দীর্ঘ ১৬ বছর পার হলেও স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত স্বামী ও আরেক আসামি এখনো গ্রেফতার হয়নি। উচ্চ আদালত থেকে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও পুলিশ বলছে তাদের খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ ভিকটিমদের পক্ষের আইনজীবী বলছেন, ট্রিপল মার্ডারের আসামিরা বছরের পর বছর এলাকায় ঘুরে বেড়ালেও রহস্যজনক কারণে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করা হয়নি।
পলাতক দুই আসামি হলেন, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুনবতী ইউনিয়নের রাজবল্লভপুর গ্রামের আব্দুল করিম ও তার ভাই আবু বক্কর। ২০০২ সালের ২০ নভেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের রাজবল্লভপুর গ্রামে চাঞ্চল্যকর মা ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, রাজবল্লভপুর গ্রামের আব্দুল করিম খুলনার শামীমা ইয়াসমিন শাহানাকে নিজের পছন্দ মতো বিয়ে করেন। এই বিয়ে করিমের পরিবার মেনে নেয়নি। তাদের সংসারে নাসরিন সুলতানা শিরীন (১২) ও ছেলে শাহরিয়ার শাকিব (৫) নামে দুই সন্তান জন্ম নেয়ার পর তার মা-বাবা ও ভাইয়েরা পারিবারিকভাবে মেনে নেয়নি। পারিবারিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করে ২০০২ সালের ২০ নভেম্বর। ঐ দিন করিমের ভাই আবু বকর, আব্দুস শুকুর, মাহবুবুল হক, তার মা তনজেবের নেসা ও চাচাতো ভাই আব্দুল খালেকের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের জের ধরে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে তারা করিমের স্ত্রী শাহানাকে আটক করে মারধর করতে থাকে। তখন করিম তার দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিছু সময় পর তার স্ত্রীর চিত্কার শুনতে পেয়ে দরজা খোলেন। বাসার উঠানে শাহানাকে রক্তাক্ত অবস্হায় পড়ে থাকতে দেখেন। স্ত্রীর মৃত্যু দেখে তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কিছু সময় পর আব্দুল করিম লাঠি নিয়ে উপস্হিত তার নিকটাত্মীয়দের ওপর হামলা চালাতে উদ্যত হন। একপর্যায়ে করিমের লাঠির আঘাতে তার মেয়ে নাসরিন সুলতানা শিরীন (১২) ও ছেলে শাহরিয়ার শাকিব (৫) ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।
পরে পুলিশ তিন জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্েতর জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। পুলিশ আব্দুল করিমকে গ্রেফতার করে। ঘটনা দিন চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই দিলীপ কুমার বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এই মামলাটি চার বছর ধরে বিচারকার্য চলার পর ২০০৬ সালে কুমিল্লার দ্রুত বিচার ট্র্যাইবুন্যালের বিচারক আসামী আব্দুল করিমকে মৃতু্যদণ্ড এবং আবু বকর ও আব্দুস শুকুরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। অপর দুই আসামি আব্দুল খালেক ও মাহাবুবুল হককে খালাস দেয় আদালত। ২০১১ সালের ৭ জুন আসামিপক্ষ হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলে মৃতু্যদণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল করিমের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। আব্দুস শুকুর পলাতক থাকায় তার সাজা যাবজ্জীবন বহাল রাখা হয় ও আবু বকরকে খালাস দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিলে খালাসপ্রাপ্ত আবু বক্করের খালাসের রায়ও বাতিল করে এক মাসের মধ্যে তাদের চট্টগ্রাম দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে আত্মসমর্পণের নির্দেশ প্রদান করেন। আসামিরা বিগত আট বছরেও আত্মসমর্পণ না করায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে তাদেরকে অবিলম্বে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয় চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশকে। আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার স্মারক নম্বর-২৭৭, তারিখ: ২৭/১১/২০১৪ ইং, জিআর-২৭১/০২ ইং, দ্রুত বিচার কেস নং-২৬/০৫। দীর্ঘ তিন বছর ধরে চৌদ্দগ্রাম থানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা পড়ে থাকে। পুলিশ সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের বিষয়ে কোনো খোঁজখবর রাখেনি বলে নিহতদের পক্ষের আইনজীবী অভিযোগ করেন। পরে পুলিশ ২০১৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গ্রেফতারি পরোয়ানা আদালতে ফেরত পাঠায়।
এ ব্যাপারে ভিকটিমদের আইনজীবী আবিদ হোসেন বলেন, নির্মম হত্যাকাণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা আদালতের রায়কে অবমাননা করে ১৬ বছর ধরে এলাকায় বসবাস করছে। আসামিরা পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একাধিকবার থানা পুলিশকে জানালেও তারা অদৃশ্য কারণে উদাসীনতা দেখাচ্ছে।