কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বেই সন্দেহবাতিক রাজনীতির ব্যাপকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্দেহবাতিক রাজনীতির মনোভাব সমস্ত সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। যদিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পূর্বেও দুটি বড় বিশ্বযুদ্ধ মানব জাতি দেখেছে, এছাড়া ছোটখাটো অনেক যুদ্ধ পৃথিবীতে হয়েছে। এসব যুদ্ধের মূলে একটি সন্দেহবাতিক রাজনীতির ভূমিকা ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই।
সন্দেহপ্রবণতাটা হচ্ছে একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। ব্রিটিশ কবি বায়রন বলেছিলেন, সমগ্র ইংল্যান্ডে দুজন ছাড়া আর কোনো সতী নারী নেই। এর মধ্যে একজন ব্রিটিশ রানি, অন্যজন তার নিজের মা। তিনি বলেছিলেন, ‘রানি ভিক্টোরিয়াকে সতী না বললে আমার শাস্তি হবে আর নিজের মাকে সতী না বললে আমি নিজেই একজন জারজ সন্তান হয়ে যাব।’ মনের মধ্যে গ্রোথিত গভীর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ ধরনের বিচার আসে। বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশে শুধু রাজনীতিক নয়, বহু বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদের মধ্যে এরকম মনোভাব লক্ষ করি। বাংলাদেশের সাংবাদিক, লেখক, গণমাধ্যমকর্মীদের কারো কারোর মধ্যে এ রকম মনোভাব ভালো রকম আছে। সত্যের প্রতি, মানুষের প্রতি, ভবিতব্যের প্রতি মৌলিক বিশ্বাসটাই ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে দিনদিন।
আধ্যাত্ম্যবিজ্ঞান মানুষকে ধীরস্থিরভাবে বসে ধ্যান করতে বলে, স্বতন্ত্রভাবে একা থাকতে এবং সব সময় অন্যদের সংসর্গে না থাকতে বলে। অন্যদের সঙ্গে মেশামেশি করতে গেলে স্নায়ুগুলো পিষ্ট ও অবসন্ন হয়। মাঝে মাঝে একা থাকাটা উপভোগ করতে শিখুন— এই সমস্ত ধারণাই নিবৃত্তি নামক প্রধান বৈদান্িতক উপদেশের মধ্যে আছে। প্রবৃত্তিকে আলাদাভাবে দেখাতে হয় না, মানবজাতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রবৃত্তিপরায়ণ। একটি শিশু লাফায়, ঝাঁপায়, ছুটে বেড়ায়, এটা ঠেলে, ওটা টানে—এটা শিশুর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু নিবৃত্তি তা নয়। নিবৃত্তির মধ্যে রয়েছে মানসিক প্রজ্ঞার এক গভীর অভিব্যক্তি। আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যে কারো কারো নিবৃত্তির কোনো আশীর্বাদ নেই, কেবল রয়েছে প্রবৃত্তির ভর। রয়েছে ভোগবাদিতা। ভোগবাদিতার কারণে সন্দেহপ্রবণতা বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। ফলে মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, মানুষ দ্বারা মানুষ খুন হচ্ছে, জিঘাংসা বাড়ছে।
বড় বড় রাস্তাঘাট, ইটের গাঁথুনির বড় বড় প্রতিষ্ঠান, চোখ ধাঁধানো সেতু—এগুলোকে উন্নয়নের সূচক হিসেবে ধরে আমরা আনন্দে মাতোয়ারা হলেও শান্ত সমন্বয়ী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না। কারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসার শক্তি অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ভালোবাসার শক্তি গড়ে তুলতে হলে এবং পরস্পরে সঙ্গে শান্িততে বসবাস করতে হলে প্রয়োজন নিবৃত্তির আশীর্বাদ, যা সবার অন্তর্নিহিত দেব স্ফুলিঙ্গরূপ আধ্যাত্মিক শক্তি বিকাশের সহায়ক এবং সেই নিবৃত্তি আবার আমাদের সব প্রবৃত্তিকে উদীপ্ত করতেও পারে। এ প্রক্রিয়ায় ভোগবাদিতা দূর হতে বাধ্য।
আমাদের রাজনীতিক, আমলা-বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক সবাইকে এক সমন্বয়ী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশসেবায় নিয়োজিত থাকতে হবে, তখন সাধারণ সব মানুষ বদলে যাবে। গ্রামের কৃষক-কুলি-মজুর-সাধারণ শ্রমিকদের বিদ্যার প্রাচুর্য না থাকলেও তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ভোগবাদিতা নেই; রাজনীতিক আমলাদের মধ্যে যেটা আছে। বাংলাদেশে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দুটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এখনো তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। এর আগেও বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে মাগুরা ভোট ডাকাতির নির্বাচন দেশবাসী দেখেছে। সে সময় যারা চুরি-ডাকাতি করেছে, এখন তারা অন্যকে ডাকাত বলছে। সর্বাত্মক হিংসাত্মক চিন্তাভাবনা, হিংসাত্মক কাজকর্ম— কেন এ রকম হচ্ছে? কারণ অনেকের চিন্তা-ভাবনা সুস্থির ও পরিশুদ্ধ নয়। নিবৃত্তির আশীর্বাদ থেকে তারা বঞ্চিত। এটা নিয়ে ভাবতে হবে, আত্মজিজ্ঞাসা করতে হবে। দেশের মানুষকে তাদের ইচ্ছানুযায়ী ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। কেন রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করবে? এটা তো গণতন্ত্র নয়। আমাদের রাজনীতিতে এসব বিচু্যতি রয়েছে, সেই সঙ্গে আছে প্রচুর দুর্নীতিও। কিন্তু সামান্য নিবৃত্তির সংস্পর্শে এ সমস্তই বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশে সামাজিক পুনর্গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এই পুনর্গঠনের কাজটি কোনো রাজনীতিবিদ বা বুদ্ধিজীবী কিংবা যাজকের দ্বারা এককভাবে সম্ভব নয়। সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সমাজকে পুনর্গঠন করতে হয়। এর নেতৃত্ত্বে থাকবেন যিনি, পরম সৃষ্টিকর্তাকে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। এমন দিব্য মাহাত্মে্যর আবির্ভাব এ দেশের ইতিহাসে ঘটেছে। আমাদের মৌলিক ভাবনটাকে মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বেষ্টিত করতে হবে। সম্পূর্ণ সত্ত্বভাবাপন্ন পুরুষ বা নারী একজন অসামান্য মানুষ, যিনি প্রকৃষ্টরূপে বিকশিত হয়ে অন্তরের দেবত্বকে প্রকাশ করতে পারেন। মানবীয় ক্রমবিকাশের এটিই পরম লক্ষ্য ও চরম অবস্থা। সমাজে আরো বেশি সংখ্যায় এ ধরনের মানুষ সৃষ্টি হলেই সামাজিক মূল্যবোধ জেগে উঠবে। মূল্যবোধমুখী সমাজই আলোকিত করবে দেশকে, মানুষকে।
আধুনিক সমাজবিদ্যা বলে আমরা যে বিষয়টি দেখছি, তা অনেকটাই পরিসংখ্যানমাত্র। কিন্তু সত্যিকারের সমাজবিদ্যা হলো সেটিই, যেটি মানুষের আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক ক্রমবিকাশে ভূমিকা রাখে। সেই দিকে বিকাশশীল কোনো সমাজের প্রকৃতি বা লক্ষণ কী? আমরা একে বলি আধ্যাত্মিক লক্ষ্য বা দিশা। মানুষের স্তরে ক্রমবিকাশের লক্ষ্য হলো এই আধ্যাত্মিক দিশা। একবিংশ শতাব্দীর জীববিদ্যা ধীরে ধীরে এই কথা বলতে আরম্ভ করেছে—অতিক্রম করে যাও, এই দেহগত সীমাবদ্ধতাকে, ইন্দ্রিয়যজ্ঞ সীমাবদ্ধতাকে; সমৃদ্ধ মস্তিষ্কেই রয়েছে। জীববিদ্যা এখন মনোসামাজিক বিকাশের কথাও বলছে। সমাজে প্রত্যেক লোকের কাছেই একটা লক্ষ্য স্থাপন করতে হবে। সেই লক্ষ্যটা হচ্ছে সেবা ও ত্যাগ। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এ কথাটা বারবার বলেন, তিনি সবাইকে সেবা ও ত্যাগের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
এবার আসি তপস্যা প্রসঙ্গে। সবকিছুতেই সাফল্যের চূড়ায় যেতে হলে চাই তপস্যা বা ধ্যান। তপস্যা থেকেই জ্ঞানের উত্পত্তি। শুধু ভূরি ভূরি বইপুস্তক পাঠ করলেই জ্ঞান হয় না, কিছু জানা যায় বটে। পাশ্চাত্যের মানুষ জ্ঞানের প্রতি অণুরাগ দেখিয়েছেন এবং জ্ঞানের সাহাঘ্যে গড়ে তুলেছেন আধুনিক সভ্যতা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গবেষণা; ক্লাবে যাওয়ার সময় নেই—এইভাবে মানুষ কাজ করেছে দুই শতক ধরে। আর তাতেই এসেছে আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সম্পদভান্ডার। বহু যুগ আগে এই উপমহাদেশেও একই প্রবণতা ছিল। ছিল জ্ঞানের প্রতি অপ্রতিহত প্রেম। কেউ হয়তো শুনল সুদূর বারানসীতে একজন আচার্য আছেন, আর অমনি আচার্যের কাছে শিক্ষা গ্রহণের জন্য হাঁটতে আরম্ভ করল।
পশ্চিম পাঞ্জাবের তক্ষশীলায় (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত) চরক সুশ্রুতের মতো খ্যাতনামা আচার্যের কাছে চিকিত্সাশাস্ত্র ও শল্যবিদ্যা শিখতে ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ছাত্ররা হেঁটে হেঁটে যেতেন। যেখানের জ্ঞানের প্রতি সত্যিকার অনুরাগ থাকে, সেখানেই দেখা যায় ছোটখাটো অসুবিধা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। জ্ঞান অনুসন্ধানই হচ্ছে তপস্যা। রাজনীতিকগণ রাষ্ট্র পরিচালনা করেন ঠিক, কিন্তু জ্ঞানের প্রতি তাদের অনেকে এতটাই উদাসীন যে অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো মাথায় ঘুরঘুর করে। এসব থেকে প্রত্যেক রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ ও আমলাদের সরে আসা বড়ই প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, বর্তমান যুগের আদর্শটি হলো জ্ঞান অর্জন, যা তপস্যার মাধ্যমে সম্ভব। রাষ্ট্রের যে কাজই হোক না কেন, সেটিতেই তপস্যা থাকতে হবে। প্রত্যেককেই জ্ঞানমার্গের পথিক হতে হবে। প্রকৃতি মানুষকে তার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটি আপন তর্জনীর বিপরীতে স্থাপনের ক্ষমতা দান করেছে, যাতে সে তার চারপাশের জগৎকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞান ও শক্তি অর্জন করতে পারে। তবেই আর কোনো বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হবে না।
লেখক: নিবন্ধকার