ত্রিশালে সরকারি প্রণোদনার সার-বীজ ডিলারের গুদামে

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় কৃষকের জন্য ঘোষিত প্রণোদনার সার-বীজ বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রান্তিক কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি প্রণোদনার সার এবং বীজ প্রকৃত কৃষকের হাতে না গিয়ে সব চলে যাচ্ছে ডিলারের গুদামে। ডিলারের গুদাম থেকে সরকারি সার জব্দ করলেও বাস্তবে তা ছিল লোক দেখানো। 

জানা গেছে, কৃষি অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং অসাধু ডিলারদের সমন্বয়ে নিজেদের লোকজনকে ভুয়া কৃষক সাজিয়ে কার্ড দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিতরণের ২য় দিনে কৃষক সার উত্তোলন করে কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের সামনেই ডিলারদের কাছে বিক্রি করে দিলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি সংশ্লিষ্টদের।

জানা যায়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় ২০২১-২০২২ অর্থবছরে উফশী আউশ উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বিনা মূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণে বরাদ্দ পায় উপজেলা কৃষি অফিস। আউশ মৌসুমের জন্য সরকারিভাবে ৩ হাজার ৬৪০ জন সুবিধাভোগী কৃষককে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য নামের তালিকা করেন স্থানীয় ইউপি মেম্বার, চেয়ারম্যান ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। 

বর্তমান সরকারঘোষিত প্রণোদনা অনুযায়ী একেক জন কৃষক প্রতি বিঘা ধান চাষের জন্য ৫ কেজি উফশী বীজ, দেড় কেজি হাইব্রিড বীজ, ২০ কেজি ডিএপি সার, ১০ কেজি এমওপি সার পাওয়ার কথা রয়েছে। বিতরণের জন্য গত সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম উদ্বোধন করে উপজেলা কৃষি অফিস। প্রণোদনার সার বীজ উত্তোলন করেই কার্ডধারীরা ডিলারের গোডাইনে বিক্রি করে দিয়ে টাকা নিয়ে যায়। উপকারভোগী মনোনীত কৃষকরা সরকারি সার উত্তোলন করে সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গুদামের সামনেই একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উত্তোলনকৃত সার বিক্রি করে দেন। আর এসব সার কিনে নেন একতা ট্রেডার্সের মালিক ডিলার আনিসুজ্জামান। সচেতন মহলের অভিযোগ সঠিকভাবে প্রান্তিক চাষিদের মনোনীত না করায় ঘটছে এমন ঘটনা। যাদের জমি নেই তারা এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। পরে কালোবাজারির মাধ্যমে ডিলারের দোকানে সার চলে যাচ্ছে—এমন ঘটনা জানাজানি হলে ত্রিশাল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া রহমান ত্রিশাল পৌর শহরের ডিলার আনিসুজ্জামানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করেন। ঐ সময় ডিলারের দোকান থেকে ৩০ বস্তা সরকারি সার জব্দ করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি উপজেলা কৃষি অফিস।

স্থানীয় ডিলারদের ভাড়া করা ভ্যানে সারের বস্তা তুলে দিচ্ছে কার্ডধারী কৃষকরা।

বৃহস্পতিবার সার বিতরণের দ্বিতীয় দিনে সরজমিনে দেখা যায়, কার্ডধারী কৃষকরা সার উত্তোলন করে স্থানীয় ডিলারদের ভাড়া করা ভ্যানে মালামাল তুলে দিয়ে ডিলারের দোকান থেকে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে। এ সময় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা দাঁড়িয়ে থাকলেও এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিলার আনিসুজ্জামান বলেন, কৃষি অফিসের সামনে কৃষকদের নিকট থেকে সারগুলো ক্রয় করা হয়েছিল। আমরা টাকা দিয়ে সার ক্রয় করেছি আর এ কাজে কৃষি অফিসের লোকজন জড়িত আছে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অনুসন্ধান করে জানা যায়, স্থানীয় ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান ডিলার ও কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা মিলে প্রকৃত কৃষককে বাদ দিয়ে এসব তালিকা করেছে। প্রকৃতপক্ষে নিজেদের লোকজনের নামে তালিকা করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী অর্ধেক টাকা যাচ্ছে কৃষি অফিসের অসাধু কর্মচারী এবং জনপ্রতিনিধিদের পকেটে। প্রকৃত কৃষকরা প্রণোদনার কার্ড না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করার পাশাপাশি আক্ষেপ করেন।

উপজেলার বৈলর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল বাতেন ২১০ শতাংশ জমি আউশ আবাদ করেন, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আবেদ আলী ৭ কাঠা, আংরার চড় গ্রামের মোহাম্মদ আলী ৮ কাঠা, পৌরসভার দরিরামপুর গ্রামের ফজলুল হক ৮ কাঠা, মেদারপাড়ের জয়নাল আবেদীন ২ একর, দরিরামপুরের জালাল উদ্দিন ১২ কাঠা, আব্দুল আজিজ ৩ একর জমি, দুলাল ১২ কাঠা, পাঁচপাড়া গ্রামের আমানুল্লাহ ১ একর জমি আবাদ করলেও কেউ কোনো কৃষিকার্ড পাননি। উপজেলার ১২ ইউনিয়নের অধিকাংশ প্রকৃত কৃষকরা এই কৃষিকার্ড থেকে বঞ্চিত হয়েছে অসাধু চক্রের কারণে।

একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কখনো এই প্রণোদনা চোখে দেখেননি তারা। বিনা মূল্যে পাওয়া তো দূরের কথা, আমরা ডিলারদের কাছ থেকে চড়া মূল্যে সার বীজ কিনে কৃষি কাজ করে থাকি। কখনো সরকারের প্রণোদনা বা বিনা মূল্যে সার-বীজ চোখে দেখিনি।

ত্রিশাল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া রহমান জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী আমরা কার্ডের মাধ্যমে সার-বীজ বিতরণ করে থাকি। বিতরণের প্রথম দিন সার-বীজ বিক্রির সময় হাতেনাতে আমরা ডিলারের দোকানে কিছু মাল জব্দ করে নিয়ে আসি। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্হা গ্রহণ করা হবে। আমরা কৃষকদের সার-বীজ দিচ্ছি, এখন এগুলো যদি তারা বিক্রি করে দেয় আমাদের কী করার আছে।

ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান বলেন, বিনা মূল্যে সার-বীজ ডিলারের গুদাম থেকে জব্দ করার ঘটনা শুনেছি। উপজেলা কৃষি অফিসের সঙ্গে কথা বলে ডিলারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রকৃত কৃষকরা যদি তালিকা বঞ্চিত হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।