‘হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী, দাও সেই তপোবন পুণ্যছায়ারাশি...দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।’ বহুকাল পূর্বে এই আকুতি জানাইয়াছিলেন কবিগুরু। বিশ্বকবির সেই আবেদন উপেক্ষিত হইয়াছে। একবিংশ শতাব্দীর রঙিন বিশ্বে কংক্রিটের স্তূপে চাপা পড়িয়াছে সবুজ অরণ্য। অবহেলা-অরাজকতায় বিলীন হইয়াছে অধিকাংশ খেলার মাঠ, পার্ক, উন্মুক্ত ফাঁকা জায়গা। অথচ সুস্থ বিনোদনের ‘পীঠস্থান’ হিসাবে গণ্য হইয়া থাকে এইগুলি। মেধা-মনন বিকাশে ইহাদের বিকল্প নাই—সচেতন ব্যক্তিমাত্রই এই সত্য উপলব্ধি করিতে পারেন।
সকল যুগেই স্বীকৃত হইয়া আসিতেছে—আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের জন্যই খেলার মাঠ, পার্ক সমভাবে জরুরি। নয়া সভ্যতার আধুনিক সমাজে দাঁড়াইয়া এই যুক্তির যথার্থতা অতিমাত্রায় উপলব্ধি করিতেছি আমরা। নির্বিচারে খেলার মাঠ ধ্বংসের মাসুল হিসাবে এই প্রজন্মের সুস্হ-স্বাভাবিক বাড়িয়া উঠিবার পথ কণ্টকাকীর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমেদ এক বক্তৃতায় বলিয়াছিলেন, ‘এই যে খেলার মাঠ সব দখল হয়ে যাচ্ছে, ছেলেরা সব কই যাবে? রাস্তাঘাটে ঘুরবে, অকারণে বাজারে যাবে, মানুষের পকেটে হাত ঢোকাবে।’ এই উক্তি আজ সত্যে পরিণত হইয়াছে। সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমগুলি সংকুচিত হইয়াছে। নির্বিচার দখলের কবলে পড়িয়া অধিকাংশ খেলার মাঠ নিশ্চিহ্ন হইয়াছে, জরাজীর্ণ অবস্থা অবশিষ্টগুলির। এই চিত্র সারা দেশেই। রাজধানী ঢাকাসহ নগর-মহানগরগুলোর খেলার মাঠ, পার্ক বিলুপ্ত হইয়াছে জ্যামিতিক হারে।
বিশেষ করিয়া, বিগত দুই-তিন দশককালে নির্বিচারে ধ্বংস করা হইয়াছে খেলার মাঠ-পার্ক-উন্মুক্ত প্রান্তর। ফলে এই প্রজন্ম আঁকড়াইয়া ধরিতেছে অসুস্থ বিনোদন। সুস্থ বিনোদনব্যবস্থার অভাবহেতু বিকলাঙ্গ সংস্কৃতির হাত ধরিয়া পশ্চাতপথে হাঁটিতেছে এই প্রজন্ম। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ সমাজের অধিকহারে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াইয়া পড়িবার যে প্রবণতা পরিলক্ষিত হইতেছে, তাহার অন্যতম কারণ অপসংস্কৃতি—অসুস্থ বিনোদন চর্চা। সুস্থ বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকিলে তাহারা জীবনমুখী হইত, অপরাধে জড়াইবার সুযোগ থাকিত কম। খেলার মাঠসহ বিনোদনমূলক মাধ্যমগুলি বিনষ্ট করিয়া তাহাদেরকে যে অন্ধকারে নিক্ষেপ করা হইয়াছে, সমাজকে এখন তাহার মাসুল গুনিতে হইতেছে।
গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ হাজার মানুষের জন্য একটি খেলার মাঠ থাকার কথা, যেইখানে প্রতিটি মাঠের আয়তন হইতে হইবে কমপক্ষে এক একর। অথচ এই অনুপাতের বিপরীতে রাজধানীতে খেলার মাঠ রহিয়াছে প্রয়োজনের শতকরা এক ভাগেরও কম। কী অদ্ভুত কথা! রাজধানীতে এখন খেলার মাঠের সংখ্যা সাকুল্যে ৪০টির মতো। দেশের সর্বত্রই একই রকম চিত্র। খেলাধুলার পরিবেশের এই অপর্যাপ্ততা মানুষকে আবদ্ধ করিয়া ফেলিতেছে সংকীর্ণ বলয়ে। প্রযুক্তিপণ্যে তাহারা বিনোদনের আশ্রয় খুঁজিয়া লইতেছে; ডিভাইসে অতি আসক্ত হইয়া পড়িতেছে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণ-তরুণীর মধ্যে বাড়িতেছে প্রযুক্তিপণ্যের অপব্যবহার। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াইয়া পড়িতেছে তাহারা।
সাম্প্রতিক সময়ে বড় অপরাধকর্মে নাম আসিতে দেখা যাইতেছে অপ্রাপ্তবয়স্কদের—ইহার জন্য দায়ী সাংস্কৃতিক অপঘাত: খেলার মাঠের বিনাশ, সুস্থ বিনোদনের অভাব, প্রযুক্তিপণ্যের অপব্যবহারের মাধ্যমে ‘অপসংস্কৃতির চর্চা’। এর দায় সমাজের কতিপয় অপরিণামদর্শী ব্যক্তি-গোষ্ঠীর। উপরন্তু পরিবারের পাশাপশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এক্ষেত্রে নির্বিকার; সুস্থ-স্বাভবিক পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যর্থতার দায় বর্তায় তাহাদের উপরও। যত্রতত্র গজাইয়া উঠিয়াছে শিক্ষালয়। নামসর্বস্ব সাইনবোর্ডে আবাসিক ভবনেই চলিতেছে শিক্ষাকার্যক্রম—নাই ক্যাম্পাস, বিনোদনের ব্যবস্থা, সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম। একইভাবে দেশের ক্রীড়া হইতে ইনডোর গেম জাতীয় বিনোদন ব্যবস্থাগুলিও বিলুপ্ত হইয়াছে। এই চিত্র মানিয়া লওয়া দুষ্কর।
এমতাবস্থায়, অন্ধকার অপসংস্কৃতি হইতে এই প্রজন্মকে বাহির করিবার স্বার্থে সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে সত্ত্বর ভাবিতে হইবে। ডিভাইসের পরিমিত, প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার নিশ্চিতে পরিবার—অভিভাবককে দায়িত্ব লইতে হইবে। সহশিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি বইপড়া, ভ্রমণ জাতীয় উদ্যোগ ছাড়াও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করিতে হইবে। অপসংস্কৃতি হইতেই সকল অপকর্ম ঘটিতেছে বিধায় এই প্রবণতা রুখিতে প্রাথমিক উদ্যোগ হিসাবে তাই সর্বাগ্রে জরুরি খেলার মাঠ, পার্ক, বিনোদনের স্থানগুলির সংরক্ষণ।