যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। যুদ্ধ মানেই মৃত্যু। যুদ্ধ মানেই দুর্ভিক্ষ। যুদ্ধ মানেই বিপন্ন মানবতা। তবে এই যুদ্ধ মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ হলেও কখনো কখনো অধিকার আদায়ের একমাত্র উপায় হয়ে ওঠে। শোষকের হাত থেকে মুক্তির জন্য অনেক সময় শোষিতের হাতে যুদ্ধ ভিন্ন আর কোনো উপায় থাকে না। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই যুদ্ধ-বিগ্রহ এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। অনেক সভ্যতা যুদ্ধের কারণে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আর যুদ্ধের কারণে যে শুধু মানুষ বা সম্পদের ক্ষতি হয় তা নয়, বরং যুদ্ধ পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।
যুদ্ধ জয়ের জন্য পরিবেশ বিনষ্ট করার প্রচেষ্টা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। প্রাচীন রোমান ও অ্যাসিরীয়দের বিরুদ্ধে শত্রুদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য তাদের আবাদযোগ্য জমিতে লবণ ছিটিয়ে তা চাষের অনুপযোগী করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা জঙ্গলের মধ্যে ও জলাভূমিতে এজেন্ট অরেঞ্জ ব্যবহার করেছিল। (এজেন্ট অরেঞ্জ হলো, এক প্রকার রাসায়নিক উদ্ভিদনাশক পদার্থ) জঙ্গল আর জলাভূমিতে ভিয়েতনামিজ গেরিলারা ওত পেতে থাকত বলে এই ব্যবস্থা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানিরা লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যার পাশাপাশি অসংখ্য ঘরবাড়ি, গাছপালা আর ব্রিজসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় বিশ্ববাসী দেখেছে। আধুনিক যুগে যুদ্ধের ধরন বদলেছে। এসেছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র। আধুনিক এসব রাসায়নিক, জৈবিক ও পারমাণবিক অস্ত্রের মানুষ ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনার নজিরবিহীন ক্ষমতা রয়েছে।
আজ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে একটি স্বাধীন দেশে এমন সামরিক হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক। উদ্বেগের বিষয় হলো, ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনা অভিযান কেবল সামরিক স্থাপনা বা ঘাঁটিতে সীমিত নেই। উপর্যুপরি বোমাবর্ষণে ইউক্রেনের শত শত বেসামরিক মানুষ মারা যাচ্ছে। বহু স্থাপনা-ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে মানুষ আপন ঠিকানা, স্বপ্নের আবাস ভূমি ছেড়ে ভিন দেশে আশ্রয় নিচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন এ যুদ্ধে এরই মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় পণ্যের দাম বাড়ছে হু-হু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গমসহ নানা ভোগ্যপণ্য ও সেবার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
জালানি তেলের মূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। যে কোনো যুদ্ধেই সাধারণ মানুষ আর তাদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পতিত হয়। এমনিতেই করোনা মহামারির কারণে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। মানবতা রয়েছে ঘোর সংকটে। এর ওপর আবার এই যুদ্ধ। এ অবস্থায় আমাদের বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চাপ আরো বাড়বে। সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। অবস্থাটা এমন যে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, যুদ্ধ নয় শান্তি চাই। ইউক্রেনের মানুষ ও সম্পদ সবকিছু রক্ষা পাক। সারা বিশ্বের মানুষ দ্রব্যমূল্যের নিষ্ঠুর কষাঘাত থেকে মুক্তি পাক। বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড়-ছোট সব দেশকে অপর দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে।