হাওরপারের কৃষকদের সংকট ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। কৃষকের নিয়ামক হলো কৃষি। ফসল কৃষকের সন্তানের মতো। কৃষক ফসল রোপণ করে তার মাথায় হাত বোলায়। ঐ কৃষিজমিতে অন্য কারো দৃষ্টি পড়লে সে প্রাণ দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। সেই কৃষক যখন তাকিয়ে দেখে রাষ্ট্রীয় খামখেয়ালিপনা ও অবহেলার কারণে তার স্বপ্নের ফসল ডুবে যায়, তার এই শোক সন্তান হারানোর শোকের মতো শেল হয়ে আঘাত হানে তার বুকে। হাওরপারের বাতাস এখন কৃষকের আহাজারিতে ভারী হচ্ছে। পাহাড়ি ঢলে ভাঙছে একর পর এক বাঁধ। ডুবছে একের পর এক হাওর। বাংলাদেশের দুটি পীড়িত অঞ্চলের মধ্যে হাওর আর উত্তরবঙ্গ কী এক অভিশাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাওরে বাঁধ ভেঙে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে সারা বছর ঋণ-কর্জ করে কৃষক বাঁচে।
এই সংকট নিরসনে কোনো সরকারই আজ অবধি ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সংকটের সময় আহা-উহু বললেও বছরের পর বছর ধরে এটি কীভাবে টিকে থাকে? এই দুই এলাকা কী দেশের বাইরে? লক্ষ লক্ষ মানুষের রুটিরুজির সংস্থান শেষ হয়ে যাচ্ছে অথচ এ নিয়ে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই।
দেশের সিলেট ও ময়মনসিংহের নেত্রকোনা এবং কিশোরগঞ্জে প্রচুর হাওর-বাঁওড় রয়েছে। এসব অঞ্চলে গেলে চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ হাওর। একেক মৌসুমে হাওর একেক রূপ ধারণ করে। শীতে এসব হাওর-বাঁওড়ে পাখির মেলা বসে। আবার গ্রীষ্মে ফলে মৌসুমি ধান। আবার বর্ষা-শীতে মাছের মৌসুমে মাছ ধরে বাঁচে জেলেরা।
তার মানে হলো, হাওরে ধানের মৌসুমে যেমন ধান ফলে, আবার বর্ষা, শীতে মাছের নৌকাও ভারী হয় জেলের। হাওর পারের কৃষকদের বোরো ধানচাষ সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের খাওয়ার জোগান দেয়, যদি ধান সময়মতো ঘরে তুলতে পারে। হাওর অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। এ অঞ্চলে কৃষকের তিন বেলা খাওয়ার জন্য হাওরের বিকল্প নেই। এই হাওর-অধু্যষিত এলাকা এতটাই কৃষিনির্ভর যে, এ অঞ্চলে এক সময় বড় বড় কৃষক-আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। হবিগঞ্জে ব্রিটিশের সময়ে ভানু বিল কৃষক আন্দোলন ছিল মণিপুরি সম্প্রদায়ের বিশাল আন্দোলন।
সিলেট অঞ্চলের নানকার বিদ্রোহ ও ভাসান পানি আন্দোলন মাইলফলক দুটি গণসংগ্রাম। নানকার বিদ্রোহ সিলেট অঞ্চলের একটি কৃষক-আন্দোলন, ১৯৪৯ সালে সংঘটিত হয়েছিল। জমিদারি আমলের এই প্রথাকে ‘নানকার প্রথা’ বলা হতো। বিংশ শতাব্দীর ২০-এর দশকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ১৯৫০ সালে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল কমরেড অজয় ভট্টাচার্য। আশির দশকে হাওরাঞ্চলে গড়ে ওঠে ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার আন্দোলন।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ভাসান পানির অধিকারের দাবিতে সংগঠিত এই গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন কমরেড বরুন রায়। বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসের তিনটি বড় আন্দোলনই হাওর-বাঁওড়-বিলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। সুতরাং সহজেই অনুমেয় যে, বড় একটি জনগোষ্ঠীর মানুষের দাবিদাওয়া ছাড়া এতবড় বড় বিদ্রোহ সংঘটিত হয়নি। আজকে কৃষির ব্যাপ্তি কমেছে। কৃষকের সংখ্যা কমেছে। কৃষকনির্ভর রাজনীতিও টিকে আছে কোনোমতে। তাই হাওর অঞ্চলে যে সংকট চলছে তা নিয়ে কথা বলার কোনো লোক নেই।
হাওর অঞ্চলের মানুষ হাওরের মাছ ও ধানের ওপর নির্ভরশীল। অজস্র কৃষক স্বপ্ন নিয়ে হাওরে ধান বোনে। ধানের ভালো ফলন হওয়া নিয়ে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু প্রতি বার দেখা যায় একই চিত্র, ধান কাটার মৌসুম যখন আসে তখন পার্শ্ববর্তী দেশের পাহাড়গুলো থেকে ঢল নামে। সেই ঢলে উতলে উঠে হাওরসংলগ্ন সব নদী। মুহূর্তের ভেতরে ডুবে যায় কৃষকের স্বপ্ন। হাওরের কৃষকরা শুধু ধান বোনে না, বোনে স্বপ্নও। এই ধান গোলায় উঠলে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেবে, আত্মীয়স্বজন আসবে, গরম ভাতের ধোঁয়ায় মুখরিত হবে হাওর অঞ্চল।
কিন্তু প্রতি বছর সবার বাড়া ভাতে ছাই দিতে যেন প্রস্তুত একটি গোষ্ঠী। প্রতি বার ধানের ফলন দেখে কৃষক যখন স্বপ্ন দেখে তখনই তার হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে ধানের হাওর ডুবে যায়। এমনি বিধান বহু আগে থেকে হাওর রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প আসে। প্রকল্পের টাকা কোথায় যায়, কেউ জানে না। এ ব্যাপারে সরকারের আইন বিভাগ জেগে ঘুমায়। ফলে বছরের পর বছর একই অনিয়ম তাড়িয়ে বেড়ায় হাওর এলাকা। যার কারণে হাওর এলাকার কৃষক বিপন্ন জীবন যাপন করে। কারণ ধান বুনতে ঋণ আনতে হয়। আর ধান যখন ঢলে ডুবে যায়, তখন অনাহার আর এনজিওর কিস্তি গুনতে গুনতে জীবন ঝিমিয়ে আসে। এসব খবরই রাষ্ট্র জানে।
কিন্তু কৃষকের ক্ষতি হলে রাষ্ট্রের কিছুই যায়-আসে না। পরিস্হিতি দাঁড়িয়েছে এমন, এখন রাজনীতিকরা ব্যবসা করে আর ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করে। ফলে কৃষকের পক্ষে কোনো আন্দোলন নেই। কৃষকের কোনো প্রতিনিধি সংসদে কথা বলে না। আমাদের দেশ একসময় কৃষিপ্রধান দেশ ছিল। কৃষকরাই এখানের মূল শক্তি ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে সেদিন আর নেই। এখন চাল আমদানি করা হয় অথচ ঠিকমতো চাষাবাদ করলে কৃষকের ঋণের ব্যবস্থা রাখলে, খাদ্য রপ্তানি করা যায়।
সম্প্রতি হাওর অঞ্চলে এলাকাগুলো উজানের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরের ফসল রক্ষাবাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেল হাজার হাজার হেক্টর জমির আধাপাকা বোরো ধান। তার পরও কৃষক হাওরে তলিয়ে যাওয়া আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছে। কোনোমতে যদি শেষ রক্ষা হয়। নতুবা সে কী খেয়ে বাঁচবে? কৃষকের স্বপ্ন এখন জলের নিচে। দাদন এনে জমি চাষ করে এখন নিঃস্ব কৃষক। সারা বছর থাকবে অভাব।
পুরো হাওর জুড়ে আতঙ্ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ধনু নদের পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় গত সোমবার কিশোরগঞ্জের ফসলের জমি নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। মেঘনা, ঘোরাউত্রা, বাউলাই ও কালনী নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধলেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জের প্রায় সব হাওরের ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে। নেত্রকোনায় হাওর অঞ্চলে ফের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাতে তাহিরপুর উপজেলার নজরখালী বাঁধ ভেঙে টাংগুয়ার হাওরে পানি প্রবেশ করে ফসলের ক্ষতি হয়েছে ব্যাপকভাবে। এরপর একে একে আরো ১০-১১টি বাঁধ ভেঙে কৃষকের চোখের সামনে ডুবে গেছে হাওরের সোনালি ফসল। ফসলডুবির পর যে বাঁধগুলো আশা জাগিয়ে রেখেছে সেগুলোতেও ফাটল ও ধসে পড়ায় হাওরপারের কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। চাষিরা যেনতেন প্রকারে ফসল কেটে ঘরে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ধান কাটার মৌসুমি কৃষি শ্রমিকরা।
সরকারের সব সংস্থাগুলো এখন মাইকিং করে বাঁধ রক্ষা করতে চাইছে। মাইকিংয়ে ঢল থামে? সারা বছর খেয়াল না করলে এমনই হওয়ার কথা। হাওর রক্ষা বাঁধ দ্রুত সংস্কারের কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সরকার বলেছে— হাওরের ওপর দিয়ে ১২ কিলোমিটির উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হবে। তাতে বন্যা কমবে?
হাওরের ওপর দিয়ে ১২ কিলোমিটার কেন, ১২০০ কিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মাণ করলেও কাজ হবে না। বরং কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে এটা হবে উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর মতো। ‘হাওর রক্ষা বাঁধ’ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করতে না পারলে কৃষকের এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়। শুকনো মৌসুমে এ এলাকার বাঁধ শক্তভাবে নির্মাণ করা সরকারের পক্ষে কঠিন কাজ নয়। চোখের সামনে যেসব কৃষকের সর্বনাশ হলো আর আমরা সবাই মিলে দেখলাম, তাতে একবার কি বোধগম্য হয় না এদের ঈদ বা পরবর্তী সময় কীভাকে কাটবে? এসব ক্ষতিগ্রস্তকে কি প্রণোদনা দেওয়া যায় না? সরকার এটা করলে কৃষকের গতি থাকবে নতুবা কৃষকের ভবিষ্যত্ কষ্টে ভরে থাকবে। বাঁচবে হয়তো, কিন্তু একে বাঁচা বলে না। কৃষক রাজনীতি জোরালো অবস্থায় থাকলে, একজন অজয় ভট্টাচার্য, একজন বরুণ রায় বেঁচে থাকলে সরকার টের পেত। কিন্তু সে রাম নেই সে অযোধ্যাও নেই। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা মুখে কলুপ এঁটে আছেন। কে কথা বলবেন?
মধ্যবিত্ত সমাজ সামাজিক মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে সবাই ঘরে বসে বায়স্কোপ দেখবে, এই তো বাস্তবতা। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পলিসি ঠিক, নাকি আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন? এ বিতর্ক চায়ের দোকানে যখন চলে তখন শনির হাওরের পাড়ে দাঁড়িয়ে একজন সবুর মিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে আহাজারি করে বুক চাপড়ায় আর বলে, আল্লাহ রে সারা বছর কী খাওয়াইতা?
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক