বড় আকারে সয়াবিন চাষ কেন নয়?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ভোজ্য তেলের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশে সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, পাম ওয়েল, রাইচবার্ন ওয়েল, তিলের তেল, সান ফ্লাওয়ার ওয়েল ব্যবহূত হয়ে থাকে। তবে আমাদের দেশে সরিষার তেল, সয়াবিন তেল এবং পাম ওয়েল বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সরিষার তেলের চাহিদা স্থানীয়ভাবে মেটানো হয়। তবে সয়াবিন এবং পাম ওয়েল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে সয়াবিন তেলের ব্যবহার বেশি হওয়ার কারণে লাখ লাখ টন সয়াবিন তেল আমদানি করতে হয়। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়ে থাকে।

বর্তমানে দেশে ভোজ্য তেলের দাম অত্যধিক বেড়ে গেছে। যা নাকি ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। দেশে সয়াবিনের উৎপাদন কম থাকার কারণে আমাদের বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সয়াবিন তেল সয়াবিন বীজ থেকে উত্পন্ন হয়। আমাদের দেশে সয়াবিনের চাষ হচ্ছে সীমিত আকারে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সয়াবিনের চাষ হচ্ছে। তবে দেশে উৎপাদিত সয়াবিন আমাদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে না। কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, যদি ব্যাপক ভিত্তিতে দেশে সয়াবিনের চাষ করা যায় তবে সয়াবিন তেলের মোট চাহিদার ৪০ ভাগ পূরণ করা যাবে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে সারা বছরে ভোজ্য তেলের চাহিদা হচ্ছে ১৩ লাখ মেট্রিকটন। এরমধ্যে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ লাখ টন সরিষার তেল দিয়ে পূরণ হয়। বাকি ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণ হয় আমদানিকৃত সয়াবিন তেল এবং পাম ওয়েল দিয়ে। আমাদের দেশে সয়াবিনের চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

এদেশের মাটি এবং জলবায়ু সয়াবিন চাষের জন্য উপযুক্ত। ইতিমধ্যে আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে সয়াবিনের চাষ হচ্ছে। ২০০৫ সাল থেকে আমাদের দেশে সয়াবিনের চাষ শুরু হয়। বর্তমানে দেশের ১৬ জেলার ২৯টি উপজেলায় সয়াবিন চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বরিশাল, ভোলা, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, মেহেরপুর, যশোর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর জেলা। আমাদের দেশের চরাঞ্চলে সয়াবিন বেশি উত্পন্ন হয়ে থাকে। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরে বেশি পরিমাণে সয়াবিন উৎপাদিত হয়ে থাকে।

সয়াবিন চাষে সরকারি সাহাঘ্য-সহযোগিতার মাধ্যমে ৭-৮ লাখ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ করলে ১৭-১৮ লাখ টন সয়াবিন উৎপাদিত করা সম্ভব। আমাদের দেশের অধিকাংশ চাষি সয়াবিন চাষের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ। তাদের এ ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সয়াবিন চাষের ব্যাপারে চাষিদের উত্সাহিত করার লক্ষ্যে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে চরাঞ্চলে সয়াবিন চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। অনাবাদি জমি আবাদ করে সয়াবিন চাষের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে হবে। বর্তমানে আমাদের দেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সয়াবিন আমদানি করা হয়। সেই সঙ্গে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করা হয়। এতে দেশের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আমাদের দেশে ব্যাপক ভিত্তিতে সয়াবিনের চাষ করা হলে দেশে সয়াবিনের চাহিদা অনেকখানি পূরণ হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় বন্ধ হবে।

দেশে বিভিন্ন জাতের সয়াবিন উৎপাদিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে সোহাগ নামের সয়াবিনের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর মধ্যে সয়াবিন উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৫তম। বর্তমানে আমাদের দেশে সারা বছরে ১০ লাখ টন সয়াবিন উৎপাদিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে ৬০ ভাগ সয়াবিন উৎপাদিত হয় লক্ষ্মীপুরে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চলে ৪ লাখ ২ হাজার একর জমিতে সয়াবিন চাষ করতে ২ হাজার ৭৩০ টন বীজের প্রয়োজন হয়।

এখানকার ১০ থেকে ১২টি চরের ৫ হাজার ভূমিহীন কৃষককে সয়াবিন চাষের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানকার কৃষকরা বিএডিসি থেকে সয়াবিনের বীজ সংগ্রহ করে থাকেন। আবার অনেকে বাজার থকে বীজ সংগ্রহ করে চাষ করে থাকেন। প্রতি কেজি সয়াবিন বীজের মূল্য ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। সয়াবিনের বীজ নিয়ে কৃষকদের অনেক সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সয়াবিন চাষের উপযুক্ত সময় হলো ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত। কিন্তু কিছু কিছু উৎসাহী চাষি আমাদের দেশের চরাঞ্চলে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসে সয়াবিনের বীজ বপন করে থাকে। সয়াবিনের চাষ পদ্ধতি একেবারে সহজ। সয়াবিন দিয়ে শুধু তেল তৈরি হয় তা নয়। সয়াবিন দিয়ে বিস্কুট, সয়ামিল্ক, সয়ামিট, সয়ানাগেট, সয়াসসেসসহ বিভিন্ন ধরনের রুচিশীল খাবার তৈরি হয়ে থাকে। সয়াবিন গোখাদ্যে এবং পোলট্রি ফিডেও ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সয়াবিনের চাষ বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এটা করা গেলে বিভিন্ন দেশের ওপর সয়াবিন নির্ভরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।

লেখক: নিবন্ধকার