ইয়াবাসহ মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার। তাদের আইনের আওতায় আনতে সরকারের উচ্চ মহল থেকে প্রশাসনের সব পর্যায়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সে অনুযায়ী ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, কাস্টমস, দুদক। ইয়াবা ব্যবসা করে যারা রাতারাতি দিনমজুর থেকে কোটিপতি বনে গেছেন তারা এখন ঘরদোর ফেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান ও ক্রসফায়ারের ঘটনায় এখন গা-ঢাকা দিয়েছে ইয়াবা ডনরা। অনেকে তাদের সম্পদ বাঁচাতে আত্মসমর্পণ করেছে। তবে তাদের কোনো সম্পদই রক্ষা পাচ্ছে না প্রশাসনের হাত থেকে। আদালতের নির্দেশে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বাড়িঘর সম্পদ ক্রোক (জব্দ) করা শুরু করেছে পুলিশ। অপর দিকে মাদক কারবারীদের গ্রেফতারে দেশের প্রতিটি থানায় পুলিশ সদর দফতর থেকে বিশেষ অভিযানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুদক প্রায় ৩০০ কারবারীর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে। প্রশাসনের সব পর্যায় থেকে মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ইয়াবাসহ সকল মাদক কারবারীরা।
পুলিশ সূত্র বলছে, আদালতের নির্দেশে টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বাড়িঘর সম্পদ ক্রোক (জব্দ) করা শুরু করেছে পুলিশ। গত শনিবার টেকনাফের নাজিরপাড়ার এজাহার মিয়া এবং তার দুই ছেলে নুরুল হক ভুট্টো (৩২) ও নূর মোহাম্মদ ওরফে মংগ্রীর (৩৫) দুটি বাড়ি, জমি ও ভেতরকার মালামাল ক্রোক করা হয়েছে। ক্রোককৃত সম্পদের দাম ৪০ কোটি টাকার বেশি হবে। এখন থেকে এই সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে পুলিশ। পুলিশ সদর দফতের একটি সূত্র জানিয়েছে, টেকনাফের আরো ৭০ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বাড়িঘর সম্পদ ক্রোক করার সুপারিশ করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশ পেলে দ্রুতই প্রাসাদগুলো ক্রোক করা হবে। সেইসঙ্গে অবৈধ অন্যান্য সম্পত্তিও ক্রোক করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের ওই সূত্রটি আরো জানিয়েছে, শুধু টেকনাফের কারবারীদেরই সম্পদ ক্রোক করা হচ্ছে না। তালিকা ধরে দেশের সকল মাদক ব্যবসায়ীর সম্পদ ক্রোক করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দফরতরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে সুপারিশ পাঠাবে পুলিশ। এছাড়া তাদের গ্রেফতার করতে থানাগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র মতে গত এক বছরে সারা দেশে শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে মারা গেছে। গত বৃহস্পতিবার ইয়াবা গডফাদার সাইফুল ইসলাম ওরফে হাজী সাইফুল করিম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর মাদক কারবারীদের আতঙ্ক আরো বেড়েছে। এদিকে সীমান্তগুলোতে আরো নজরদারী বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত শনিবার ১ জুন রাতে বিজিবির একটি বিশেষ টহল দল নাফনদীতে মাদক কারবারীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। গোলাগুলিতে মাদক পাচারকারীরা পালিয়ে গেলে তাদের পরিত্যক্ত নৌকাটি তল্লাশি করে বড় বড় বস্তায় রাখা ৯ লাখ ৬২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি।
৭৪ মাদক কারবারীর সম্পদের খোঁজে দুদক
দুদক সূত্র জানিয়েছে, গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত টেকনাফের ১০২ জন ইয়াবা কারবারীর মধ্যে ৭৪ জনের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ৭৪ জনসহ মোট ৩শ মাদক কারবারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামল দুদক। এ বিষয়ে দুদকের উপ-পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য ইত্তেফাককে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা, ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছ থেকে নেওয়া তালিকাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত মাদক কারবারীদের একটি তালিকা করেছে দুদক। ওই তালিকার প্রায় সোয়া ২শ জনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান করা শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার আরো ৭৪ জনের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তিনি আরো বলেন, এই ৭৪ জনের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় থাকা ২৬ জনের নাম রয়েছে। তিনি আরো বলেন, এই ৭৪ জনের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় ও সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ ও ২। একইসঙ্গে তাদের বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাবে দুদক।
গতকাল সোমবার দুদক যে ৭৪ জন মাদক কারবারীর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা হলেন—সাবরাং ইউনিয়নের মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে দানু মেম্বার, শাহপরীর দ্বীপের রেজাউল করিম মেম্বার, সামশু মেম্বার, আলী আহমদ, হোসেন আহমদ, শওকত আলম, রাসেল, মুণ্ডার ডেইলয়ের মনজুর, আলীর ডেইলের জাফর আহমদ, আবদুল হামিদ, শামীম, দক্ষিণ নয়াপাড়ার নূর মোহাম্মদ, আলমগীর ফয়সাল, ডেইল পাড়ার মো. সাকের মিয়া, নয়াপাড়ার মো. তৈয়ব, দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার ইমাম হোসেন, বড় হাবিব পাড়ার ছিদ্দিক, ধুরী পাড়ার বাসিন্দা ও বদির খালাতো ভাই মংমং ছেং ওরফে মমচি ও দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার জুবাইর হোসেন, ডেইল পাড়ার আবদুল আমিন, নাজির পাড়ার এনামুল হক মেম্বার, ভুট্টোর ভাগিনা আফসার, আবদুর রহমান, মো. রফিক, মো. হেলাল, জামাল হোসেন, মৌলভীপাড়ার মো. আলী, উত্তর লম্বরীর আবদুল করিম ওরফে করিম মাঝি, সদর কচুবনিয়ার বদিউর রহমান, রাজার ছড়ার আবদুল কুদ্দুস, জাহালিয়া পাড়ার মো. সিরাজ, নতুন পল্লানপাড়ার মো. সেলিম, নাইট্যং পাড়ার মো. রহিম উল্লাহ, চৌধুরী পাড়ার মোহাম্মদ আলম, তুলাতলীর নুরুল বশর, হাতিয়ার ঘোনার দিল মোহাম্মদ, মোহাম্মদ হাছন, রাজার ছড়ার হোসেন আলী, উত্তর জালিয়াপাড়ার নুরুল বশর মিজি, আবদুল গনি, জালিয়াপাড়ার মো. হাশেম, পুরান পল্লানপাড়ার ইসমাইল, নাইট্যংপাড়ার আইয়ুব, নুর হাবিব, মাঠপাড়ার কামাল, শিলবনিয়াপাড়ার আইয়ুব, জালিয়াপাড়ার আলম, নুরুল আলম, বাহারছড়া ইউনিয়নের জাহাজ পুরার নুরুল আলম, শামলাপুর জুমপাড়ার শফি উল্লাহ, ছৈয়দ আলম, উত্তর শীলখালীর মো. আবু ছৈয়দ, হ্নীলা ইউনিয়নের হ্নীলা পশ্চিম লেদার নুরুল হুদা মেম্বার, আলী খালীর জামাল মেম্বার, শাহ আজম, রশিদ আহমদ, পশ্চিম লেদার নুরুল কবীর, পূর্ব লেদার জাহাঙ্গীর আলম, জাদিমোরার মোহাম্মদ হাসান আবদুল্লাহ, লেদার ফরিদ আলম, মো. হোছন, জহুর আলম, আবু তাহের, বোরহান, হামিদ, রবিউল আলম, আলীখালীর হারুন, হ্নীলা পশ্চিম সিকদার পাড়ার মাহাবুব, পূর্ব পানখালীর নজরুল ইসলাম, পশ্চিম পানখালীর নুরুল আবছার, ফুলের ডেইলের রুস্তম আলী, আলী নেওয়াজ, আবু তৈয়ব ও রমজান ও কক্সবাজারের শাহজাহান আনসারী।