কেবল একটি পৃথিবী

আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘Only One Earth’। এর বঙ্গানুবাদ হতে পারে ‘কেবল একটি পৃথিবী’।

এ বছর স্বাগতিক দেশ হিসেবে কাজ করছে সুইডেন। এবার দিনটির স্লোগান করা হয়েছে ‘প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি রেখে টেকসই জীবন যাপন করা’। বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে ইউএনইপির ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদ্যাপন করছে। ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটিই ইতিহাসের প্রথম পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘ স্টকহোম সম্মেলনের প্রথম দিন ৫ জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের বুকে প্রকৃতির অবদান বোঝাতে এবং প্রকৃতির অবদান সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে শুরু হয় এই উদ্যাপন।

এ বছর দিবসটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, স্টকহোমের জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলনের তথা ইউএনইপির ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে এ বছর। ১৯৭২ সালে স্টকহোম সম্মেলনের স্লোগান ছিল ‘ঙহষু ড়হব বধত্ঃয’। ৫০ বছর পর এবারও একই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করতে হয়েছে। অর্ধশতাব্দী পরেও আমরা সমভাবে বুঝতে পারছি মহাবিশ্বে পৃথিবীই আমাদের একমাত্র বাসস্থান। ধরিত্রী তার সীমিত সম্পদ নিয়ে আমাদের রক্ষা করতে সচেষ্ট। আমাদেরও এর স্বাভাবিকতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে অবশ্যই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত ইউএনইপির ‘প্রকৃতির সঙ্গে শান্তি স্থাপন’ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে, যে পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের উন্নতি হবে, প্রকৃতির মূল্যমান আমরা বুঝতে পারব এবং এর মূল্যায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আন্তরিকতার কেন্দ্রবিন্দু হতে।’ জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক লাঙ্গার অ্যান্ডারসন বলেছেন, ‘আশা করা গিয়েছিল, কোভিড-১৯ মহামারির এত প্রকটতার পর পৃথিবীতে ২০২২-এ আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাব। কিন্তু আমরা দেখছি পৃথিবী নামক গ্রহটি জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতি ধ্বংস এবং পরিবেশদূষণের ত্রিমুখী সংকটে জর্জরিত।’

১৯৭২ সালে ‘কেবল একটি পৃথিবী’ স্লোগান নিয়ে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ৩৮৫ কোটি। জাতিসংঘের হিসাবে ২০২১ সালে এই সংখ্যা হয়েছে ৭৯০ কোটি। ৫০ বছরের ব্যবধানে শুধু জনসংখ্যার বিচারে দুটি পৃথিবী প্রয়োজন। কিন্তু পৃথিবী তো আমাদের একটাই। প্রাকৃতিক বা মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে মানুষ বাস্ত্তচু্যত হলে অন্যত্র অভিপ্রয়াণ করতে পারে। আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে আমাদের অন্যত্র অভিপ্রয়াণের সুযোগ নেই। তাই মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই যে কোনো মূল্যে এই গ্রহকে স্বাভাবিকভাবে টিকিয়ে রাখতে হবে।

আমাদের একমাত্র বাসস্থান এই পৃথিবী এবং তত্সংলগ্ন পরিবেশের মূল উপাদান মাটি, পানি ও বাতাস। মানুষের মৌলিক চাহিদাসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু আমরা এই তিন উপাদান বা এর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বা এদের ভেতরে টিকে থাকা জীবকুল থেকে পেয়ে থাকি। প্রাকৃতিক পরিবেশের মূল উপাদানগুলোর পরিমাণ সসীম এবং সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে বিন্যস্ত। এই সুশৃঙ্খল অবস্থায় প্রকৃতি আমাদের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও উন্নয়নের অভিঘাতে প্রকৃতি আজ সংকটের আবর্তে জর্জরিত, পরিবেশ হয়ে পড়ছে মারাত্মকভাবে দূষিত। সহজ কথায়, পরিবেশদূষণ বলতে আমরা বুঝি ‘আমাদের মাটি, পানি ও বাতাসের ভৌত, রাসায়নিক বা জীবতাত্ত্বিক বৈশিষ্টে্যর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন, যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর অথবা অন্য যে কোনো জীবের জন্য ক্ষতিকর।’

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান তার নিজের পুঁজি বা মূলধন খাটিয়ে প্রাপ্ত লভ্যাংশ থেকে বিভিন্ন প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। মূলধন খরচ করে ফেললে সেই প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে বাধ্য। বিশ্ববাসীর এখন উচিত হবে পৃথিবীর পরিবেশের মূল উপাদানগুলোকে মূলধন বিবেচনা করে সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন মেটানো। ধরিত্রীকে স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে দিয়ে নিজেরা টিকে থাকা। বিগত অর্ধশতাব্দী যাবত্ পরিবেশদূষণ রোধসহ ধরিত্রী রক্ষার ব্যাপারে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আশান্বিত হওয়ার মতো ফলাফল খুব সামান্যই। গত ১০০ বছরে কার্বন নিঃসারণের পরিমাণ প্রায় ১৯ গুণ বেড়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে ১৫ সেন্টিমিটার, ৬০ শতাংশ জীব প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে।

রেইন ফরেস্টগুলো পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে কাজ করে। নানা কারণে রেইন ফরেস্টসহ অন্যান্য বনভূমির ধ্বংস বেড়েই চলেছে। ১২টি রেইন ফরেস্টের মধ্যে সর্ববৃহৎ আমাজনের আয়তন সত্তরের দশক পর্যন্ত ৫৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার থাকলেও বর্তমানে সেটির আয়তন ৪১ লাখ বর্গ কিলোমিটারের নিচে। ২০১৯ সালের আমাজন রেইন ফরেস্টে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডে বনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবেশদূষণের একটা মারাত্মক প্রভাব আমরা দেখছি বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি বছর বিশ্বে ৪.২ থেকে ৭ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় বায়ুদূষণের কারণে, যাদের প্রতি ১০ জনের ৯ জনই অতি উচ্চমাত্রার দূষক পদার্থযুক্ত বায়ুতে শ্বাস নেয়। গত বছর স্যাটেলাইটের ছবিতে ঢাকার আকাশে অতিরিক্ত মিথেন গ্যাস নির্গমনের খবর আমাদের আতঙ্কিত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আবর্জনার স্তূপ থেকে এটি হয়ে থাকতে পারে। পরিকল্পিতভাবে গৃহস্থালির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়োগ্যাস ও জৈব সার উত্পাদন করে পরিবেশদূষণ রোধসহ আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। বেশ কিছুদিন থেকে আমাদের দেশে অপচনশীল প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে মাটি দূষণের সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে উদ্ভিদ জন্মানোর ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। পলিথিন নিষিদ্ধের পাশাপাশি আমাদের দেশের পাট ব্যবহার করে স্বল্পমূল্যে পাতলা ও সহজে ব্যবহারের উপযোগী ব্যাগ তৈরির ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। গত চার-পাঁচ দশক ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশসংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা, কর্মশালা, সম্মেলন চলছে। অন্যদিকে পরিবেশদূষণ, বিশ্ব ঊষ্ণায়নের মাত্রা বৃদ্ধিও অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে বিশ্ববাসী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় নিদারুণভাবে প্রত্যক্ষ করছে। শিল্পসমৃদ্ধ, উন্নত ও ধনী রাষ্ট্রগুলো এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ী। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলো ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কার্বন নিঃসারণের মাত্রা কমিয়ে আনার ব্যাপারে শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি পালন করছে না। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য ধনী রাষ্ট্রগুলো প্রতিশ্রুত অর্থসহায়তা প্রদানের ব্যাপারে গড়িমসি করছে। ফলে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। মহাবিপর্যয় নেমে এলে ধনীদরিদ্র-নির্বিশেষে কেউই রক্ষা পাবে না।

হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসলীলা এখনো বিশ্ববাসী ভুলে যায়নি। এরই মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মানুষ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। ইউএনইপির সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই, পরিবেশদূষণ রোধ তথা বিপর্যয় মোকাবিলা করার জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সর্বোচ্চ মহলের অন্তরের অন্তস্তল থেকে সততার সঙ্গে দৃঢ়চেতা মনোভাব নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ব্যক্তি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় তথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদক্ষেপ নিতে হবে কালবিলম্ব না করে। মহাবিপর্যয় নেমে এলে আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব। কারণ আমাদের আশ্রয়স্থল পৃথিবী মাত্র একটিই।

লেখক: পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল