বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় দেখা মিলেছে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম প্রজাতির তিমি কোগিয়া সিমা বা বামন কোগিয়া। সপ্তাহখানেক আগে স্রোতের তোড়ে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে জীবিত অবস্থায় ভেসে আসে মা তিমিটি। স্থানীয়রা তিমিটি উদ্ধার করে সমুদ্রে ফেরত পাঠানোর চেষ্টাও করে। কিন্তু তীব্র স্রোতে সেটি বারবার ফিরে আসে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর মারা যায় তিমিটি। এরপর জানা গেল মা তিমির পেটে ছিল দুটো বাচ্চা।
বামন কোগিয়া দেখতে হাঙ্গরের মতো। বেশির ভাগই ডলফিনের চেয়ে আকারে ছোট। মাথা বর্গাকার, নাকের বর্ধিতাংশ সামনের দিকে অভিক্ষিপ্ত এবং মাথার পাশে নকল ফুলকাছিদ্রের মতো দেখতে একটি সাদা দাগ রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে বামন কোগিয়া তার চেয়ে বড় ঘাতক তিমি ও বড় হাঙ্গরদের বোকা বানায় যে সে আসলে একটি হাঙ্গর। এদের পেটের ভেতরে অন্ত্রের সঙ্গে লালচে-বাদামি তরল দিয়ে ভরা একটি ছোট থলি সংযুক্ত থাকে। শিকারিদের উপস্থিতিতে এরা থলি থেকে তরল পদার্থ পানিতে ছুড়ে দেয় এবং নিজেদের আড়াল করে। শিকারিদের চোখে ধুলো দিতে যেমনটা করে থাকে অক্টোপাস। কালির মতো কালো তরল নির্গত করে।
কুয়াকাটা সৈকতে তিমিটি উদ্ধারের পর উদ্ধারকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিমির ছবি শেয়ার করে। তিমির ছবি দেখে ও পরবর্তীকালে সশরীরে তিমিটি বিশ্লেষণ করে ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি নামে একটি সংগঠন।
ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশনের সোসাইটির কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিশ্বে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ৯০টিরও বেশি প্রজাতির মধ্যে বামন কোগিয়া একটি। সম্প্রতি তিমিটি স্থানীয়দের নজরে আসার পর আমাদের খবর দেয়, আমরা সেখানে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। ডলফিনের মতো হলেও ওটি মূলত তিমি। নাম বামন কোগিয়া। বাংলাদেশের জলসীমায় প্রথমবারের মতো এই প্রাণিটি দেখা গেছে। তবে আমরা ধারণা করছি, সমুদ্রে আরো বামন কোগিয়া রয়েছে। আমাদের সমুদ্রের পানির যে বৈশিষ্ট্য তার সঙ্গে এই তিমির বসবাস স্থলের মিল আছে। অতি শিগ্গিরই হয়তো আমরা এই প্রজাতির তিমি আরো দেখতে পাব।
এই তিমিটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এরা স্তন্যপায়ী প্রাণী। সারাজীবন পানিতে কাটায় এবং বাতাস থেকে শ্বাস নেয়। মানুষের মতোই মা তিমি সাধারণত একটি বাচ্চা বা শাবক জন্ম দেয় যারা স্বাধীনভাবে জীবনযাপনে সক্ষম হওয়ার আগ পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করে। ডলফিন, পরপয়েস এবং বামন কোগিয়াসহ আরো কয়েকটি ‘দাঁতাল’ তিমিদের ধারালো দাঁত থাকে, যা দিয়ে তারা পিচ্ছিল শিকার ধরে ও মুখে পুরে নেয়। তবে অন্যান্য তিমিদের মতো এরা শিকারকে চিবিয়ে না খেয়ে সম্পূর্ণ গিলে ফেলে। বাংলাদেশের সৈকতে পাওয়া গর্ভবতী এই বামন কোগিয়া তিমির পেটে দুটি বাচ্চা ছিল। যা অত্যন্ত বিরল। কারণ, সাধারণত এরা প্রতিবারে একটি বাচ্চা জন্ম দেয়।
কুয়াকাটা ডলফিন সংরক্ষণ কমিটির সদস্য কে এম বাচ্চু তিমিটিকে উদ্ধার করেছিলেন। তিনি বলেন, গত ২২ মে সকাল ৭টায় স্থানীয়দের ফোন পেয়ে তিমিটিকে উদ্ধার করি। এটি প্রথমদিকে জীবিত থাকলে স্থানীয়রা সমুদ্রে ফিরিয়ে দেয়। পরে এটি সমুদ্রের ঢেউয়ের কারণে আবার ফিরে আসে। তখন এটিকে মৃত পাওয়া যায়।
সেভ আওয়ার সি-এর সিইও আনোয়ারুল হক বলেন, তিমিরা মূলত সাগরে মুখ হা করে চলাফেরা করে। এসময় মুখের ভিতর যা ঢুকে তাই তারা খায়। কোগিয়াদের দুটি প্রজাতি রয়েছে। দুটি প্রজাতিই প্লাস্টিকের ধ্বংসাবশেষকে ভুলবশত স্কুইড, অক্টোপাস বা কাটলফিশ ভেবে গিলে ফেলে এবং মারা যায়। যার দরুণ এরা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। প্লাস্টিকের ধ্বংসাবশেষ এদের পরিপাকতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করতে পারে এবং ফলস্বরূপ অনাহারে মৃত্যু ঘটতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের অধ্যাপক ড. শেখ আফতাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে রেকর্ডকৃত এই বামন কোগিয়া তিমি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গভীর সমুদ্রে বাসকারী এই তিমি সম্পর্কে মানুষ খুব কম জানে। বাংলাদেশের সমুদ্রে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ডব্লিউসিএস পরিচালিত গবেষণার সময় এই প্রজাতিটি কখনো দেখা যায়নি। তবে বামন কোগিয়া তিমি মানুষের ধারণার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকতে পারে। কারণ, সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ সম্পূর্ণ শান্ত থাকলে এবং এরা সমুদ্রপৃষ্ঠে গতিহীনভাবে অবস্থান করলে এদের দেখা পাওয়া সম্ভব অন্যথায় দেখা পাওয়া দুরূহ।