মহাবিপদ কড়া নাড়িবে সকলের দরজায়

একজন মানুষ সমগ্র পৃথিবীর জন্য আতঙ্কের কারণ হইয়া উঠিয়াছে। তিনি কি স্বাভাবিক? আমরা একটি ঘটনার উদাহরণ টানিতে পারি। পশ্চিমা বিশ্বের একটি দেশে তিন বত্সরের একটি শিশু তাহার মায়ের হাত ধরিয়া হাঁটিতেছিল। মায়ের ভ্যানিটি ব্যাগে ছিল একটি রিভলবার। শিশুটি সেই রিভলবার বাহির করিয়া কিছু না বুঝিয়া মায়ের দিকে তাক করিয়া গুলি করে। মা যথারীতি মারা যান। পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগ লইয়া যাহারা হুংকার দেয়, তাহারা ঐ শিশুর মতো। আর শিশুটির মা হইল এই পৃথিবী। পরমাণু অস্ত্র কেবল আত্মরক্ষার জন্য, প্রয়োগের জন্য নহে। কেবল ব্যাপক হারে মানবমৃত্যুই নহে, উহার তেজস্ক্রিয়তার অভিঘাত যুগের পর যুগ থাকিয়া যায়। অযোগ্য হইয়া পড়ে সেই অঞ্চল। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, একটি ছোট্ট শিশুর হাতে দিয়াশলাই দেওয়াটা যেমন বিপজ্জনক, না বুঝিয়া যে কোনো জায়গায় আগুন ধরাইয়া দিতে পারে—তেমনি পৃথিবীর কোনো কোনো ক্ষমতাধর মানুষের হাতে ভয়াবহ পরমাণু অস্ত্রের সুইচবাটন থাকাটাও অত্যন্ত বিপজ্জনক।

পৃথিবীর যেই সকল জায়গায় এখন যুদ্ধের অস্হিরতা চলিতেছে, যুদ্ধ এবং উহার অভিঘাত কেবল সেইখানে আটকাইয়া নাই। আমরা দেখিতে পারিতেছি, সমগ্র বিশ্ব কী রকম অস্হির উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে। কেন এইরকম যুদ্ধ হইবে? কেন মারা পড়িবে বেসামরিক মানুষ ও নারী-শিশুরা? কী তাহাদের অপরাধ? কোনো এক বাঙালি কবি বলিয়া গিয়াছিলেন—এই পৃথিবী দানবের তরে নহে, মানবের তরে; কিন্তু সেই কবি যেন বোকার স্বর্গে বসবাস করেন! এই বিশ্ব তো দানবের দখলেই চলিয়া যাইতেছে। পশ্চিম ইউক্রেনের একটি শহর লিভ। সেই শহরে কান পাতিলেই শোনা যায় বোমারু বিমান উড়িয়া যাইবার শব্দ। ক্ষণে ক্ষণে বাজিয়া উঠে সতর্কতামূলক সাইরেন। গত দুই মাস ধরিয়া এই শহরের শিশুদের সহ্য করিতে হইতেছে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা, মৃত্যুর হাহাকার। নির্মমভাবে নষ্ট হইতেছে তাহাদের শৈশব! শিশুরা আশ্রয় লইয়াছে একটি গুদামঘরে। তাহার পর সেই গুদামঘরেই গত বুধবার শিশুরা মঞ্চনাটক পরিবেশন করিল। নাটকের বিষয়বস্ত্ত হইল—‘পরিবার হইতে বিচ্ছেদ’। মঞ্চনাটকের একটি গান ছিল এইরকম—‘যুদ্ধ খুব ভয়ের; কিন্তু গানটা গাইলে মনে জোর পাই।’ কী ভয়ংকর ব্যাপার, সেইখানে যুদ্ধ ছড়াইয়া পড়িতেছে সীমান্ত এলাকাগুলির দিকেও। তাহাতে যুদ্ধ কেবল ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকিতে পারে বলিয়া মনে করিতেছেন অনেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও মনে করিতেছে, যেইভাবে যুদ্ধ চলিতেছে তাহাতে প্রতিবেশী দেশগুলিতে দ্রুত তাহা ছড়াইয়া পড়িতে পারে। মনে রাখিতে হইবে, যেই আদর্শ ধারণ করিয়া পৃথিবীর কমিউনিস্ট দেশগুলি বিপ্লব ঘটাইতে চাহিয়াছিল এবং ছড়াইয়া দিতে চাহিয়াছিল পৃথিবীর নানান প্রান্তে—সেই আদর্শ ও উদ্দেশ্য এখন ব্যর্থতার পরিহাসে পরিণত হইয়াছে। এই সত্য স্বীকার করিতেই হইবে। এই বাস্তবতা মানিয়া লইতেই হইবে।

সেই ১৯২০ সালেই বলা হইয়াছিল—‘অতি-বামপম্হা একটি শিশুসুলভ বিকার।’ পরশুরামের গল্পের মতো বর্তমান যুদ্ধবাজ ভূতদের অনেক মিল রহিয়াছে। সেইখানে যুদ্ধবাজ ভূত ভাঁটার মতো চোখ লইয়া হুংকার দিতেছে—উচিত শিক্ষা দিতে হইবে। আর তাহাতে বাকি ভূতেরা তুমুল করতালি দিতেছে। ১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার ‘পথ ও পাথেয়’ নামের একটি প্রবন্ধে লিখিয়াছিলেন—আমি যাহা করিব সকলকেই তাহা করিতেই হইবে, আমি যাহা বলিব, সকলকে তাহা বলিতেই হইবে এইরূপ বলপ্রয়োগে দেশের সমস্ত মত, ইচ্ছা ও আচরণ-বৈচিত্র্যের অপঘাতমৃত্যু তুল্য।’ সুতরাং যিনি নিজেকে যতই দূরদর্শী বলিয়া মনে করুন না কেন, ইহা স্বীকার করিতেই হইবে যে, ঘটনা যে এতদূর আসিয়া পৌঁছাইতে পারে তাহা পৃথিবীর অধিকাংশ লোক কল্পনা করিতে পারিতেছে না। বড় ঘটনা ঘটিবার পর এই কথা বলা সহজ হয় যে, ঘটনার সম্ভাবনা ছিল বলিয়াই ঘটিয়াছে; কিন্তু আমাদের পৃথিবী তো একটাই। তাহাকে তো রক্ষা করিতেই হইবে। না হইলে মহাবিপদ কড়া নাড়িবে সকলের দরজায়।