দেশটা যেন এক শিশুপার্ক, ইচ্ছের দোলনায় দোলে সবাই। জীবন সংস্কৃতি আজ অপসংস্কৃতির অবাধ চর্চাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চারদিকে আজ নারকীয় পরিবেশ। কি ঘরে কি বাইরে সর্বত্রই নারকীয় অবস্থা। পত্রিকার পাতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা টেলিভিশন খুললেই দেখি হত্যা, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন, গুম, অপহরণ, আত্মহত্যা, মাদক, টাকা পাচার, মানব পাচার, ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, আত্মসাৎ, অবৈধ দখল প্রভৃতি নেতিবাচক খবর। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, ঘন ঘন লোডশেডিং, সড়কে ভয়াবহ যানজট ও মশার কামড় ইত্যাদিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। যেন দেখার কেউ নেই। নেতিবাচক খবরের স্রোতে ইতিবাচক খবর হারিয়ে যেতে বসেছে। সর্বত্রই আত্মকেন্দ্রিকতার সর্বোচ্চ চর্চা।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠার করার পরও আমাদের জাতীয় রাজনীতি আজও নূ্ন্যতম জাতীয় ঐক্য বা জনগণের ঐক্য স্থাপনে ব্যর্থ। নানা ধরনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষগুলো নানামুখী উসকানিমূলক কথা বলে পরিস্থিতিকে প্রতিনিয়ত আরো জটিল ও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। নূ্ন্যতম পারস্পারিক সহিষ্ণুতার মনোভাব নেই। সর্বত্র চরম অসহিষ্ণুতা বিরাজমান। পরস্পরকে চিরকালের জন্য শেষ করে দেওয়ার চক্রান্ত, বিধ্বংসী যুদ্ধ চলমান। ব্যক্তি স্বার্থের চরম মানসিকতায় মানবিক মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় অহরহ। সর্বক্ষেত্রে চলমান এ বিরোধিতা ও বিপর্যয় সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদী অপশক্তিকে সামনে নিয়ে আসতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দায়িত্বশীলরা যে যার মতো করে যা খুশি তা বলে যাচ্ছে। আমরা দেখি জলের অভাবে কৃষকের আত্মহত্যা, মেসের টাকা জোগাড় করতে না পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, ব্যাগের টাকা না পেয়ে স্কুলশিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, বিনা চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হাহাকার। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নিরাপত্তার অভাব, বেকার সমস্যা, সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতির অবাধ প্রসার জনমনে হতাশার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনাগুলো আজ মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমরা নিশ্চুপ। একদিকে দিনে দিনে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ, কালে টাকা, দখলদারিত্বের সংখ্যা, অন্যদিকে সামাজিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। শিক্ষা তার লক্ষ্যকে হারিয়ে বহিরাবরণের দিকে ছুটছে। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দিনের পর দিন বেপরোয়া হচ্ছে কিশোর গ্যাং। উঠতি তরুণ ও যুবসমাজ সুস্থ্য সংস্কৃতির চর্চার পরিবর্তে অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। দেশের সমৃদ্ধি উন্নয়নকে গতিশীল এবং ত্বরান্বিত করতে আইনের সঠিক প্রয়োগ, স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার বৈষম্য দূর করে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, সেই সঙ্গে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে আধুনিক লাইব্রেরি, বিজ্ঞান ক্লাব এবং একটি করে খেলার মাঠ নির্মাণ করার মধ্যদিয়ে দেশ ও জাতিকে মাদকের ভয়াল থাবা, অনৈতিক, অমানবিক মূল্যবোধের চর্চা থেকে তরুণ ও যুব সমাজকে রক্ষা করে দেশপ্রেমিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
দেশপ্রেম বর্জিত, মানবিক মূল্যবোধহীন শিক্ষার পরিবর্তে নৈতিক, মানবিক এবং দেশপ্রেম সমৃদ্ধ শিক্ষার ব্যাপক আয়োজন এবং প্রসার ঘটাতে হবে। সেই সঙ্গে উচ্চ শিক্ষাকে সবার জন্য মুক্ত করে দিতে হবে। বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন নতুন কর্মপরিকল্পনা প্রয়োগ করতে হবে।