বর্তমান ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে অনেক ব্যক্তিই বলছেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার পর নিজেকে একটু এলোমেলো মনে হচ্ছে। বেশ কিছুদিন থেকে গল্পের আসরেও কথা বলতে গিয়ে চেনা লোকজনের নাম মনে করতে পারছেন না। আবার কেউ অফিসে যাওয়ার পর প্রায় দিনেই বাসায় কিছু জরুরি কাগজপত্র ফেলে আসেন। লিফটে উঠে কোন তলায় যাবেন, সেটা নিয়ে বিভ্রান্তি কাজ করছে। কেউ কেউ কোনো কারণ ছাড়াই অনেক সময় অস্থির ছটফট করতে থাকেন। এই সমস্যাটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্রেইন ফগ বা ব্রেইনের কুয়াশা বলে।
ব্রেইন ফগ শব্দটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে তেমন পরিচিত নয়। তবে কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিদের দ্বারা তাদের চিন্তাভাবনা অলস, অস্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ না হলে তারা কেমন অনুভব করে তা বর্ণনা করতে ব্রেইন ফগ ব্যবহার করা হয়। আমরা সকলেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই রকম অনুভূতি অনুভব করি। ফ্লু বা অন্য কোনো অসুস্থতায় অসুস্থ থাকলে অনেকেই স্পষ্টভাবে ভাবতে পারে না। একটি অ্যান্টিহিস্টামিন বা অন্য ওষুধ গ্রহণ করলেও কিছু সময়ের চিন্তাভাবনা অস্পষ্ট হয়, কোনো কিছু মনে করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করেছেন, একটা নির্দিষ্ট সময়ে পড়ে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু এই সমস্যা যদি স্বাভাবিক না হয়, এবং অনেক দিন থাকে তখন সমস্যাটিকে ব্রেইন ফগ বলে। এটি কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের সাময়িক স্মৃতিভ্রমের সমস্যা। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের কগনিটিভ সাইকোলজির জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আমির হোমান জাভেদি বলেন, দুই বছর ধরে বিশ্বব্যাপী অতিমারির মানসিক চাপের কারণে ব্রেনের পক্ষে স্মৃতি ধরে রাখা কঠিন হয়েছে। তাই ব্রেন কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। অনেক বিজ্ঞানী ব্রেইন ফগের জন্য অতিরিক্ত মানসিক চাপকেই দায়ী করেছেন।
লক্ষণসমূহ : ব্রেইন ফগ বা মস্তিষ্কের কুয়াশার লক্ষণগুলো হলো—১. ভুলে যাওয়া। যেমন, দৈনন্দিন কাজ ভুলে যাওয়া বা চিন্তার ট্রেন হারানো। ২. শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা। ৩. স্বাভাবিকের চেয়ে ধীরে ধীরে চিন্তা করা। ৪. ক্লান্ত বোধ করা। ৫. সাধারণ কাজগুলি সম্পূর্ণ করতে বেশি সময় নেওয়া। ৬. সহজেই বিভ্রান্ত হওয়া। ৭. চিন্তা করতে সমস্যা হওয়া । ৮. কাজকর্ম সংগঠিত করতে সমস্যা।
ব্রেইন ফগ বা মস্তিষ্কের কুয়াশা পরিষ্কার করতে কী করতে পারেন:ব্রেইন ফগ খুবই সাময়িক একটা বিষয়। এ সময় অনেক কিছু মনে না থাকাটা স্বাভাবিক। অনেকেরই আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। তবে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো আপনার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করা এবং আপনি যে দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণগুলি অনুভব করছেন সেগুলি তাদের সঙ্গে শেয়ার করে নিশ্চিত হওয়া আপনার নিউরোলজিক্যাল কোনো সমস্যা নেই। বর্তমানের গবেষণাগুলোতে মস্তিষ্কের কুয়াশা মুছে ফেলার জন্য, এমন সমস্ত ক্রিয়াকলাপ অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যা প্রত্যেকের চিন্তাভাবনা এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। আপনি ব্রেইন ফগে আক্রান্ত হলে নিচের বিষয়গুলো অনুশীলন করতে পারেন।
হালকা ব্যায়াম করুন: আগে থেকে ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকলে আস্তে আস্তে শুরু করুন এবং আস্তে আস্তে সময় বাড়িয়ে নিন। যদিও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ব্যায়ামের কোনো প্রতিষ্ঠিত ‘ডোজ’ নেই, তবে সাধারণত দিনে ৩০ মিনিট, সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যায়াম করা ভালো। সাইকেল চালানোও ভালো ব্যায়াম হতে পারে।
শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন: মস্তিষ্কের জন্য শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম খুব উপকারী। এক্ষেত্রে জোরে নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ বুকের মধ্যে আটকে রেখে আস্তে আস্তে ছাড়তে পারেন। এই ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কের শক্তি বাড়বে।
শেয়ার করুন: আপনি মনের কষ্টগুলো প্রিয়জনের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। যত বেশি শেয়ার করবেন, মানসিক চাপ কমবে, ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কুয়াশা ততই পরিষ্কার হতে থাকবে।
স্বাস্থ্যকর খাবার খান: মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খাবারের বেশ ভূমিকা রয়েছে। চিনি, লবণ, ভাত কম খেলে সবচেয়ে ভালো। পাশাপাশি অলিভ অয়েল, ফল ও সবজি, বাদাম ও মটরশুঁটি আপনার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
নেশা নয়: সব ধরনের অ্যালকোহল এবং মাদকের নেশা থাকলে এড়িয়ে চলুন। শখ করেও কোনো ধরনের নেশা নেবেন না। কেননা এসব আপনার মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
নিয়মিত ভালো ঘুম :ঘুম হলো এমন একটি সময় যখন মস্তিষ্ক ও শরীর টক্সিন পরিষ্কার করতে পারে এবং নিরাময়ের কাজ করতে পারে। তাই এ সময় শরীরের জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। ভালো ঘুমের জন্য স্লিপ হাইজিন প্র্যাকটিস করুন।
সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ :মানুষ সামাজিক প্রাণী। সামাজিক ক্রিয়াকলাপগুলি মন-মেজাজের অনেক উপকার করে, পাশাপাশি চিন্তাভাবনা এবং স্মৃতিশক্তিকেও সহায়তা করে।
সৃজনশীল কাজ করুন: এ সময় মজার উপন্যাস, বই, সিনেমা, নাটক দেখলে আপনার মানসিক চাপ কমে যাবে এবং কগনিটিভ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করবে। আপনি অবসর সময়ে গানও শুনতে পারেন, কবিতা আবৃত্তি শুনতে পারেন।
মাইন্ডফুলনেন্স অনুশীলন: নিয়মিত মাইন্ডফুলনেন্স মেডিটেশন অনুশীলন করতে পারেন। মাইন্ডফুলনেন্স মেডিটেশনের প্র্যাকটিসের ফলে মনস্হির হবে এবং মানসিক প্রশান্তি বাড়বে।
বিশেষজ্ঞ সহায়তা: অনেকের পক্ষে একা একা এসব প্র্যাকটিস করা দুরূহ। আবার এসব প্র্যাকটিস করেও সমস্যা থেকে বের হওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। গবেষণায় দেখা যায়, মাইন্ডফুলনেস বেসড কগনিটিভ থেরাপি ব্রেইন ফগের জন্য খুব ভালো কাজ করে। প্রয়োজনে কোন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা মানসিক বিশেষজ্ঞের কাছে কগনিটিভ বিহেবিয়ার থেরাপি নিতে পারেন।
লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট