সব জেলা উন্নত হলেই ঢাকা বাসযোগ্য হবে

পৃথিবীর প্রতিটা উন্নত দেশে রাজধানী ছাড়াও একাধিক শহর থাকে, যেগুলো রাজধানীর চেয়েও বেশি উন্নত। আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনের চেয়ে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, কানাডার রাজধানী অটোয়ার চেয়ে টরন্টো, কুইবেক এবং অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার চেয়ে সিডনি ও মেলবোর্ন এমনকি ভারতের রাজধানী দিল্লির চেয়ে মুম্বাই অনেক উন্নত। 

এসব দেশে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনীতি-ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প-সংস্কৃতি-চলচ্চিত্র সবকিছু শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। এসব বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকে। এ কারণে এসব দেশের নাগরিক এবং অভিবাসীরাও রাজধানীর পরিবর্তে অন্যান্য শহরে বসবাস করতেই বেশি আগ্রহী। কিন্তু বাংলাদেশের সবকিছুই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। এজন্যই সবাই ঢাকায় বসবাস করতে চায়। একবার কেউ ঢাকায় বাস করতে শুরু করলে সে আর নিজের এলাকা বা দেশের অন্য কোনো জেলায় যেতে চায় না। শুধু তাই নয়, নিজেদের জেলা বা শহর যেন উন্নত হতে না পারে, তাদের অনেকে সাধ্যমতো সেই চেষ্টাও করে। এজন্যই ঢাকার বাইরের বেশির ভাগ জেলা এবং গ্রামগুলোতে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। 

বিশেষ করে মাধ্যমিকের পর কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য প্রায় সবাই ঢাকা যেতে চায়। এসব কারণেই ঢাকা পরিণত হয়েছে পৃথিবীর শীর্ষ বসবাসের অযোগ্য, জনবহুল, দূষিত এবং যানজটের শহরে। ঢাকায় গাড়ির গতি নেমে এসেছে প্রায় পায়ে হাঁটার সমান গতিতে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, যানজটে প্রতিদিন রাজধানীতে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। একই কারণে মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, বক্ষব্যাধিসহ আরো নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ দেশের সব জেলাতে ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি চিকিৎসাসেবার মান উন্নত হলে জনগণের সব ব্যাপারেই ঢাকামুখী হওয়া প্রবণতা রোধ করা যেত। ফলে সারা দেশেরই উন্নয়ন হতো। 

কিন্তু তা না হওয়ায় সবার মধ্যে ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা এত বেশি। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি আমলে এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পরবর্তী দুই দশক দেশের বিভিন্ন জেলা শহর শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বর্তমানের চেয়ে অনেক অগ্রসর ছিল। প্রায় সব জেলা থেকেই একাধিক দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা এমনকি ভালো মানের বইও প্রকাশ পেত। রাজধানী ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো এবং সারা দেশের উন্নয়নের জন্য দেশের প্রতিটা জেলা শহর এবং গ্রামগুলোকে উন্নত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক হলে সারা দেশ কখনোই উন্নত হবে না। দেশের সব অঞ্চল উন্নত হলেই ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমবে। সরকারি কর্মচারীদের ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হলেও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে তারা পরিবার নিয়ে সেখানে থাকতে আগ্রহী হন না। 

দেশের প্রতিটা জেলায় বসবাসকারী জনগণ যেন শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উন্নত চিকিৎসার ক্ষেত্রে রাজধানীর মতোই সুবিধা পায়—সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা শহরে অতিরিক্ত জনসংখ্যার অন্যতম কারণ বাইরের জেলাগুলোতে কাজের অভাব। বিভিন্ন জেলার দরিদ্র লোকজন কাজের সন্ধানে শহরে এসে রিকশা চালানোসহ বিভিন্ন পেশায় জড়িত হয় এবং সড়ক ও বস্তিতে বসবাস করে। এদের বড় অংশ বিভিন্ন সড়ক দখল করে দোকান বসায়, যা যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ। তাদের নিজ জেলায় অথবা পাশের জেলাগুলোতে নিয়ে কৃষি এবং অন্যান্য কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। কর্মসংস্হান সৃষ্টির জন্য দেশে ব্যাপক শিল্পায়নের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো আদালত, সচিবালয়, বৃহৎ শিল্প কারখানা, রাজধানীর বাইরে স্হানন্তর করা দরকার। এছাড়া পূর্বাচল বা গাজীপুরের দিকে দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপনের বিষয়টাও বিবেচনা করা উচিত। এসব ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে রাজধানীতে বসবাসের পরিবেশ আরো শোচনীয় হবে। 
ঢাকা