তিব্বতে কৈলাস মানস-সরোবরে হিন্দুরা দীর্ঘদিন ধরেই তীর্থে যান। সরকার তার পুরো ব্যয় বহন না করলেও, বড় টাকা ভর্তুকি দেয়।
দেশের বাইরে চারটি তীর্থ ভারতে খুবই আলোচিত। তিব্বতে কৈলাস-মানসসরোবর তীর্থ হিন্দুদের কাছে খুবই পবিত্র। শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান কর্তারপুর। যা এখন পাকিস্তানের অন্তর্গত। পাকিস্তানের বালুচিস্তানে আছে হিন্দুদের আরেক পবিত্র তীর্থস্থান হিংলাজ। আর মুসলিমদের পবিত্র তীর্থ হজ।
স্বাধীনতার পর থেকে ভারত সরকার প্রায় কখনোই কোনো তীর্থযাত্রীকে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে তীর্থে পাঠায়নি। তবে ভর্তুকি দেওয়ার রীতি চালু আছে। সম্প্রতি সেই রীতি নিয়েই বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ, হজের ভর্তুকি বন্ধ করে দিলেও বাকি তীর্থগুলির ভর্তুকি বন্ধ করেনি সরকার, বরং বাড়িয়েছে।
ভর্তুকি বিতর্কের আলোচনায় ঢোকার আগে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করে নেয়া দরকার। হিন্দু তীর্থ মানস-সরোবর যাত্রায় সরকার ভর্তুকি দিলেও হিংলাজের ক্ষেত্রে তেমন কোনো রীতি নেই। কারণ, খুব কম ভারতীয়ই বালুচিস্তানে হিংলাজে যেতে পারেন। ২০১৪ সালে এ বিষয়ে সংসদে
এক প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জেনারেল ভি কে সিংহ বলেছিলেন, ১৯৭৪ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে প্রোটোকল চুক্তি হয়েছিল, সেখানে দুই দেশের তীর্থস্থানের একটি তালিকা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেখানে হিংলাজ ছিল না। পরবর্তীকালে ভারত সরকার হিংলাজকে ওই তালিকায় ঢোকানোর আবেদন জানিয়েছিল পাকিস্তানকে। কিন্তু পাকিস্তান কোনো উত্তর দেয়নি। সম্প্রতি বিজেপি হিংলাজ করিডোর করার দাবিও জানিয়েছে। কিন্তু এখনো তা আলোচনার স্তরে আছে। ফলে হিংলাজ তীর্থে ভারত সরকার কোনো ভর্তুকি দেয় না।
ভারতে কেবল কেন্দ্রীয় সরকার ভর্তুকি দেয় না, রাজ্য সরকারগুলিও বিভিন্ন খাতে তীর্থ-ভর্তুকি দিয়ে থাকে। আর সেই ভর্তুকি নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, ১০ বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে হজের ভর্তুকি কমাতে হবে। এবং সেই অর্থ মুসলিম নারীদের শিক্ষায় ব্যয় করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার হজের ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই একই যুক্তিতে মানস সরোবর যাত্রার ভর্তুকি বন্ধ করেনি। তথ্য বলছে, ২০২২ সালে বিভিন্ন রাজ্য সরকার মানস সরোবর যাত্রার ভর্তুকি বাড়িয়েছে।
২০২২ সালের মানস সরোবর যাত্রার জন্য সবচেয়ে বেশি খরচ করছে যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশ। আগের চেয়ে ভর্তুকির হার কয়েকগুণ বাড়িয়ে করা হয়েছে জনপ্রতি এক লাখ টাকা। রাজস্থানেও ভর্তুকির পরিমাণ সমান। হরিয়ানা সেখানে ভর্তুকি দেয় ৫০ হাজার টাকা। কর্ণাটক দেয় ৩৫ হাজার টাকা। গুজরাতে দেওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা। প্রশ্ন উঠেছে, উত্তরপ্রদেশ কিংবা রাজস্থান কেন এই পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে? কেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে না? হজের যুক্তিতেই কি এই ভর্তুকিও বন্ধ হওয়া উচিত নয়?
শিখরাও এ প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের প্রশ্ন, হজ বা মানস সরোবর যাত্রায় যদি ভর্তুকি দেওয়া হয়, কর্তারপুরে কেন দেওয়া হবে না। যদিও কর্তারপুর ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র চার কিলোমিটার ভিতরে। ভারত-পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে সেখানে একটি করিডোর তৈরি করা হয়েছে। ভিসা ছাড়াই শিখ তীর্থযাত্রীরা সেখানে ঢুকতে পারেন।
ধর্ম নিয়ে গত কয়েকবছরে তোলপাড় হচ্ছে ভারতীয় রাজনীতি। ভর্তুকির প্রশ্নটিও তা-ই বার বার রাজনৈতিক ময়দানে চলে আসছে।