আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। একুশের গানের গীতিকার। মারা গেলেন ৮৮ বছর বয়সে। লন্ডনে। তিনি ডায়াবেটিস ও কিডনির বিকলতায় ভুগছিলেন। তার চিকিত্সা চলছিল লন্ডনের একটি হাসপাতালে। কিন্তু কথা হলো, মৃত্যুর পর জাতির সমষ্টি চেতনায় বিরলসংখ্যক মানুষ অতি জীবিত হয়ে ওঠেন, সেই বিরলদের একজন ছিলেন গাফ্ফার। তার সম্বন্ধে যে কথাটি অমোঘ পয়গাম বয়ে আনে তা হলো, তিনি কওসর-স্নাত ভাষাসৈনিক।
ভারতবর্ষের শত ভাষার সহস্র অভিযানে ‘ভাষাসৈনিক’ কথাটি পাওয়া যায় না। পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষার শব্দকোষেও ঔ ভাষা-মুদ্রাটি পাওয়া যায় না। ভাষা-চেতনা কথাটিও বাংলাদেশে যে সুর ও তাত্পর্য বয়ে আনে, তা অন্য কোনো দেশে অমন করে ফুটে ওঠে না। ভাষা-চেতনা থেকেই ভাষাসৈনিকের অবির্ভাব; ভাষার জন্য, অর্থাৎ মাতৃভাষার জন্য আত্মদান কিংবা আহূতি, রক্ত ঝারানো সংগ্রাম— এই সবের জন্য যথার্থ এক্তিয়ার যাদের স্মরণীয় করেছে, সেই তালিকায় জ্বলজ্বল করছে নাম, গাফ্ফার গাফ্ফার। ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধ এক নবতর চেতনায় আত্মপ্রকাশ করেছে ঐ গানে— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’—আশ্চর্য এই যে, ‘একুশে’ কথাটি বাংলা কিন্তু মাসের নামটি ইংরেজি— সেই একুশেই আজ আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সব ভাষার মাতৃ-মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দিন আসছে, যখন পৃথিবীর সব ভাষার জন্মদিনেই আলতাফ মামুদের সুরে ঐ গানটি গাওয়া হবে। গাফ্ফার নামটির দিগন্তজয় এখনো সূর্যের আলোর মতো ক্রমান্বয়ে ধাবিত হয়ে চলেছে— বাঙালি আজ কোনো ভাষারই মৃতু্য হোক চায় না—সবার স্বাধীকার চায়। সব ভাষার। এই মহামন্ত্র বাংলাদেশেই অপূর্বতায় ও অমোঘতায় উচ্চারণ করতে পেরেছে; ভাষা-চেতনাই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার অঙ্গীকার। এই চেতনার কথা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তার মেধা, কর্ম ও লেখনীতে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখেছেন। তিনি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মননকে ধারণ করে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়কে সমর্থন করে জাতির সামনে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আসলে রক্তের অন্তর্গত অসাম্প্রদায়িক চেতনারই একটি সংগ্রামী রূপ। সে কথাই বলেছেন মুজিবকন্যা হাসিনা। ভাষাসৈনিকেরাই জাতির পিতার টেমপারামেন্টকে যথাযথ ভাষায় ও গানে, ছবিতে ও মননে, জীবন যাপনের চর্যায় তুলে ধরেছেন। শ্যাম বেনেগালের চলচ্চিত্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বাঙ্গীণ আদর্শের মহিমায় রূপায়িত হতে দেখব, এই আশায় দিন গুনছি আমরা। এই চলচ্চিত্রের বিশ্ব সম্মান অবধারিত। যে সাংস্কৃতিক উত্কর্ষ বাংলাদেশের রয়েছে এবং জমির উর্বরতা যে পরিমাণ রয়েছে এবং হাসিনার যে সমর্থ নেতৃত্ব ও সত্-উজ্জীবন শক্তি রয়েছে, তাতে করে আশা জেগে ওঠে এই বলে যে, ভারতীয় উপমহাদেশের চালিকাশক্তির রাশ হাসিনারই হাতে এসে পড়বে অচিরে; এটাই বাস্তবসম্মত সত্য, ইতিহাসের সত্য।
খোদার কসম, আমি কোনো আজগুবি কথা লিখছি না। পূর্ব দিগন্তেই শুকতারা জেগে রয়েছে ভোরে। সূর্যকিরণের প্রথম গতিরেখা এগিয়ে আসছে মানবতার ভাষা জাগরিত দেশটিরই প্রত্যঙ্গ স্পর্শ করে।
ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ আজ বিপর্যস্ত; এখানে ভেদবুদ্ধি ভারতবর্ষের উজ্জীবনকে রাহুগ্রস্ত করেছে; ভারতবর্ষের মহামিলনের চেতনায় আজ জরাগ্রস্ততার ভার এসে পড়েছে; যে ভারত পথ দেখাত, সে আজ ডুবছে। তাই বাংলাদেশই ভারতবর্ষের প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
‘ভারততীর্থ’ যার লেখা, তারই লেখা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’—এই গানের মধ্যে আমি বাংলাকে পাই। ‘ভারততীর্থ’ আওড়ালে আমি পাই ভারতবর্ষকে। সেই ভারতবর্ষ আজ বিভেদ প্রহেলিকায় প্রচ্ছন্ন। তাকে ঠিক দেখা যায় না আর।
আর্য-অনার্য-দ্রাবিড়-চীন-পাঠান-মোগল এক দেহে লীন হয়েছে এই ভারতবর্ষে। রক্তের এই সংমিশ্রণ ভারতবর্ষের অমোঘ সত্য, ইতিহাসের সত্য, প্রজাতির নৃগোষ্ঠিক সত্য—এ চরম ও চূড়ান্ত সত্য। এই সত্যকে আজ ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই অবস্থায় আসম্প্রদায়িক চেতনার জলপ্রদীপ ভাসিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। তাই দেখে যদি সংবিত ফিরে পায় ভারত, সেই আশায় বেঁচে থাকাও তো সত্য। ভাষা-চেতনা মাথায় রেখে গাফ্ফার ভাইয়ের একুশের গান রক্তে মেশাতে মেশাতে এক আশ্চর্য সত্য তুলে ধরি। পশ্চিমবঙ্গের বারাসতের পশ্চিম ইছাপুর নবপল্লির বসু পরিবারের এক অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ছবি এঁকে দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি প্রচারিত দৈনিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক। যাকে বলে সত্য ঘটনা অবলম্বনে খবর। এক আমানতি মসজিদের রক্ষক ও সেবক বা খাদেম হলেন পার্থসারথি বসুর পরিবার। তারা এখন মসজিদের মিনার সাজাচ্ছেন।
একটি হিন্দু পরিবারের ধ্যানজ্ঞান এই মসজিদ। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিনিময়প্রথায় বারাসতে চলে আসা এই পরিবার সঙ্গে এনেছেন বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংস্কারের মন ও সংস্কৃতি। মসজিদ রক্ষায় পার্থসারথির মানবতাবোধই জয়ী হয়েছে। সাংবাদিক লিখেছেন, মন্দির-মসজিদের রাজনীতি পার্থ বা তার বাবা দীপক বাবুর দুই চক্ষের বিষ। এই বসুবাড়ির বউরা বিয়ের পরে মসজিদ চত্বরে প্রণাম করে শ্বশুরবাড়ি ঢোকেন। নবজাতককে অন্নপ্রাশনে পায়েস খাওয়ান মসজিদের ইমাম সাহেব। হিন্দু কারো মৃত্যু হলে শ্মশানযাত্রার আগে আজান দেন ইমাম। একুশে চেতনার আর এক ছবি এখানে। জয় বাংলা।
লেখক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক