মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি আর বৈশ্বিক সংকটের চাপ নিয়ে আসছে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বাজেট বাস্তবায়নে ঘাটতির আকার বড় হলেও এবার সাড়ে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। সে হিসাবে এবার এই লক্ষ্য আরও বাড়ানো হচ্ছে।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম। এর পরও আসছে অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখার প্রত্যাশা নিয়ে নতুন বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ইতিমধ্যে বাজেট প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী। এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’, অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এবারের বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরে যা ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে নতুন বাজেটের আকার বাড়ছে ৭৪ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয়ের বিপরীতে অর্থের সংস্থান সেভাবে বাড়ছে না। সেজন্য ঘাটতি অর্থায়নের ওপর চাপ বাড়বে। সরকার আয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরকে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। চলতি বাজেট থেকে এটি ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এনবিআর-বহির্ভূত কর থেকে আদায় করা হবে ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত প্রাপ্তি খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে ৩ হাজার ২৭১ কোটি টাকা বিদেশি অনুদান পাওয়া যাবে বলে বাজেটে উল্লেখ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে বাজেটে ঘাটতিই থাকবে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা (অনুদানসহ)। যা জিডিপির অংশ হিসাবে সাড়ে ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। সে হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে। নতুন অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারকে বেশি নির্ভর করতে হবে ব্যাংক খাতের ওপর। এই খাত থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ৬৮ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া হবে ৩৮ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্য ছিল ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কেননা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ অনেকটাই আমদানি নির্ভর দেশ। রপ্তানি পণ্যের কাঁচামালসহ নিত্যপণ্যের বড় আমদানি করা হয় প্রতি বছর। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের বেশি। গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। এর পরও আগামী অর্থবছর গড়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে মূল্যস্ফীতির হার বেঁধে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। অবশ্য গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে চাপ রয়েছে। তবে সব শ্রেণির মানুষ যাতে উপকৃত হন, এভাবে তিনি বাজেট প্রণয়ন করছেন। ছোট-মাঝারি ও বড় শিল্প উদ্যোক্তারা সবাই উপকৃত হবেন। সাধারণ মানুষের কষ্ট হবে এমন কিছু বাজেটে চাপিয়ে দেবেন না বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি।