দেশের শিল্পখাত এখন কঠিন সময় অতিক্রম করছে। আমরা করোনাকালের ক্রান্তি পাড়ি দিয়েছি দুই বছর। একটু সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে না করতেই রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের ধাক্কা। এরমধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিদু্যৎ এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। এমনিতেই কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ নেই। বিদু্যতের ঘন ঘন আসা-যাওয়া। তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব। সবকিছু মিলিয়ে এ এক কঠিন সময়।
২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, এর মধ্যে গ্যাসের দাম বেড়েছে ৩০০ শতাংশ। সরকারের লোকসান হোক, সেটা আমরা চাই না। ২০১৯ সালে বলা হয়েছিল, এলএনজি গ্যাস আমদানির ব্যয় মেটাতে এ দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এলএনজি আসতে আসতে ২০২১ সাল হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের খরচ পড়ছে ২৫ সেন্ট। প্রতি কেজি কাপড় উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে ৩২ সেন্ট। প্রস্তাবিত বাড়তি গ্যাসের দামে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে ব্যয় হবে ৫৬ সেন্ট। উৎপাদন খরছের ৬০ শতাংশ চলে যাচ্ছে গ্যাস এবং বিদু্যৎ খাতে। এত বেশি ব্যয় করে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা আমাদের জন্য মুশকিল হয়ে পড়বে। সরকার যেসব খাতে ভর্তুকি দেয় সেসব খাতে দিক। আমাদের আপত্তি নেই। যেমন কৃষিতে প্রতিটি দেশ ভতুর্কি দেয়। আমরা চাই বাংলাদেশও দিক। কিন্তু সে অর্থ যদি শিল্পখাত থেকে আদায় করে তাহলে আমাদের আপত্তি আছে।
আমাদের দেশের একমাত্র সম্পদ হলো গ্যাস এবং জনশক্তি। আমাদের কাঁচামালও নেই। তার পরও বাংলাদেশ ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে তার রপ্তানি আয় পৌঁছিয়েছে। টেক্সটাইল এবং গার্মেন্টস খাত থেকে মোট রপ্তানির ৮৫ শতাংশ আসে। জিডিপিতে আমাদের খাতের অবদান ১৪ শতাংশের মতো। ১৬ কোটি মানুষের পরিধেয় বস্ত্রও আমরা জোগান দিচ্ছি। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্হা এখন টালমাটাল। কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ফ্রেইট কস্টও বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ জ্বালানিতে ভতুর্কি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ অবস্হায় আমরা এ মুহূর্তে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর অনুরোধ করেছি।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে, শিল্পের জন্য আমরা একটি জ্বালানি নীতি চাই। যেটাতে জ্বালানির দামসহ অন্যান্য বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। শিল্পমালিকরা যদি জানে আগামী ১০ বছরে গ্যাস এবং বিদু্যতের দাম কি হবে তাহলে তাদের পরিকল্পনা করতে সুবিধা হয়। কিছু স্ববিরোধিতাও এখানে আছে। যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যে গ্যাস পায়, সেটার মূল্য আর শিল্পে ব্যবহার করা গ্যাসের মূল্য, এক নয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো গ্যাস পায়, চার টাকা ৪৫ পয়সা দরে। আর শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, ১৩ টাকার বেশি দরে। এ ক্ষেত্রে যদি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লোকসান করে, তাহলে শিল্প টিকে থাকে কী করে।
তিতাস গ্যাস কোনোভাবেই লোকসানি প্রতিষ্ঠান নয়; লোকসানে থাকলে তারা কীভাবে ২০ শতাংশের ওপর লভ্যাংশ ঘোষণা করে? বিগত পাঁচ বছরে তিতাস গ্যাসের লোকসান ১ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। সেখান থেকে ৭৫ শতাংশ অর্থ পেট্রোবাংলা নিয়ে গেছে। কারণ তারা তিতাসের ৭৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক। অপরদিকে তিতাসের পাবলিক শেয়ারের পরিমাণ ১০ শতাংশেরও নিচে। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করার ফলে তিতাসের লভ্যাংশের সুফল পেট্রোবাংলার ঘরে গেল। জনগণ এর সুফল কীভাবে পেল? শিল্পমালিকরা নানা চাপের মধ্যে থাকেন। সরকার বিদ্যুৎ বিলের ওপর ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর কেটে নেয়। তিন বছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সে অর্থও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সমন্বয় করেনি।
গ্যাসের দাম ১৩২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি হলে তা হবে আত্মঘাতী। কারণ, আমাদের বাণিজ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক। বায়ার থেকে যে অর্ডার আমরা পেয়ে থাকি তার দাম নির্ধারণে অনেকগুলো মেথড আছে। জ্বালানির দামও সে ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা হয়। গ্যাস এবং বিদু্যতের দাম বাড়বে, কিন্তু ক্রেতারা আমাদের পণ্যের দাম বাড়াবে না। কারণ বিভিন্ন দেশে মন্দা চলছে। আমাদের অর্ডারের গতি শ্লথ হয়ে গেছে। আমরা একটি সমীক্ষা চালিয়েছিলাম বিদ্যুৎ এবং গ্যাস পরিবাহণের ওপর। সেখানে দেখা গেছে, এখনকার কারখানার যে যন্ত্রপাতি সেগুলো লো ভোল্টেজের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। এখনো কোনো কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক ডিভাইস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নব্বইয়ের দশকে বিদ্যুৎ না নেওয়ার জন্য সরকার শিল্পমালিকদের নিরুত্সাহিত করেছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার নেওয়ার জন্য সরকার আমাদের বাধ্য করেছে। এখন ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ক্যাপটিভ পাওয়ার আমরা উৎপাদন করি। এখন এসব বন্ধ করে শিল্পমালিকরা কোথায় যাবে?
অব্যবস্হাপনা, সিস্টেম লসের দায়ও কিন্তু গ্রাহকরা দিচ্ছে। যেটি একেবারেই অযৌক্তিক। বিদ্যুৎ কিনে গ্রিডলাইনে উঠানোর পরে একটা সিস্টেম লস আছে। এর পরে সঞ্চালন লাইনে দিতে গেলে সেটাতেও সিস্টেম লস আছে। কিন্তু আমরা যারা ক্যাপটিভ পাওয়ার উৎপাদন করি, তাদের কোনো সিস্টেম লস নেই। এরপর অনেকে বিদ্যুৎখাতের লোকসানের কথা বলে। যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে লোকসান হয়, সেটি উৎপাদনের প্রয়োজন আছে বলে আমাদের মনে হয় না। আবার বিদ্যুৎ বিভাগের লোকসান পুষিয়ে নিতে অতিরিক্ত অর্থ সাধারণ থেকে আদায় করাও যুক্তিযুক্ত নয়। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে। সেগুলো সরকার আলোচনায় আনছে না। এই কেন্দ্রগুলো অপসারণের বিকল্প নেই।
সর্বোপরি বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের দাম বাড়ানো নিয়ে নানা সময়ে গণশুনানির আয়োজন করা হয়। কিন্তু সে শুনানিগুলো কোনো সময় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না। আমরা কী বলেছি, পল্লী বিদ্যুৎ কী বলেছে, পিডিবি কী বলেছে— এ তথ্যগুলো মানুষের জানা উচিত। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এ বিষয়গুলো কাউকে জানানো হয় না। কাউকে কিছু না জানিয়ে একতরফাভাবে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এটা একবারেই অযৌক্তিক। বাংলাদেশে এটিই হয়ে আসছে।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)