আম উত্পাদনে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে দেশে যে আম উত্পাদিত হয়, তার বাজার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আম এখন বৈদেশিক মুদ্রাও নিয়ে আসছে। আমের উত্পাদনশীলতা বাড়াতে উন্নত জাত উদ্ভাবনের বিকল্প নেই। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম স্থানে রয়েছে, যা সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির কারণে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। এটি দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন ঘটিয়েছে। ফলের পুষ্টির চাহিদার বড় অংশের জোগান দেয় আম, যাকে বলা হয় ফলের রাজা, যার একটি ঔষধি মূল্য রয়েছে। কাঁচা আমে শর্করা ও পেপটিনের পরিমাণ বেশি থাকে। আমের আকারের ওপর এর ক্যালোরি নির্ভর করে। পাকা আমে ৬০ শতাংশ বিটা ক্যারোটিন থাকে। ক্যারোটিনের উপস্হিতির জন্য চোখ ও ত্বকের জন্য আম খুবই উপকারী। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য সারাতে কার্যকর। কাঁচা আমের শরবত লিভারের টনিক হিসেবে কাজ করে।
সারা বাংলাদেশেই গৃহস্হালি পর্যায়ে আমের চাষ হয়ে থাকে বাড়ির আঙিনায়, যার বেশির ভাগই স্হানীয় জাতের যা চারা থেকে উত্পন্ন হয়ে থাকে । আর যেগুলো উন্নত জাতের তা গ্রাফচিংয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে, যার মধ্যে বারি আম-৪, বারি আম-৩ (আম্রপালি), গোপালভোগ, রানীপছন্দ, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনা, হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি, খইসাভোগ, খোয়াপাহাদি, লতাবোম্বাই, ফরিয়া, বোম্বাই, কহিতোর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, মিশ্রিভোগসহ আরো অনেক জাত রয়েছে। অর্থাত্ স্থানীয় ও উন্নত মিলে বাংলাদেশে ১৫২ জাতের আম রয়েছে, যার মধ্যে ৩১টি জাত অধিক হারে চাষাবাদ হচ্ছে, যেমন—বারি। এরই মধ্যে ১৮টি উন্নত জাতের আম উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে যার মধ্যে চারটি হাইব্রিড জাতের। এ ব্যাপারে ১৯৯০ সালে গড়ে ওঠা চাঁপাইনবাবগঞ্জে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রটি আম উত্পাদনের কলাকৌশল, জাত উদ্ভাবনসহ চাষিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশে আম উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে আসছে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জেলা যেমন—চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁয়, রংপুর ও দিনাজপুরে বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদন হচ্ছে। তা ছাড়াও সাতক্ষীরা, রাঙ্গামাটি অঞ্চলের তিনটি পার্বত্য জেলায়ও পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের (রায়খালী) উদ্ভাবিত জাতের আমের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিগত দশক থেকে পার্বত্য অঞ্চলে আমের নীরব বিপ্লব ঘটেছে। এক সময় উত্তরাঞ্চল থেকে আম পাহাড়ে আসত। এখন পাহাড়ের আম দেশের প্রায় সব জায়গায় যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে দৈনিক পত্রিকার বরাতে চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩ হাজার ১৫০ কোটি, রাজশাহীতে ৯০১ কোটি ও নওগাঁয় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ব্যবসা হবে বলে জানা যায়। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি কেজি আম পাইকারি পর্যায়ে ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে আকারভেদে প্রতি কেজি হিমসাগর ৫০-৫৫ টাকা, ল্যাংড়া আম ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং আম্রপালি ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, তবে এ আম ঢাকার খুচরা বাজারগুলোয় ভিন্ন চিত্র দেখা যায় যেখানে হিমসাগর কেজিপ্রতি বিক্রি ১০০-১৩০ টাকা, ল্যাংড়া ১২০ থেকে ১৩০ এবং আম্রপালি মানভেদে ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা খামারি পর্যায়ের বিক্রি মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ। এখন যোগাযোগ ব্যবস্হার উন্নতি হলেও আমচাষিদের পক্ষে সরাসরি ঢাকার বাজারে বিপণনের সক্ষমতা তৈরি হয়নি বিধায় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত দুই বছর করোনার কারণে আমের দাম না পাওয়ায় স্থানীয় বাণিজ্য ও রপ্তানি বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে হয়নি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলছে, গত বছর ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ২৩টি দেশে ১ হাজার ৬২২ টন আম রপ্তানি হয়েছে। চলতি মৌসুমে করোনার প্রভাব কেটে যাওয়ায় ও বাজারজাতকরণে বাধা না থাকায় আমের ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন আম চাষিরা।
রপ্তানিযোগ্য আমের মান কী হবে তা কৃষকের অজানা ইত্যাদি। এর উন্নতি কল্পে প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার, উত্তম কৃষিচর্চা অনুশীলনে কৃষক পর্যায়ে মনিটরিং, নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে আধুনিক মানের ওয়্যার-হাউজ স্হাপন, পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়ায় গবেষকদের সংশ্লিষ্টতা থাকা ইত্যাদি। চিহ্নিত আম উত্পাদন এলাকায় আমের প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ রয়েছে যা কাজে লাগাতে হবে। আম থেকে বিভিন্ন রকম পণ্য তৈরি সুযোগ রয়েছে যেমন—আমের আচার, আমের চাটনি, আমের জুস, আমসত্ত্ব, আমের জ্যাম/জেলি, ড্রাইড ম্যাংগো, আমের ফ্রেশ-কাট, গ্রিন ম্যাংগো জুস ইত্যাদি। দেশে উত্পাদিত ২০ ভাগ আম প্রক্রিয়াজাত হয় অথচ কৃষকের আমের ন্যাঘ্যমূল্য পেতে প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো বিকল্প নেই, প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি হবে, বেসরকারি মালিকদের সহজ শর্তে প্রণোদনা দিতে হবে, আম উত্পাদনের বাণিজ্যিক এলাকায় গড়ে তুলতে হবে, তাহলেই আম শিল্প হিসেবে মূল্য সংযোজন ঘটাতে পারবে অর্থনীতিতে।
লেখক :কৃষি অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা