‘স্যার’ সম্বোধনে যত আপত্তি-বিপত্তি

‘স্যার’ শব্দটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবেই ব্যবহার হয়ে আসছে এবং যা আমাদের শিষ্টাচার সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত। সাধারণভাবে ‘স্যার’ মানে জনাব, শিক্ষক, সম্মানিত ব্যক্তি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা গুরুজনদের সম্মান করে ‘স্যার’ ডাকা হয়। আন্তর্জাতিকভাবেও ‘স্যার’ সম্বোধন একে অপরকে সম্মান প্রদর্শন ও তার প্রতি সৌজন্যতা প্রদর্শন করা।

তবে আমাদের দেশে এই ‘স্যার’ সম্বোধন নিয়ে অনেকের মধ্যেই একধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংকীর্ণতা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন কাউকে ‘স্যার’ সম্বোধন করলে তিনি হয়তো নিচু হয়ে যান। তাই প্রযোজ্য ক্ষেত্রেও ‘স্যার’ সম্বোধন করতে অনেকেই অনীহা প্রকাশ করেন।

দেশের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স রয়েছে, যেখানে মন্ত্রী-সংসদ সদস্য, বিচারক, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, আমলা, শিক্ষক, সামরিক-বেসামরিক সব সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পদমর্যাদা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা আছে, যা প্রটোকল রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্রে তাদের অবস্হান নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সকলের জন্য মান্য করা আবশ্যক। তাছাড়া ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স-এর বাইরেও নানা পদমর্যাদার সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্হার কর্মকর্তা রয়েছেন; যাদের মধ্যে সম্মান প্রদর্শনের রেওয়াজ বিদ্যমান। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক সংকীর্ণতার কারণে কোনো কোনো সংস্হা, ক্যাডার, বাহিনী, যারা সংখ্যাধিক্য ও ক্ষমতাধর, তাদের অনেকেই আবার জ্যেষ্ঠতার আলোকে অন্য সংস্হায় কর্মরত পদমর্যাদায় বড় হলেও ক্ষমতাবান না হলে প্রটোকল মানতে চান না, নিয়মানুযায়ী ‘স্যার’ সম্বোধন করার সৌজন্যতা প্রদর্শন করেন না। এমনকি তাদের অধীনস্হদেরও এই বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা প্রদান করেন না। ফলে নিম্নপদস্হরাও নিজ সংস্হা, ক্যাডার, বাহিনীর বাইরে অন্যদের ‘স্যার’ সম্বোধন বা যথাযথ সৌজন্যতা প্রদর্শন করেন না। তাই এ নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে এবং এক সংস্হার সঙ্গে অন্য সংস্হার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রদ্ধাবোধ ও মনোবলের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

সমাজে প্রতিষ্ঠিতজনেরা সকলেই নিজ অবস্হান থেকে তার প্রাপ্য সম্মান নিয়ে সজাগ রয়েছেন। তবে শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিগণ ‘স্যার’ সম্বোধন করা না করা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া নানা অপ্রীতিকর ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে নেতিবাচক মানসিকতার ব্যক্তিদের এড়িয়ে চলেন এবং যথাযথ সম্মান না পেলেও নিজেদের সংযত রাখেন/মানিয়ে নেন। তবে কাউকে সম্মান দিলে তার সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়—এই শিক্ষা যে আমরা কোথা থেকে পেলাম, জানি না। বরং যিনি অন্যকে সম্মান দিলেন তার সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক ধারণা জন্মায়, আপন মনে হয়। একজন অপর জনকে, ছোট বড়কে, অধীনস্হ-ঊর্ধ্বতনকে সম্মান করা—এটা তো পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

তাই প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্যাডার, বাহিনী, সংস্হার উচ্চপদস্হ কর্মকর্তাদের উচিত, তারা যেমনি ‘স্যার’ সম্বোধন শুনতে উদগ্রীব তেমনি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্যকেও যেন ‘স্যার’ সম্বোধন ও সম্মান করার বিষয়ে নিজেরা ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। শুধু যেন নিজ সংস্হার মধ্যে সম্মান দেখানোর নতুন রেওয়াজ চালু না করেন। সমাজের এই নেতিবাচক মনোভাব পরিহার করতে আইনের বাধ্যবাধকতাসহ নিয়মিত প্রেষণারও একান্ত প্রয়োজন। প্রশাসন-বাহিনী-সংস্হা নির্বিশেষে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোড অব কন্ডাক্ট এক হওয়া উচিত। বাহিনী-বাহিনীর মধ্যে সুসম্পর্ক, বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক, সমাজে শিক্ষিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা, একে অপরকে সম্মান প্রদান করা, এটাই রেওয়াজ, এটাই সামাজিকতা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করলেই বড় হওয়া যায় না, যদি না ইতিবাচক মানসিকতা থাকে। সংকীর্ণ মানসিকতা দূরীকরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা রয়েছে, আলোকিত মানুষের গল্প, নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা, মানবতার শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন তাদের মনকে হয়তো প্রভাবিত করতে পারে; তার প্রচেষ্টাও চালাতে হবে।

‘স্যার’ একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং অন্যতম সম্মান প্রদর্শন ও সম্বোধনের শব্দ। এই ‘স্যার’ সম্বোধন করা না করা নিয়ে বিভিন্ন সময় এমন সব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, যা কিনা শব্দটিকে বিতর্কিত করেছে। ফলে অনেকেই কলোনিয়াল বলে এই শব্দ পরিহারে মতো দিয়েছেন; কিন্তু কলোনিয়াল কলোনিয়াল বলে সর্বক্ষেত্রে ‘স্যার’ সম্বোধন পরিহার করা যায় না। কলোনিয়াল অনেক কিছু নিয়েই আমরা এত দূর এসেছি। তাই কে কীভাবে সম্বোধন করবেন তা যার যার ব্যক্তিগত হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সামরিক ও অন্যান্য বাহিনী সদস্য, বিভিন্ন সংস্হা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত সদস্য ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলমান ‘স্যার’ সম্বোধন অতি আকর্ষণীয় এবং অবশ্যই পালনীয়।

তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেসরকারি বা সাধারণ জনগণের ‘স্যার’ সম্বোধনের কোনো সংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই, তার কোনো বিধানও নেই। তাই বেসামরিক বা বেসরকারি লোকদের কাছে কিংবা সরকারি চাকুরির বাইরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় নিয়োজিত লোকদের কাছ থেকে ‘স্যার’ সম্বোধন আশা করা ঠিক নয়। তারা যেভাবেই সম্মানসূচক বা আন্তরিকতার সঙ্গে সম্বোধন করুক না কেন তা গ্রহণ করার মানসিকতা সরকারি কর্মকর্তাদের থাকতে হবে। বেসরকারি পরিমণ্ডলে অনেকেই সরকারি কর্মকর্তাদের স্যার/ম্যাডাম-এর চেয়ে ভাই/আপা সম্বোধনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাই ব্যবসায়ী, বেসামরিক ব্যক্তি অথবা সাধারণ জনগণ, সরকারি বড় বড় কর্মকর্তাদের অনেক সময় ভাই/আপা বলে সম্বোধন করেন। যা আবার সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকের কাছে পছন্দনীয় নয়। ‘স্যার’ সম্বোধন করা না করা নিয়ে কোথাও সরকারি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কিংবা অন্যান্য পেশার মানুষের সঙ্গে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে—যা বিভিন্ন সময় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীও একবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনিও বলেছেন, ‘সাধারণ জনগণ কর্তৃক সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ সম্বোধন করতে হবে—এর কোনো বিধান কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই।’ কেউ যদি স্যার না ডাকে তাতে সরকারি কর্মকর্তাদের কারো খারাপ লাগা উচিত নয়। তবে এ বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে এ নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হবে না।

ভালো সব সময় ভালো, খারাপ সব সময় খারাপ, তার কোনো আমল/কাল নেই। আমাদের সংস্কৃতিতে ‘স্যার’ সম্বোধন মানে একজনকে সম্মান জানানো। এটা সেই ফরাসি কিংবা ইংরেজ আমলের শাব্দিক অর্থে (দাসত্ব স্বীকার) প্রয়োগ নয়, এটা আমরা সবাই বুঝি। তার পরও একটি শব্দ, একটি সম্বোধন ‘স্যার’ যার প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে নানা মতপার্থক্য। ইউরোপ-আমেরিকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘স্যার’ সম্বোধনের রেওয়াজ নেই, তাই বলে আমরা কি আমাদের শিক্ষার্থীদের ‘স্যার’ ডাকতে বারণ করব?

তবে একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স এর অন্তর্ভুক্ত পদ-পদবি অনুযায়ী এবং এর বাইরের অন্যান্য পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ যারা পদমর্যাদায় বড়—তাদের ‘স্যার’ না বললে কানে বাঁধে এবং অসৌজন্যতা মনে হয়। তাই সরকারি কোষাগার থেকে যারাই বেতন নিচ্ছেন তাদের সবাইকেই সরকারি কর্মকর্তাদের (হোক সে অন্য সংস্হার) পদ-পদবি অনুযায়ী এবং ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে অন্তর্ভুক্ত জ্যেষ্ঠদের ‘স্যার’ সম্বোধন বাঞ্ছনীয় এবং শিষ্টাচারভুক্ত। তবে তা বেসরকারি ব্যক্তিবর্গ কিংবা সাধারণ জনগণের ওপর প্রযোজ্য নয়। তারা যে সম্বোধনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন—তা-ই বলে সম্বোধন করবেন এবং সরকারি কর্তা ব্যক্তিদের এটা গ্রহণের মানসিকতা থাকতে হবে। তাহলে আর ‘স্যার’ সম্বোধন করা না করা নিয়ে থাকবে না কোনো আপত্তি, বাধবে না কোনো বিপত্তি।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খুলনা