আজ দেশের পপগুরু আজম খানের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী। কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা বিশেষ কোনো আয়োজন চোখে পড়েনি। কিংবদন্তীদের কত যত্নে লালন করতে হয় তা হয়তো ভুলে গেছে ভিউগোনা গণমাধ্যম। বরেণ্য এ কণ্ঠশিল্পী, মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে এই বিশেষ লেখা পাঠকদের জন্য:
আমার দৃষ্টিতে আজম খান ছিলেন একটা সত্যিকারের সাধারণ মানুষ। যার কোনো উচ্চাঙ্ক্ষা ছিল না। আমরা অসাধারণ। কারণ আমাদের নানা চাহিদা আছে। কিন্তু আজম খানের সেই চাহিদা কখনোই ছিল না। বাড়ি ভাড়া আর গান করে যা পেতেন তাতেই খুশি ছিলেন। অনেক মজার মানুষ ছিলেন। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আড্ডা দিতেন, গান করতেন। সকালে নিজে বাজার করে নিজেই রান্না করতেন। কোনোকিছুর প্রতি তার মোহ ছিল না। অল্পতেই খুশি থাকা একজন মানুষ ছিলেন আমার চাচ্চু। ছোট ছোট ইস্যু দিয়েই তাকে খুশি করা যেত। তার এই গুণটি আমি পেয়েছি। আমাকেও খুশি করা খুব সহজ।
তিনি কখনোই কিছু প্রাপ্তির আশা করে গান গাইতেন না। তিনি গান করতেন নিতান্তই ভালোলাগা, ভালোবাসা থেকে। চাচ্চুর সাথে আমার অসংখ্য ভুলতে না পারা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একসঙ্গে খেলাধুলা, খেলা দেখা, আড্ডা হতো আমাদের। একদিন খেলতে গিয়ে আমরা দুই ভাই এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে গোণ্ডগোল করেছিলাম। চাচ্চু বিষয়টি এমনভাবে সমাধান করলেন যে, আমরা অবাক হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, ‘কাল থেকে তোমরা দুই ভাই আর ওখানে খেলতে যাবে না। আমি যেখানে খেলি সেখানে যাবে।’ আমি বললাম, এটা কোনো সমাধান হলো? তিনি বললেন, ‘এটাই শ্রেষ্ঠ সমাধান।’ আসলে তার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো বলে বোঝানো সম্ভব না। এখনও পারিবারিক আলোচনায় বাবা চাচ্চুর নানা কথা বলেন। কারণ চাচ্চুকে তো বাবাই গানে এনেছিলেন। তাই তার প্রতি অন্যরকম এক দাবি, ভালোবাসার জায়গা বাবার মাঝে রয়েছে। চাচ্চু আমার সুরে গান করেছিলেন।
আজম খান ও হাসানের ডুয়েট ‘রঙের ঘুড়ি’ অ্যালবামে আমার ৬টা গান ছিল। এছাড়া ‘দুই বেয়াইয়ের কীর্তি’ ছবি আজম চাচ্চু, হাসান ও বিপ্লব ভাই আমার একটি গান গেয়েছিলেন। চাচ্চু সাথে প্রফেশনালি খুব বেশি আলোচনা হতো না। তবে তিনি আমাকে সবসময় বলতেন, সহজ কথা সহজ সুরে গান করতে। যেন সবাই বুঝতে পারেন। তিনি অনেকবারই বলেছেন, মানুষ বুঝতে পারবে না, এমন কিছু করো না। এখন তো অনেকেই আমাকে বলেন, তার গানগুলো রিমেক করতে। কিন্তু আমার সেই যোগ্যতা নেই। শুধু আমার চাচ্চু আজম খানের গান না, কোনো শিল্পীর গানই আমি রিমেক করতে চাই না। কারণ গানটি তিনি ভালোবেসে তৈরি করেছেন বা গেয়েছেন, সেটা আমি কেন রিমেক করতে যাবো। তবে তার গান লাইভ কাভার করা যেতেই পারে। সেটা রেকর্ডেড না। একটি অনুষ্ঠানে গেলাম, কেউ অনুরোধ করলেন তার গান গাওয়ার জন্য। তখন না হয় দু-একটা গান গাওয়া যেতে পারে।
আর শিল্পী আজম খানের ফাউন্ডেশন নিয়ে বলবো, নানা ব্যস্ততার কারণে ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আমি যুক্ত হতে পারিনি। তবে আমি চাই তার ফাউন্ডেশন ভালোভাবে পরিচালিত হোক। আমার চাচার যত গান রয়েছে সবগুলো গানের কপিরাইট তার সন্তানদের মানে আমার ভাইবোনদের করা উচিত। তার গানগুলোর আর্কাইভ থাকুক এটা মনে প্রাণে চাই। এছাড়া রয়্যালিটির বিষয়টিও পরিস্কার করা দরকার বলে আমি মনে করি।
লেখক : আজম খানের ভাতিজা, সুরকার ও সংগীত পরিচালক