বু কা র পু র স্কা র ২ ০ ২ ২

রেত সমাধি: পথের শেষ কোথায়?

হিন্দি-সাহিত্যের লেখালেখি আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে, এমন ঘটনা খুবই কম। অন্যদিকে নিম্নবর্ণের মানুষের বিশেষ করে দলিত, নারী শ্রেণির সম্পৃক্ততাও অনেকটা ফাঁকা মাঠের মতো। আবার, উলটোদিকে এটাও সত্য যে, অনেক ভারতীয় সরাসরি উপনিবেশ ভাষা ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করে কেবল স্বদেশ-সীমানা নয়, সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিসরেও সম্মানজনক স্থান নিতে সক্ষম হয়েছেন। তার মধ্যে ভি এস নইপল, অরুন্ধতী রায়, কিরণদেশাই, নীরোদ সি চৌধুরী, সলমান রুশদির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এসব সাহিত্যব্যক্তিত্ব ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করার জন্য স্বদেশ, স্বভাষীদের কাছে সমালোচিত হয়েছেন, তেমনি আবার বুকার কিংবা ম্যান-বুকার পুরস্কার লাভ করে আন্তর্জতিক অঙ্গনে পরিচিতি, আলোচনা, সম্মাননার অংশীদারও হয়েছেন।

লেখক গীতাঞ্জলি শ্রী। মূল নাম গীতাঞ্জলি পাণ্ডে। হিন্দি-সাহিত্যের এ নামটি এ-বছর সংযুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের তালিকায়। অথচ, গীতাঞ্জলির ঝুলিতে রয়েছে মাত্র পাঁচটি উপন্যাস আর কয়েকটি ছোটগল্প গ্রন্থ। উত্তর প্রদেশের মৈনপুরার আইএএস পরিবারে জন্ম নেওয়া এ নারী ২০১৮ সালে হিন্দিতে প্রকাশিত ‘রেত সমাধি’ উপন্যাসের অনুবাদের জন্য এ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। গীতাঞ্জলি শ্রীর সৌভাগ্য যে, এই প্রথম হিন্দি ভাষায় রচিত এবং ইংরেজিতে অনূদিত বইয়ের জন্য এককালের উপনিবেশিক দেশ থেকেই তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

গীতাঞ্জলি শ্রীর দেশীয় পাঠকেরা তাঁর লেখার স্বাদ পেলেও বাকি দুনিয়ার তাবত্ পাঠকের কাছে তাঁর রচিত উপন্যাস, গল্প গ্রন্থ না পৌঁছায় পূর্ণাঙ্গ সমালোচনা কিংবা প্রশংসার বাণী পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও কোনো কোনো সাহিত্যিক ‘রেত সমাধি’কে ইতিমধ্যে তার দেশবিভাগ, মানবিক গল্পের একটি জটিল আকর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছেন। গভীর পাণ্ডিত্বপূর্ণ এ উপন্যাসে রয়েছে ভারতীয় ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত, রন্ধনশিল্প, শৈল্পিক সূত্রোল্লেখ— যা ভারতের সুদীর্ঘ পুরাতন ইতিহাসের বন্ধ দরজাকে পাঠকের কাছে উন্মুক্ত করে দেয়। দেশবিভাগ, পরিচয় সংকট, নারী অধিকার, লিঙ্গ বৈষম্য প্রভৃতি পুরনো বিষয়ের জন্য এ উপন্যাসকে আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ হিসেবে পরিচয় করালেও পাঠকের ওপর তিনি দখল নিতে পেরেছেন বর্ণনা, ভাষা আর নিজস্ব বৈশিষ্টে্যর কৌশলে। তিনি প্রথাগত ব্যাকরণ মানেননি। লিখেছেন আপন গতিতে। হিন্দি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি ভাষার শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন, অলংকার প্রভৃতি তার ভাষাশৈলীর কারুকাজকে আরো নন্দিত করেছে। গল্পের প্লট, সূচনা, পরিণয় সাদামাটা হলেও এতে ভাষার অভিনবত্ব রয়েছে। তেমনি রয়েছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংযোজনও। যা একালের হিন্দিসাহিত্যকে অনেকটা উঁচু মাত্রায় দাঁড় করিয়েছে। উপন্যাসের গল্পে এক অশীতিপর মা-মেয়ের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত হয় আরোও কিছু পারিপার্শ্বিক চরিত্র—রোজি ভাই, কেকে, বিলকিস বানু, রাজা মাস্টার।

মার্কিন লেখক ও অনুবাদক ডেইজি রকওয়েল ‘রেত সমাধি’ উপন্যাসকে হিন্দি থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন। নাম দিয়েছেন টম্ব অব স্যান্ড। ২০২১ সালে লন্ডনের এক্সিস প্রেস এবং ভারতের পেঙ্গুইন বুকস ৬৯৬ পৃষ্ঠার এই অনুবাদ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। হিন্দি ভাষায় এই উপন্যাস আত্মস্থ করেই অনুবাদে নামেন তিনি। সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসি ভাষার শব্দ যেমন অসাধারণ এ অনূদিত গ্রন্থে সংযোজন করেছেন, যোগ করেছেন নবরসও।

টম্ব অব স্যান্ড পাঠে পাঠক মনে উদিত হতে পারে ‘বর্ডার’ শব্দটির বহুল ব্যবহার, তার নানা অন্তর্নিহিত অর্থ, ব্যঞ্জনা। সীমারেখা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, লৈঙ্গিক, বয়স, ভৌগোলিক এমনকি ভাষাতাত্ত্বিক অঙ্গনেও হতে পারে; তাই এ শব্দটিও এ উপন্যাসে শৈল্পিক বেশে অন্তর্নিহিতভাবে ব্যবহূত হয়েছে। গীতাঞ্জলি শ্রী এসব নিয়ে চমত্কার শব্দ-নৃত্য-তরঙ্গ দেখিয়ে শুধু আন্তর্জাতিক সম্মাননা নিলেন না, ভারতীয় উপমহাদেশের যে কোনো আঞ্চলিক ভাষা সাহিত্য অঙ্গনকে আরো প্রসারিত হওয়ার দ্বার খুলে দিলেন।

gitanjale sree

গীতাঞ্জলি শ্রী দিল্লির বাসিন্দা। এর আগে বেশ কিছু উপন্যাস এবং ছোটগল্প লিখেছেন। গত শতকের সত্তরের দশক। গীতাঞ্জলির বয়স তখন উনিশ। তার বাবা ১০০ টাকার একটা নোট হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা নিয়ে তুমি যা ইচ্ছে করতে পার।’ তখন ১০০ টাকারও অনেক দাম। সেই বাবাই তাকে বিয়ের শর্ত দিয়েছিলেন, ‘যাকে খুশি বিয়ে করতে পার। তবে ছেলেটিকে ব্রাহ্মণ হতে হবে, সঙ্গে আইএএস।’ ঝরঝরে ইংরেজি লিখতে পারেন। হঠাত্ একদিন মনে হলে, হিন্দিই তাঁর সাহিত্য রচনার জন্য সুবিধাজনক। ২০১৮ সালে প্রকাশিত গীতাঞ্জলির ‘রেত সমাধি’ নামের হিন্দি উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ ‘টুম্ব অফ স্যান্ড’। মার্কিন অনুবাদক ও লেখক ডেইজি রকওয়েল বইটির অনুবাদ করেছেন। তাঁর হাত ধরে ভারতীয় ভাষায় লেখা কোনো বই পেল প্রথম বুকার প্রাইজ। এর আগে অরুন্ধতী রায় ‘দ্য গড অব স্টল থিংকস’ এবং অরবিন্দ আদিগা তাঁর ‘হোয়াইট টাইগার’ উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পেয়েছিলেন। তবে এই দুটি উপন্যাসই ছিল সরাসরি ইংরেজিতে লেখা।

‘টম্ব অব স্যান্ড’-এ যে গল্পটি গীতাঞ্জলি শুনিয়েছেন, তার মূল সুর হলো—পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে!...’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ৮০ বছরের এক বৃদ্ধা। প্রেক্ষাপট দেশভাগের। ছত্রে ছত্রে কাঁটাতারের রক্তাক্ত যন্ত্রণা। স্বামী হারানোর পর ঐ বৃদ্ধা সংসার- সন্তানের আপত্তি ফুত্কারে উড়িয়ে দিয়ে যেতে চান পাকিস্তানে। দেশভাগের ক্ষতের মধ্যে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা আর একজন নারীর উপলব্ধির পরিপূর্ণতাই ফুটে উঠেছে গীতাঞ্জলির দীর্ঘ উপন্যাসে। বুনোট, নিশ্বাসের ওঠাপড়ার মতো এগিয়ে যাওয়া এই উপন্যাস সম্পর্কে বুকারের ‘চেয়ার অফ জাজেস’ ফ্র্যাঙ্ক ওয়াইন বলেছেন, ‘ক্যালাইডোস্কোপের কাচের মধ্যে দিয়ে সম্পর্ক, বয়স, নারী, পুরুষ, পরিবার এবং সর্বোপরি একটা দেশ, একটা জাতিকে দেখানো হয়েছে এই উপন্যাসে। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দেশভাগের প্রেক্ষাপটে জ্বলন্ত দলিল এটি।’

আর গীতাঞ্জলি শ্রী বুকার পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছেন— ‘বুকার পাব বলে কখনো কল্পনাও করিনি। পেতে পারি বলে মনেও হয়নি। এটা অসম্ভব একটা পাওনা। আমি অভিভূত, আনন্দিত, সম্মানিত এবং বিনীত।’ মো. রেজাউল করিম