ইউক্রেন যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে রাশিয়ার উত্তেজনা যখন বাড়ছিল, জার্মানি তখন নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। জার্মানির সিদ্ধান্তটি পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল যথেষ্ট অস্বস্তিকর। রাশিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সব দাবি মেনে সীমান্ত থেকে সৈন্য ফিরিয়ে নিতো, তাহলেও সেটি ছিল আটলান্টিকের দুই পাড়ের সম্পর্কে একটি ক্ষত।
ন্যাটোর সংহতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পর ইউক্রেনকে কীভাবে সাহায্য করা হবে তা নিয়ে জার্মানির কোয়ালিশন সরকারে মতৈক্য হচ্ছে না বলে জানা গেছে। ভাইস চ্যান্সেলর রবার্ট হ্যাবেক ১৪ এপ্রিল বলেন, ইউক্রেনে আমাদের দ্রুত ট্যাঙ্ক পাঠানো উচিত। কিয়েভের কাছ থেকে সামরিক সহায়তার আবেদন আসার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ কথা বলেন।
গ্রিন পার্টির সদস্য হ্যাবেকের এই বক্তব্যের সঙ্গে চ্যান্সেলর সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দলের ওলাফ শুলজের দৃষ্টিভঙ্গীর অনেকটা মিল আছে। কিন্তু শুলজ ট্যাঙ্কের মতো ভারী সরঞ্জামাদি পাঠাতে ইচ্ছুক নন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভাইস চ্যান্সেলরের অবস্হান সমর্থন করছেন। কারণ, তিনি গ্রিন পার্টির সদস্য। অন্যদিকে, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নব নিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস্টিন ল্যামব্রেখত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালিনা ব্যারবোকের সঙ্গে একমত নন। তিনি মনে করেন এটি ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করবে। কারণ, ন্যাটো এখনো ট্যাঙ্ক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তিনি অতীতে বিদেশে অস্ত্র রফতানির বিরোধিতা করেছেন।
এর আগে জার্মানি এস্তোনিয়াকেও জার্মান প্রস্ত্তত অস্ত্রশস্ত্র সেদেশে রফতানি করতে বারন করে। এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়া জানায় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রস্ত্তত অ্যান্টি ট্যাঙ্ক ও অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল ইউক্রেনে পাঠাবে। এ খবরও প্রকাশিত হয় যে, অস্ত্র বহনকারী ব্রিটিশ রয়েল এয়ারক্রাফটের ইউক্রেন যেতে নিজের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি জার্মানি। জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য এ খবর অস্বীকার করে। তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এ রকম ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
জার্মানির অনেক মানুষও মনে করে রুশ-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব নিরসনে তাদের সরকার ঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে সমস্যা সমাধান না হলেও উত্তেজনা বাড়বে না। অনেকের মতে এটি এক ধরনের আপসকামী পররাষ্ট্রনীতি। সাধারণ জার্মানদের মধ্যে অনেকে বুদ্ধিবৃদ্ধির চর্চাকে রাজনীতি, প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা চর্চার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। অনেকে মনে করে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানো উচিত। উদারনৈতিক গণতন্ত্র রক্ষার জন্য শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রয়োজন আছে।
উল্লেখ্য, ন্যাটো সদস্যের কাছে আশা করা হয় যে তারা জিডিপির অন্তত ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করবে। জার্মানি এখনো লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চেয়ে পিছিয়ে। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক হামলা চালানোর পর বার্লিন এই খাতে ব্যয় বাড়াতে শুরু করেছে। জার্মানির বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি যতটা না আদর্শভিত্তিক তার চেয়ে বেশি স্বার্থকেন্দ্রিক। রাশিয়া ও জার্মানি এখন নর্ড স্ট্রিম টু নামে একটি গ্যাস প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া জার্মান রাজনীতিতে পুতিনের জন্য একটি সফট কর্নার রয়েছে।
বেরবাক যুদ্ধের আগে মন্তব্য করেন, ইতিহাস থেকে জার্মানরা ভূরাজনৈতিক অপশক্তি ও যুদ্ধবাজ নীতির অপকারিতা সম্পর্কে অবগত আছে। তিনি ২০ শতকের ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সময়কে ইঙ্গিত করেন। তিনি আরও বলেন, ১৯৮৯ সালের পর থেকে তারা বিষয়টি তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে একাত্ম করে নিয়েছে। শীতল যুদ্ধ যুগের পর জার্মানি বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব থেকে দূরে ছিল। অনেক জার্মান মনে করে তারা এতকাল সামরিক শক্তি হওয়ার চেয়ে অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু শীতল যুদ্ধ যুগের লড়াইয়ের মতো পরিস্হিতি আবারো ফিরে এসেছে। যার জন্য তাদের কোনো পূর্ব প্রস্ত্ততি ছিল না। তবে জার্মানির বেশির ভাগ মানুষ যুদ্ধের বিপক্ষে। নীতিনির্ধারক মহল থেকে নিয়ে সাধারণ জনতা মনে করে প্রতিযোগিতা নয় অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিবাদের মূলে আছে ভুল বোঝাবুঝি। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্হাগুলো এক্ষেত্রে মধ্যস্হতার ভূমিকা পালন করতে পারে।
এ বিষয়ে ভিন্নমতও আছে। অনেকে মনে করে আগ্রাসী শক্তিকে তুষ্ট করে চলতে হবে, এটি ইতিহাসের শিক্ষা নয়। জার্মানির এই শান্তিবাদী নীতিতে অনেক মিত্র হতাশ। তবে অভ্যন্তরীণ নীতি যাই হোক জার্মানি যে প্রয়োজনের সময় ন্যাটোজোট ও ইউরোপীয় মিত্রদের পাশে থাকবে তাতে সন্দেহ করার কারণ নেই। ন্যাটোর সম্প্রসারণ নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগ যে জার্মানি আমলে নিতে রাজি নয় সেটি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন।