মিউনিখের আনাচেকানাচে রহস্যের গন্ধ

জার্মানির বাভেরিয়া রাজ্যের রাজধানী মিউনিখ পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এক গন্তব্য। কিন্তু দৃষ্টব্যগুলির অনেক রহস্য এমনকি শহরের মানুষেরও অজানা। এক গাইড সেই সব রহস্য উন্মোচন করে চলেছেন। 

করোনা মহামারি ভ্রমণ কঠিন করে না তুললে প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ মানুষ জার্মানির দক্ষিণে মিউনিখে আসেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে মারিয়েনপ্লাৎস ও ৮৫ মিটার টাওয়ারসহ নতুন টাউন হল কিছুতেই চোখ এড়িয়ে যাবার জো নেই। সেখানেই প্রথম রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। এমনকি সব স্থানীয় মানুষও এই সব রহস্যের কথা জানেন না।

শহরের গাইড স্টেফানি সিমারমান জানালেন, ‘‘অনেকেই যেটা জানেন না, সেটা হলো এই নতুন টাউন হলের মূল আকর্ষণই হলো আইন বিষয়ের লাইব্রেরি। আর্ট নুভো শৈলির অপূর্ব নিদর্শন। আমি আজ সেটা দেখাবো।''

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নতুন এই টাউন হল গড়ে তোলা হয়েছিল। নিও গথিক শৈলিতে ডিজাইন করা হলেও একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল। ১৯০৬ সালে ১০ মিটার উঁচু এই ঘরে আইন বিষয়ক গ্রন্থাগার চালু করা হয়।

আজও সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে। স্টেফানি জানালেন, ‘‘মিউনিখ শহরের নতুন টাউন হল ভবন ঘুরিয়ে দেখানোর সময় জুরিডিক্যাল লাইব্রেরি অবশ্যই একটা বড় আকর্ষণ। সেখানে নিয়মিত চলচ্চিত্রের শুটিং হয় জেনে অনেক অতিথি অবাক হন। ‘ক্যাবারে' চলচ্চিত্রে লাইজা মিনেলি এই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসেছিলেন। অনেকেই সেটা ভাবতে পারেন না।''

জার্মান ফুটবলের সব অনুরাগী এই বারান্দাটি চেনেন। জার্মানির সবচেয়ে সফল ফুটবল ক্লাব কোনো টুর্নামেন্ট জিতলেই সেখানে উৎসবে মেতে ওঠে। স্টেফানি সিমারমান বলেন, ‘‘আসলে বেশিরভাগ মানুষই জানেন, যে এফসি বায়ার্ন ক্লাবের খেলোয়াড়রা সাধারণত এখানে দাঁড়ান। প্রায় চার বছর ধরে সেখানে সত্যি মৌমাছির পছন্দের গাছ বেড়ে উঠছে। সেগুলি এত বড় হয়, যে উপরে দাঁড়ালোও ভালো করে নীচে তাকানো যায় না এবং অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করা যায় না।'' 

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে জায়গাটি শুধু পথচারিদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। তখন থেকেই ইউরোপের দক্ষিণ অংশের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। স্টেফানি বলেন, ‘‘নতুন টাউন হলের কাছেই মেরির স্তম্ভ রয়েছে। অনেকেই জানেন, এটির জন্যই চত্বরের নাম মারিয়েনপ্লাৎস রাখা হয়েছে। কিন্তু আরও একটি রহস্য রয়েছে, যা এবার আমি দেখাবো।''

উল্লেখ্য, ১৬৩৮ সালে ১১ মিটারেরও বেশি উঁচু মেরির স্তম্ভ গড়ে তোলা হয়েছিল। স্টেফানি সিমারমান বলেন, ‘‘অনেকেই যেটা জানে না, সেটা হলো মারিয়ার মুকুটের নীচে সত্যি এক রিলিকুয়ারি ক্যাপসুল লুকিয়ে রয়েছে। সেটি সব রকম পরিস্থিতিতেই নিরাপদ রয়েছে। আমাদের শহরের পৃষ্ঠপোষক হোলি বেনোর একটি হাড় সেখানে রয়েছে। আরও এমন নমুনা রয়েছে। ফলে মেরির স্তম্ভ খোলা আকাশের নীচে গির্জার বেদির মতো। প্রতি রোববার সকাল সাতটায় সেখানে গোলাপের স্তবক রেখে প্রার্থনা করা হয়। যে কেউ সেই প্রার্থনায় অংশ নিতে পারে।''

মাছের ফোয়ারা নামটির পেছনেও অতীতে হাটের দিনে মাছ বিক্রির রীতির প্রতিফলন ঘটছে। আজ মারিয়েনপ্লাৎস এলাকায় দেখাসাক্ষাৎ করতে হলে মিটিং পয়েন্ট হিসেবে স্থানীয় মানুষ সেই ফোয়ারাটিকেই বেছে নেন। স্টেফানি সিমারমান বলেন, ‘‘মিউনিখেরও অনেক মানুষ যেটা জানেন না, সেটা হলো সেখানে নতুন কসাইদের স্নান করানো হয়। সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রশিক্ষণের শেষে শিক্ষানবিশদের কসাই হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে শীতের কারণে প্রতি তিন বছর অন্তর সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষানবিশরা পশুর চামড়া গায়ে জড়িয়ে ফোয়ারার পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং দর্শকদের গায়ে পানি ছিটিয়ে দেন।''

শেষের রহস্যটি সবার কাছেই দৃশ্যমান। তা সত্ত্বেও অনেকেই লিন্ডওয়ার্মের পাশ কাটিয়ে চলে যান। স্টেফানি বলেন, ‘‘অতীতকালে সেটি নাকি সত্যি মারিয়েনপ্লাৎস এলাকার চারিদিকে ঘুরে বেড়াতো। আরও গভীরে প্রবেশ করতো এবং অবশেষে এই জায়গায় পৌঁছয়। বিষাক্ত নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস ছড়িয়ে দিয়ে সেটি মিউনিখে প্লেগ এনেছিল বলেও অপবাদ রয়েছে।''

সৌভাগ্যবশত মিউনিখে এখন আর প্লেগ নেই। জার্মানির দক্ষিণের এই শহর ভ্রমণের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।