‘নজরুলের গান সবসময় আধুনিক ও সমকালীন’

ড. লীনা তাপসী খান। নজরুলসংগীত চর্চা, শিক্ষকতা, নিজের সাংগঠনিক চর্চায় নিরন্তর কাজ করছেন। দুই প্রজন্মের কাছেই নিজের এই সংগীতচর্চাকে সময়োপযোগী করে উপস্থাপন করেন তিনি। সম্প্রতি নিজের এই সাধনায় সম্মাননা প্রাপ্ত হয়েছেন। গুণী এই মানুষটি কথা বললেন এ সময়ের সংগীত, নিজের কাজ ও পরিকল্পনা নিয়ে।

অভিনন্দন। ক্যারিয়ারে আরও একটি সম্মাননা অর্জন করলেন। সম্মাননাটি প্রসঙ্গে জানতে চাই—
গত ১৩ মে আন্তর্জাতিক নারী সংগঠন ইনার হুইল ক্লাব অব দিলখুশা আমাকে শিক্ষা, সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননাটি প্রদান করেছে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে তারা এই সম্মাননাটি দিয়ে আসছে। সবচেয়ে গর্বের বিষয় এই সংগঠনটি নারীদের দ্বারা পরিচালিত। তারা নিভৃতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের সহযোগিতা এবং সম্মানিত করে যাচ্ছে। এমন একটি সংগঠনের কাছ থেকে সম্মাননা পাওয়া সত্যি অনেক ভালোলাগার।
নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে কোন কাজগুলো নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
কবির জন্মজয়ন্তীতে তার কবর জিয়ারত করার পর সেখানে একটি ভক্তিমূলক গানের আসর পরিচালনা করব। পাশাপাশি বিটিভিসহ বেশ কয়েকটি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছি। কিছু পত্র-পত্রিকায়ও প্রবন্ধ লিখছি। এছাড়া বাংলা একাডেমির নজরুল জন্মজয়ন্তীর আয়োজনে আমি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করব। 

নজরুল সংগীতের তাত্ত্বিক বিষয়টি চর্চায় বরাবরই অনিহা দেখা যায়। এ নিয়ে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ও শিক্ষক হিসেবে কী মন্তব্য করবেন?
দেখুন, গানটিকে কীভাবে উপস্থাপন করলে শ্রোতাদের অন্তরে পৌঁছাবে সেটাই একজন শিল্পীর সাধনা থাকে। আমরা শিল্পীরা গান করি ঠিকই কিন্তু গানের ওপারেও অনেককিছু থাকে। যিনি গানটি রচনা করেন তার চেতনা বা গানটির প্রেক্ষাপট পর্যন্ত আমরা যেতে পারি না। তাছাড়া নজরুলকে নিয়ে যেভাবে সাহিত্যে চর্চা করা হয় সেভাবে তার গানের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো চর্চিত হয় না। কারণ গান গেয়ে দ্রুত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, কিন্তু তাত্ত্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে আমি দীর্ঘদিন এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি। আমার মনে হয় সবারই এই বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত।

আপনার সংগীত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাংলা সংগীত কেন্দ্র থেকে বর্তমানে কোন কার্যক্রমগুলো পরিচালিত হচ্ছে?
বিগত চার বছর ধরে আমরা এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে নিয়মিত আন্তর্জাতিকমানের জার্নাল প্রকাশ করছি। সংগীতবিষয়ক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ দিয়ে ‘সংগীত শেকড়’ শিরোনামের এই জার্নালটি সাজানো হয়। বাইরের গুণীজনরাও এতে লিখছেন। আশা করছি শিগগিরই বিশ্বের আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা এতে যুক্ত করতে পারব। এছাড়া যে গানগুলো সেভাবে প্রচার হয়নি সে রকম কিছু গান এরইমধ্যে রেকর্ড করে অবমুক্ত করেছি। পাশাপাশি ৬টি গানের ইনস্ট্রুমেল্টাল করে আমাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করেছি।

ইনস্ট্রুমেন্টালের চর্চা এদেশে সেভাবে দেখা যায়। সেই জায়গায় এমন পরিকল্পনার কারণ কী?
দেখুন, আমাদের স্টেশন বা শপিংমলগুলোতে কিছু কিছু মিউজিক বাজানো হলেও নজরুলের কোনো গানের মিউজিক বাজানো হয় না। তাই আমি চাই, দেশের বাস, ট্রেন, স্টেশন বা শপিংমলে শুধু মিউজিক হিসেবে নজরুলের গানগুলো বাজানো হোক। সেই লক্ষ্যে ৬টি গানের ইনস্ট্রুমেন্টাল করা। সামনে শুধু পিয়ানোতে কিছু নজরুলের গান করার ইচ্ছে আছে।

কোক স্টুডিও থেকে শুরু করে অনেক প্লাটফর্মে নজরুলের গান ফিউশন করে গাওয়া হচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
এই চর্চাকে আমি ভালোভাবেই দেখছি। কারণ যে জিনিসের শেকড় শক্ত সেই জিনিসটি নড়ে না। আমি মনে করি, নজরুলের গান সবসময় আধুনিক ও সমকালীন। মৌলিকভাবে গাওয়ার জন্য তো অনেকেই রয়েছে। সেই জায়গায় সুর ঠিক রেখে নতুন প্রজন্ম যদি ভিন্নভাবে গায় তাতে দোষের কিছু নেই। তবে যদি শুধু নাচানাচি করে বিকৃত করে গাইলে সেখানে আপত্তি করতাম। 

তবে আপনাদের মতো গুণী শিল্পীরা এই প্লাটফর্মগুলোতে গাইলে নজরুল সংগীতের মান ধরে রাখা সম্ভব হতো না?
চ্যানেলগুলো যদি মনে করে কোনো গান আমরা গাইলে ভালো হবে তাহলে তারা ডাকবে। এক-দুইটা চ্যানেল হয়তো তাদের নিয়ে কাজ করছে, বাকি চ্যানেলগুলো তো আমাদের সাথেই আছে।

বিশেষ দিবস ছাড়া নজরুল সংগীতের অনুষ্ঠান বা চর্চা খুব হচ্ছে না?

হ্যাঁ, চর্চার জায়গা তো কমে যাচ্ছেই। বিটিভি এবং বাংলাদেশ বেতার সমম্বয় করেই অনুষ্ঠান প্রচার করে। বেসরকারি চ্যানেলগুলোতে একটু কম হয়। কারণ তাদের ব্যবসারও একটি বিষয় থাকে। তবে বাংলা গানকে বাঁচাতে সংগীত বিভাজন না করাই ভালো। তারা চাইলে ধারাবাহিকভাবে সব ধরনের গানের অনুষ্ঠান প্রচার করতে পারেন।