মে’র পদত্যাগেও কাটছে না ব্রেক্সিট সংকট

ব্রিটেনে ব্রেক্সিটের অঙ্গীকার রক্ষা করতে না পেরে অবশেষে দলের নেতৃত্ব ছাড়লেন থেরেসা মে। এর মাধ্যমে তাঁর প্রধানমন্ত্রীর পদও চলে গেল। এর আগে ব্রেক্সিট নিয়ে গণভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। যে আশায় তাঁরা পদত্যাগ করেছেন সেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের সম্পর্কের সংকট কাটেনি, বরং বাড়ছে। যদিও বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীরা আশ্বাস দিয়েছেন, ইইউ থেকে দেশ সঠিক সময়েই বেরিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা তাঁদের সফলতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

দলের নেতৃত্ব ছাড়লেন মে

ব্রিটেনের পত্রিকা দ্য সান জানিয়েছে, থেরেসা মে গতকাল টোরি ব্যাকবেঞ্চ ১৯২২ কমিটির কাছে চিঠি পাঠিয়ে দলীয় প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। চিঠিতে ব্রেক্সিট কিংবা দল নিয়ে কিছু বলেননি। তিনি পদত্যাগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেবেন না বলে জানা গেছে। কমিটির একটি সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। নিয়ম অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দলের পদ ছাড়লেই প্রধানমন্ত্রীর পদও চলে যায়। কিন্তু নতুন নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত আগের প্রধানমন্ত্রীই দায়িত্ব পালন করবেন। গত ২৪ মে চোখের পানিতে বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন থেরেসা মে। ব্রেক্সিট কার্যকর না করতে পেরে তিনি নিজের হূদয় ভাঙা কষ্টের কথাও জানিয়েছিলেন। তারপরও বিরোধী এমনকি নিজ দলের এমপিরা তিনবারেও তার প্রস্তাবিত ব্রেক্সিটে সমর্থন দেননি। উল্টো তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়।

ব্রেক্সিট জটিলতায় বিদায় নিতে হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ছিলেন ক্যামেরন। ২০১৬ সালে এ সংক্রান্ত গণভোটে হারার পর তিনিও তার অঙ্গীকার রক্ষা করতে পদত্যাগ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঠিক সময়ের মধ্যে ব্রেক্সিট কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছিলেন ক্যামেরন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে। গত ২৯ মার্চ ব্রেক্সিট কার্যকরের সময় শেষ হয়। এরপর ইইউর কাছে অনুরোধ জানিয়ে সময় বাড়ানো হয় যার মেয়াদ ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। সমস্যা যেখানে

ব্রিটেন একটা দ্বীপপুঞ্জ। ইউরোপ ও ব্রিটেনের মধ্যে সাগরই সীমান্ত। ব্যতিক্রম আছে। যেমন আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড মিলে আলাদা দ্বীপ। উত্তর আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের এবং আইরিশ প্রজাতন্ত্র পৃথক দেশ এবং ইইউর সদস্য। ব্রেক্সিটের পর এটা হবে ইউরোপ আর ব্রিটেনের স্থল সীমান্ত। ব্রিটেন ইইউ থেকে বের হলেও এই সীমান্তে কাস্টমস চৌকি বসাতে হবে। আয়ারল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের মধ্যে মানুষ ও পণ্যের মুক্ত চলাচল থাকবে না। গুড ফ্রাইডে চুক্তিতে নিশ্চিত করা আয়ারল্যান্ডের দুই অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপন্ন হতে পারে। এটা রোধ করতে ব্রেক্সিটের পরের জন্য থেরেসার পরিকল্পনায় ছিল ‘ব্যাকস্টপ’ ব্যবস্থা। অর্থাত্ দুই আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কোন ‘হার্ড বর্ডার’ বা ‘বাস্তব সীমান্ত’ থাকবে না, মানুষ ও পণ্যের অবাধ চলাচল আগের মতোই থাকবে। বিরোধীদের আপত্তি এর মাধ্যমে দেশের দুই অংশের জন্য দু’রকম নিয়ম হবে। ইইউ ছাড়লেও ব্রিটেনের উত্তর অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ড ইইউর আইনি কাঠামোতে থাকবে। এটা হতে পারে না। ব্যাকস্টপের সীমা বেঁধে না দেওয়ায় যুক্তরাজ্য চাইলেও একতরফাভাবে এ থেকে বের হতে পারবে না।

সফলতা নিয়ে সংশয়

রক্ষণশীল দলের ১১ এমপি প্রধানমন্ত্রী পদে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। দলের নেতা কে হবেন তা জানা যাবে ২২ জুলাই। নতুন নেতা নির্বাচিত হলে দেশটির রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর দৌঁড়ে এগিয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। বরিস জনসন ‘চুক্তিহীন’ ব্রেক্সিটের পক্ষে। সিএনএনের বিশ্লেষক লিউক ম্যাকগির মতে, ভবিষ্যত্ প্রধানমন্ত্রী ব্রেক্সিট সংকট কাটাতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। এমন কী কৌশল আছে যার মাধ্যমে নতুন প্রধানমন্ত্রী সফল হবেন? আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন তো আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। গত দুই বছর ধরে থেরেসা মে’র প্রতিনিধিরা ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তারা উভয়েই এ বিষয়ে সম্মত হয়েছেন, বর্তমান প্রস্তাবের চেয়ে ভাল বিকল্প নেই। ইতিহাস বলছে, এমন উত্তম প্রস্তাবও থেরেসা মে পার্লামেন্টে পাস করাতে তিনবার ব্যর্থ হয়েছেন।

প্রার্থীদের মধ্যে তিনজন মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা বলছেন, এমন সমঝোতাকারী পাঠাবেন এবং প্রস্তাব দেবেন যাতে ইইউ আবার আলোচনা শুরু করবে। পুরনো প্রস্তাবে তারা পরিবর্তনও আনতে পারবেন এবং সেটি পার্লামেন্টেও পাস হবে। বরিস জনসন ব্যাকস্টপ ব্যবস্থার চরম বিরোধী। তিনি বলেছেন, আদর্শিক বিশ্বে তিনি ব্রেক্সিট সংকট কাটাতে সক্ষম হবেন। বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইইউ ছাড়তে পারবে ব্রিটেন। আরেক প্রার্থী মাইকেল গোভ বলছেন, ইইউ’র প্রধান লক্ষ্য ঝামেলা ছাড়া চুক্তি সম্পন্ন করা। তবে তিনি সময়সীমার বিষয়টি জানাননি। জেরেমি হান্টও জানিয়েছেন, তিনি ইইউকে ফের আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হবেন। ইউরোপ তার স্বার্থেই ব্যাকস্টপ ব্যবস্থা থেকে সরে আসবে।

বিশ্লেষক লিউক ম্যাকগির মতে, তাদের এমন আশার কারণ দুটি। প্রথমত, তারা মনে করছেন, চুক্তিহীন ব্রেক্সিট এড়াতে চায় ইইউ। ইইউ দুইবার সময়সীমা বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইইউও মনে করে না যে, কোন প্রস্তাব পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ইইউর কোনো কর্মকর্তাই এখন পর্যন্ত বলেননি যে, বর্তমান সমঝোতা প্রস্তাব নিয়ে ফের আলোচনা হতে পারে। বরং তাদের অনেকের অভিযোগ, ব্রিটেনে সময়ক্ষেপণ করছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্কও ব্রিটেনের কর্মকর্তাদের বলেছেন, ৩১ অক্টোবরই শেষ সময়। আপনার দয়া করে সময় নষ্ট করবেন না। -তথ্যসূত্র : সিএনএন ও বিবিসি