সীতাকুণ্ডের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড ও প্রাসঙ্গিক কথা

গত ৪ তারিখে শনিবার রাত প্রায় ৯টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম ডিপো নামক একটি প্রাইভেট কনটেইনার ডিপোতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরো দুই শতাধিক মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হন।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পূর্বের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় প্রতি দিনই দেশের কোথাও না কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব অগ্নিকাণ্ডের মোকাবিলা করে ফায়ার সার্ভিসের অকুতোভয় কর্মীরা জীবন বাজি রেখে আমাদের জানমাল রক্ষার জন্য রাতদিন নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বর্তমানে সারা দেশে ৪৮৯টি ফায়ার স্টেশনে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী কাজ করে যাচ্ছেন, যা মোটেই যথেষ্ট নয়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের লোকবল বৃদ্ধিরও কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে দরকার অগ্নিনির্বাপণ কাজে ব্যবহারের জন্য উন্নত মানের আধুনিক যানবাহন, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ। এর সঙ্গে দরকার ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের জন্য নিয়মিত উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। বাসাবাড়ি, মার্কেট, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য স্থাপনায় সাধারণ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। কিন্তু সব অগ্নিকাণ্ডকে সাধারণ অগ্নিকাণ্ডের মতো মোকাবিলা করা যায় না। সাধারণ আগুনের পাশাপাশি রয়েছে বৈদু্যতিক শর্ট সার্কিটের আগুন, তেলের আগুন কিংবা রাসায়নিক পদার্থের আগুন। সীতাকুণ্ডে ঘটে যাওয়া অগ্নিদুর্ঘটনা সেরকমই একটা বিশেষ ধরনের অগ্নিকাণ্ড। ধারণা করা হচ্ছে, বিএম কনটেইনার ডিপোতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ আগুনের সংস্পর্শে এসে প্রচণ্ড বিস্ফোরকের রূপ নেয়, যা প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকেও অনুভূত হয়। সাধারণ আগুনের মতো পানি ব্যবহার করে এ ধরনের আগুন নেভানো বেশ কষ্টসাধ্য। এ ধরনের আগুন নেভানোর জন্য দরকার বিশেষ ধরনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যেখানে ব্যবহার করা হয় ফোম, পাউডার কিংবা কার্বন ডাইঅক্সাইড। বিএম ডিপোতে সংরক্ষিত কনটেইনারগুলোতে কী ধরনের পণ্য রয়েছে সে বিষয়ে সঠিক তথ্য না পাওয়ার কারণে নিকটস্থ স্টেশন থেকে আগত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সাধারণ অগ্নিকাণ্ডের মতো এটির মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত এর প্রায় ৪০ মিনিট পর প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং এতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেকেই প্রাণ হারান। এখানে উল্লেখ যে, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মোকাবিলা করতে যে ফায়ার সার্ভিসের ৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং এখনো তিন জন নিখোঁজ রয়েছেন। কোনো একটি অগ্নিনির্বাপণ ঘটনায় এত অধিকসংখ্যক ফায়ার সার্ভিস কর্মীর মৃত্যু আমাদের দেশে এর আগে কখনো ঘটেনি।

বর্তমানে আমাদের দেশে বিএম ডিপোর মতো আরো ১৯টি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো রয়েছে, যারা মূলত আমদানি ও রপ্তানির জন্য বিভিন্ন ধরনের পণ্যের কনটেইনারের চাপ সামাল দেয়। সমুদ্রপথে জাহাজে করে কনটেইনারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি বিপজ্জনক বা ডেঞ্জারাস গুডসও পরিবহন করা হয়ে থাকে। বিএম কন্টেইনার ডিপোতে প্রাপ্ত হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড নামক রাসায়নিক পদার্থটি তেমনি একধরনের বিপজ্জনক পণ্য। আন্তর্জাতিক নৌসংস্থা (আইএমও) প্রণীত ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ডেঞ্জারাস গুডস বা আইএমডিজি কোড অনুযায়ী জাহাজে পরিবহনের জন্য বিপজ্জনক পণ্যের নয়টি শ্রেণি রয়েছে। এসব পণ্য কনটেইনারের মাধ্যমে সমুদ্রপথে জাহাজের পরিবহনের জন্য লেভেলিং, প্যাকেজিং, মারকিং, লোডিং-আনলোডিং ইত্যাদির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যা কঠোরভাবে মানা হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যে, এই কনটেইনারগুলো যখন ডিপোতে রাখা হয় কিংবা সড়কপথে পরিবহন করা হয় তখন এই ধরনের কোনো নীতিমালা মানা হয় না, যার ফলে অগ্নিকাণ্ডসহ অন্যান্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিনদিন বেড়েই চলেছে। এখন সময় এসেছে কনটেইনারে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে, ডিপোতে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে, জাহাজে লোডিং-আনলোডিং ইত্যাদির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং এর যথাযথ প্রয়োগ। এর সঙ্গে জরুরি এসব কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।

আমাদের কনটেইনার ডিপোসহ বিভিন্ন শিল্প স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির কারণগুলোকে চিহ্নিত করে এগুলোকে দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সেক্ষেত্রে প্রথমেই দরকার সেখানকার লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অথচ দুর্ঘটনায় আহত অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে বিএম ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের পর ভেতরে অবস্থানরত অনেকেই বের হওয়ার চেষ্টা করলেও বের হতে পারেননি গেট তালাবদ্ধ থাকার কারণে। কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে আমরা সাধারণত অপেক্ষা করি, কখন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে আগুন নেভাবে। এ কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির পক্ষে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কাজেই আগুন লাগার পরপরই যাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সেজন্য প্রতিটি স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণের জন্য একটা প্রাথমিক ব্যবস্থা রাখতে হবে। এটা অনেকটা প্রাথমিক চিকিত্সার মতো, অসুস্থ কিংবা দুর্ঘটনায় আহত কোনো মানুষকে প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে অনেক ক্ষেত্রেই মারাত্মক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কাজেই ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোসহ বিভিন্ন শিল্প স্থাপনায় নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং নিয়মিতভাবে মহড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

আগুনের প্রকারের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থাটি ঠিক করা হয়। যে কোনো ধরনের আগুন নির্বাপণের জন্য পানি ব্যবহার করলে সব সময় সুফল পাওয়া যায় না। আগুনের প্রকারের ওপর ভিত্তি করে কোথাও পানি, কোথাও ফোম, কোথাও পাউডার আবার কোথাও কার্বন ডাইঅক্সাইড কিংবা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করতে হয়। আমাদের দেশে সাধারণ অগ্নিনির্বাপণ কাজে পানির ব্যবহার ব্যাপক। অথচ অনেক সময় অগ্নিদুর্ঘটনার স্থানের আশপাশে পানির উত্স খুঁজে পাওয়া যায় না। এজন্য অগ্নিনির্বাপণ কাজ ব্যাহত হয়। অনেক সময় দূরবর্তী স্থান থেকে পানি আনার কারণে আগুন আরো ছড়িয়ে পড়ে এবং অগ্নিনির্বাপণের জন্য অনেক সময় লাগে। অগ্নিনির্বাপণের সময় পানির উত্স যাতে সহজে পাওয়া যায়, সেজন্য ফায়ার হাইড্রেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের ইনলান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য রাসায়নিক দ্রব্যসহ বিপজ্জনক পণ্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা অতি জরুরি। তাছাড়া এসব কাজের জন্য প্রতিটি ডিপোতে প্রশিক্ষিত লোকবল নিয়োগ করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি রাসায়নিক পণ্য ডিপোতে স্থানান্তরের সময় প্রতিটি রাসায়নিকের এমএসডিএস (ম্যাটারিয়াল সেফটি ডেটা শিট) ডিপোগুলোতে স্থানান্তর করা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের কারণে বর্তমানে অতি উত্সাহী কিছু মানুষ এই ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনার সময় নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে দুর্ঘটনাস্থলের অনেক কাছাকাছি গিয়ে লাইভ ভিডিও প্রচার করে থাকে। বিএম ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের সময় হঠাত্ বিস্ফোরণের কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ ভিডিও প্রচার করার সময় বেশ কয়েক জন প্রাণ হারায়। এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য দরকার ব্যাপক প্রচার ও সচেতনতা।

অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনা মোকাবিলার জন্য ফায়ার সার্ভিসের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ওপর নির্ভর করার পাশাপাশি প্রতিটি শিল্প স্থাপনায় নিজস্ব অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া এসব শিল্প স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়