ নেয়? আমি তো রীতিমতো হতচকিত! ভিক্ষুক নারীর কথাগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়াল। ঠিকই তো! দেশে ধাতব কিংবা স্বল্প মানের মুদ্রার কী মূল্য আছে! কী পাওয়া যায় দুই টাকা কিংবা পাঁচ টাকায়? ফকিরও তা নিতে চায় না। ফুটপাতের তরকারি বিক্রেতা বা অন্য পণ্যের ভ্যানওয়ালা বিক্রেতাও আজকাল ধাতব পয়সায় মূল্য পরিশোধে ক্রেতাকে ভৎর্সনা করেন। কিন্তু আমাদের মতো সীমিত উপার্জনকারী মানুষ বা ভোক্তার কাছে এক টাকা, দুই টাকা ও পাঁচ টাকার কাগজি বা ধাতব মুদ্রা সবই মূল্যবান। সময়ের ধারাবাহিকতায় এক টাকার গচ্ছিত সঞ্চয় ১০০ টাকায় পরিণত হয়। ভবিষ্যৎ বিপদমুক্ত নিরাপত্তার দিকটি অনেকের মতো আমাকে শিক্ষাদান করেছেন আমার জন্মদাত্রী মা।
ক্রমবর্ধমান বাজারব্যবস্থায় অন্যায় দেখলে আমার বেশ ক্ষোভ হয়। বাজার বা দোকানে প্রায়ই অসাধু বিক্রেতা বা দোকানিদের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করি। মাঝে মাঝে অনভিপ্রেত অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে।
মহানগরে বসবাস এবং নিয়মিত যাতায়াতে যানবাহন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কষ্টার্জিত সঞ্চয় ও ব্যাংক ঋণের (৬ বছর মেয়াদি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য) অর্থায়ন নিয়ে ২০১১ সালে একটি রিকন্ডিশন ব্যক্তিগত টয়োটা গাড়ি ক্রয় করি। সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে জ্বালানি গ্যাসে গাড়িটিকে রূপান্তর করি শুরুতেই। পাম্প থেকে জ্বালানি নিতে গিয়ে ১২ বছরে আমার পাম্প জ্বালানি বিক্রেতাদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা একই। অন্যায় বা অনিয়ম যেন এখানেও প্রতিষ্ঠিত নিয়ম। গ্যাসের চাপ কমের বিড়ম্বনা তো থাকেই। পাম্পে সংগ্রহকৃত মোট ঘনফুটের গ্যাসের দাম ধরুন মূল্য তালিকার ডেস বোর্ডে উঠেছে ৪৩২ টাকা ৫ পয়সা। দায়িত্বরত ব্যক্তি রসিদে লিখবে ৪৩৩ টাকা। ৯৫ পয়সা বেশি এখানেই। তারপর মূল্য পরিশোধের জন্য নগদ কাউন্টারে গেলে তা ৪৩৫ টাকা হয়ে যায়!
এমন আরো ঘটনা অহরহ ঘটে। আগে ফেরতযোগ্য খুচরা টাকার বদলে চকলেট বা ক্যান্ডি দেওয়া হতো। সেটা উঠে গেছে। ক্রেতা বা ভোক্তার পাওনা এই খুচরা টাকা যেন বিক্রেতা বা সেবাদানকারীর! যেখানে ক্রেতা অসহায়।
ক্রেতা হিসেবে সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন কষ্টার্জিত উপার্জনের সীমিত অর্থ বিক্রেতা ছিনিয়ে নেয় অন্যায়ভাবে। উল্লেখিত ঘটনাগুলো প্রায়ই ঘটছে। এমন ঘটনা থেমে নেই দেশের সুপারশপগুলোতেও, যেখানে আধুনিক ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) পদ্ধতির ব্যবহূত সফটওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারাইজড বিল হয়। পাম্পের মতো সুপারশপেও বিলের ক্ষেত্রে দেখি পয়সা টাকায় পরিণত হয়ে যায়! এসব দেখভালের জন্য সরকারি অনেক দপ্তর ও লোকবল রয়েছে।
ধাতব মুদ্রা ও খুচরা টাকা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই! ভোক্তা হিসেবে যার মাথা, তারই যেন ব্যথা! অল্প মানের কাগজি মুদ্রা ছাপানো এবং ধাতব মুদ্রা বের করা সরকারের পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব, সেই বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা প্রকাশ করতে বেশ গলদঘর্ম। সংশ্লিষ্ট মূল্যমানের মুদ্রা প্রকাশে অনেক সময় দ্বিগুণ অর্থ খরচ হয়। সমাজে লেনদেনে খুচরা টাকা বা ধাতব পয়সা যখন মূল্যহীন, তখন ভূক্তভোগী ক্রেতা হিসেবে আমি কি বলব এসব মুদ্রা বের করায় অর্থহীন ব্যয় হচ্ছে?
অর্থনীতিবিদেরা বলবেন, দ্রব্যমূল্যের মূল্যস্ফীতির জোয়ারে কম মূল্যমানের দাম থাকে না। এটাই অর্থনীতির নিয়ম। কিন্তু অর্থশাস্ত্রের ছাত্র হিসেবে বলি, অবকাঠামোগত সরকারি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনাই পারে এর সমাধান দিতে। তাছাড়া উত্পাদনকাঠামো জোরদারে সবাইকে নজর দিতে হবে।
লেখক: লেখক ও সাংবাদিক